আমাদের দেশের কৃষক প্রায় ৬০ বছর যাবত গভীর/অগভীর নলকুপ দিয়ে কাঁচা/পাকা নালার মাধ্যমে সেচ দিয়ে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করে আসছে। সেচের এ পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেশি হয় এবং সেচ খরচও বেশি হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এর বিকল্প হিসেবে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতি (AWD) ব্যবহার করে পানির ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ পদ্ধতিতে অসুবিধা হলো কৃষকরা এটাকে ঝামেলা মনে করে গ্রহণ করতে কছুটা অনীহা প্রকাশ করে।
বর্তমানে জাপানি সংস্থা জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেখানে 3F4D +MD পদ্ধতিতে সপ্তাহে এক দিন সেচ দিয়ে তিন দিন ভিজিয়ে রেখে পর পর চার দিন শুকানো হয় এবং এভাবে পর্যায়ক্রমে ছয় সপ্তাহ সেচ দিতে হয়। ধানের চারা রোপনের ৩৫-৪০ দিন পর্যন্ত সেচ দিয়ে খেতে পানি রেখে তারপর একটানা আট দিন শুকানো হয় (MD, মধ্য-মৌসুমি মাঠ শুকানো) এবং এরপর 3F4D পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া শুরু করা হয়। পরপর ছয়টি 3F4D সেচ চক্র শেষ করার ১০-১১ দিন পর ফসল কাটা হয়।
জাপানে এ পদ্ধতিটির প্রয়োগে বেশ সাফল্য পাওয়া গেছে। এ পদ্ধতিতে ধান আবাদ করলে সেচের পানি কম লাগে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে সেচ খরচ গড়ে ৪0 শতাংশ পর্যন্ত কম হয়, ফসল উৎপাদনে সার কম লাগে, উৎপাদন কিছুটা বেশি হয় (১৩ শতাংশ), আগাছা খুবই কম জন্মায়, ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের ব্যবহার কম হয় বলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কম থাকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন কম হয়। এ সেচ পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া হলে মাটির পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পায়, ধানের গোছাপ্রতি কুশির সংখ্যা বেশি হয় এবং ধানের ছড়ায় ধান সংখ্যাও বেশি হয়। এ ছাড়া চিটা ধান কম হয়, ধানে বা চালে অর্থাৎ ভাতে আর্সেনিকের পরিমাণ কম থাকে। অধিকাংশ কৃষক মনে করে এ পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া সহজ এবং উৎপাদিত চালের ভাতে আর্সেনিকের উপস্থিতি খুবই কম।
সেচকল মালিকরা এ বছর সেচ দিতে প্রতি বিঘা জমিতে পাঁচ থেকে সাত শ টাকা কম নিয়েছে। ভবিষ্যতে সবাই এ পদ্ধতিতে সেচের পানি নিলে সেচ চার্জ আরও কম নেওয়ার কথা জানিয়েছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে মডেল কৃষকদের মাধ্যমে দ্বিতীয় বার 3F4D সেচ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রকল্প গবেষকদের পক্ষে এশিয়ান আর্সেনিক নেটওয়ার্ক নামক একটি বেসরকারি সংস্থা এ নতুন সেচ প্রযুক্তির চালু করতে কাজ করেছে। এলাকার অসংখ্য কৃষক ভাইয়েরা এ পদ্ধতিতে ধান উৎপাদন দেখে বিশেষ করে সেচ খরচ কম এবং ভাতে আর্সেনিকের পরিমাণ কম থাকে বিধায় এ পদ্ধতিতে সেচ দিতে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
পানি কম লাগে বিধায় সেচকল মালিকরাও এ পদ্ধতির প্রয়োগে তাদের সুবিধা হবে বলে মনে করে। এ বিষয়ে বিগত ১৬ জুন মডেল কৃষকদের নিয়ে প্রকল্প এলাকায় একটি ফোকাস গ্রুপ ডিস্কাশন এবং মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়। এটি করা হয় যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা ইউনিয়নের আরারদাহ গ্রামে এবং ধুলিয়ানি ইউনিয়নের কুষ্টিয়া গ্রামে। ওই মাঠ দিবসে প্রায় দুই শ পুরুষ ও মহিলা কৃষক উপস্থিত হয়। উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জাইকার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা। আরও উপস্থিত ছিলেন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
উপস্থিত সকলের ভাষ্য মোতাবেক, ওই এলাকার জন্য 3F4D পদ্ধতি ব্যবহার খুবই কার্যকরি একটি সেচ প্রযুক্তি। পরপর দুই মৌসুমে এটির প্রয়োগ কৃষকদের কম খরচে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে বলে বিশ্বাসী করে তুলেছে। তাদের খুশির জায়গা হলো, এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধানে আর্সেনিকের মাত্রা বেশ কমে যায়।
বেশিরভাগ মডেল কৃষকরা তাদের পরীক্ষামূলক প্লটের ধান নিজে খাবেন বলে সংরক্ষণ করেছেন। ওই এলাকার কৃষকরা মনে করে ধান চাষে সেচ খরচ যে সমস্ত এলাকায় বেশি এবং যেখানে আর্সেনিকের প্রকোপ রয়েছে সে সমস্ত এলাকায় 3F4D সেচ পদ্ধতির বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজনে তারা নিজেরাও এ কাজে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
এ সেচ প্রযুক্তিতে অসুবিধা যে কিছু নেই তা নয়। এ পদ্ধতিতে লাইন ধরে সঠিক দূরত্বে প্রতি গোছায় দু/তিনটি করে ধানের চারা লাগাতে হয়। ফলে চারা লাগানোতে সময় ও খরচ বেশি লাগে। এছাড়া প্লটে প্লটে যথাযথ ভাবে সেচ দিতে সময় ও শ্রমিক খরচও একটু বেশি লাগে। অধিক বালুময় ও নিচু জমিতে এ পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া কঠিন।
জমিতে বেশি করে পানি রাখার মানসিকতা থেকে কৃষকদের বের করে আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, গভীর নলকুপে অনেক প্লটে পানি দিতে হয় বিধায় এ পদ্ধতিতে পানি দেয়া কিছুটা দুষ্কর।
জাইকার অর্থায়নে এ গবেষণা কাজটি জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট-এর সাথে যৌথভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তিটি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে। এছাড়া এ সেচ প্রযুক্তিটি কৃষি ডিপ্লোমা ইনষ্টিটিউটের কোর্স-কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা প্রযুক্তিটির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। গবেষক টিমের বিশ্বাস সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগিতা পেলে সেচের ক্ষেত্রে 3F4D এ পদ্ধতিটি অতিদ্রুত সকল কৃষকের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে।
লেখক: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও জাইকার অর্থায়নে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত SANRICE প্রকল্পের সোসিওইকনোমিক কনসালটেন্ট।