ads

ব্রাজিলের নকআউট মানেই ‘ইউরোপীয়-জুজু’, সেটা কাটবে কি?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ব্রাজিলের নকআউট মানেই ‘ইউরোপীয়-জুজু’, সেটা কাটবে কি?
নকআউটে এবার কাটবে ব্রাজিলের ইউরোপীয়–জুজু? ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিলের সঙ্গে এক সময় ইউরোপের একটা শুভ–যোগ ছিল। পাঁচ বিশ্বকাপ শিরোপার সবকটিই ব্রাজিল জিতেছে ফাইনালে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে। কিন্তু পাঁচটি বিশ্বকাপ জিতে সেই ইউরোপই এখন ব্রাজিলের জুজু। ২০ বছর ধরে প্রতিটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দুঃখ কোনো না কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ। নরওয়ের বিপক্ষে আজ শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের মিশন ওই জুজু তাড়ানোই।

১৯৫৮ বিশ্বকাপ ব্রাজিল জিতেছিল ফাইনালে সুইডেনকে হারিয়ে। কিংবদন্তি পেলের প্রথম বিশ্বকাপ। এরপর ১৯৬২ আর ১৯৭০—ব্রাজিলের বাকি দুটি শিরোপা যথাক্রমে চেকোস্লোভাকিয়া ও ইতালিকে ফাইনালে হারিয়ে। সেলেসাওদের পাঁচ শিরোপার প্রথম তিনটি ‘জুলেরিমে ট্রফি’। হালের ট্রফির বাকি দুই শিরোপাও ব্রাজিল পেয়েছে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে। ১৯৯৪–তে ইতালি, ২০০২–তে জার্মানি।

গত ২৪ বছরে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। শিরোপা খরার এই সময়টায় ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপেই নক আউট পর্বে ব্রাজিল আটকে গেছে কোনো না কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। এ এক ভূতুড়ে কাণ্ড। নরওয়ের বিপক্ষে সেই ভূত তাড়াতে রীতিমতো একজন ওঝাকেই খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে তাদের।

২০০৬ বিশ্বকাপে রোনালদো, রবার্তো কার্লোস, কাফুদের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে। নির্দিষ্ট করে বললে জিনেদিন জিদানের সেই জাদুকরি নৈপুণ্যের কাছে। সে যেন ছিল একটা যুগের সমাপ্তি। ২০১০ বিশ্বকাপে কাকা–রবিনিওদের ব্রাজিল আবার কোয়ার্টার ফাইনালে হারল নেদারল্যান্ডসের কাছে। ওয়েসলি স্নাইডারের জোড়া গোল ডুবিয়েছিল দুঙ্গার ব্রাজিলকে।

২০১৪ সালের সেই মিনেইরো–বিপর্যয় ছিল জার্মানির বিপক্ষে। ছবি: রয়টার্স
২০১৪ সালের সেই মিনেইরো–বিপর্যয় ছিল জার্মানির বিপক্ষে। ছবি: রয়টার্স

চার বছর পর কোয়ার্টার ফাইনাল–দুঃখ কাটিয়ে ঘরের মাঠে ব্রাজিল উঠল সেমিফাইনালে। কিন্তু সেবার আরও বড় দুর্গতি। মিনেইরোতে জার্মানির বিপক্ষে ঘটল ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের নজিরবিহীন এক বিপর্যয়ের সাক্ষী হলো দর্শকেরা, গোটাই দুনিয়াই। জার্মানির কাছে ৭–১ গোলে উড়ে গিয়ে নকআউট পর্বে ইউরোপীয়–জুজু ভয়ানক রূপ নিল। মিনেইরোর ‘সেভেন আপ’ ঢেকে দিয়েছে সেবারের তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে। নেদারল্যান্ডসের কাছে ৩–০ গোলে হারার স্মৃতিটার অনেকের কাছেই বিস্মৃত–অধ্যায়।

২০১৮ বিশ্বকাপে নেইমার–গ্যাব্রিয়েল জেসুস–কুতিনিওর ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে হারল বেলজিয়ামের কাছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আবার কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে টাইব্রেকারে হার; ইউরোপয়ী–জুজু এখন আর ব্রাজিলিয়ানদের কাছে কোনো ‘কাকতালীয়’ কিছু নয়। এটা যে জুজু, কিংবা ভূতুড়ে কিছু, সেটা ‘বিশ্বাস’ করার যথেষ্ট কারণ ব্রাজিল–ভক্তদের কাছে।

নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটির আগে ব্রাজিল–ভক্তদের মনে আরেক ‘কু–ডাক’। একে তো নরওয়ে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ, অন্যদিকে নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের রেকর্ড আরও ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিল যে আগে কখনোই জেতেনি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সর্বশেষ মোকাবিলায় নরওয়ের কাছে হেরে যাওয়ার ঘটনাটিতেও খুব বাজেভাবে চোখ রাঙাচ্ছে।

তবে বিশ্বকাপে ইউরোপীয়–জুজু তাড়াতে ব্রাজিল এখন ভরসা করেছে এক ইউরোপীয় কোচের ওপরই। কার্লো আনচেলত্তি গত ১০০ বছরের মধ্যে ব্রাজিলের প্রথম বিদেশি কোচ। তার হাত ধরেই এখন ‘হেক্সা’ স্বপ্নটা জোরের সঙ্গেই দেখছে তারা।

২০০৬ বিশ্বকাপে জিদানের জাদুর কাছে হেরেছিল ব্রাজিল। ছবি: রয়টার্স
২০০৬ বিশ্বকাপে জিদানের জাদুর কাছে হেরেছিল ব্রাজিল। ছবি: রয়টার্স

শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে জাপানকে ‘গুড বাই’ বলার পর ব্রাজিল এখন অনেক কারণ, আনচেলত্তির ট্যাকটিক্স। অপেক্ষায় থাকতে হবে আজ রাতে নরওয়ের বিপক্ষে, কিংবা ইউরোপীয়–জুজু তাড়াতে আনচেলত্তি কী কৌশল হাতে নেন।

নরওয়েকে হারাতে না পারার যে কলঙ্ক, সেটা ঘুচিয়ে ফেলা হয়তো ব্রাজিলের জন্য বাড়তি প্রেরণা হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আর্লিং হলান্ড ব্রাজিলের জন্য একটা বড় সমস্যা হতে পারে। তবে এটা ঠিক, ব্রাজিলের মতো দল হলান্ডকে কীভাবে আটকাতে হয়, সেই কৌশল খুব ভালোভাবেই জানে।

এই ম্যাচ সত্যিকার অর্থেই হলান্ড ও ব্রাজিলের রক্ষণভাগের লড়াই। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার হলান্ডকে ঠেকাতে প্রিমিয়ার লিগ ও বুন্দেসলিগায় মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে কুনিয়া ও গ্যাব্রিয়েল মাগালাইসের। যদিও তার আগে ব্রাজিলের মাঝমাঠের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানেই লেগেছে বেশ বড় একটা ধাক্কা। চোট পেয়ে ছিটকে পড়েছেন মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতা। তবে তার জায়গায় কে খেলবেন, সেটা আনচেলত্তির সিদ্ধান্ত। তবে ইউরোপীয়–জুজু তাড়ানোর লড়াইয়ে ব্রাজিল যে আটঘাঁট নেমেই মাঠে নামবে, সেটা কি আলাদা করে বলে দিতে হয়?

সম্পর্কিত