মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থসংকটে বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত–এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রায় অনিবার্য। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট থেকে উত্তরণ করতে হলে বাংলাদেশের বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অথচ আইএমএফ এখনও ঋণ ছাড়েনি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি এবং কঠোর কূটনৈতিক নজরদারির কারণে বাংলাদেশের পক্ষে চীনের দিকে কৌশলগতভাবে ঝুঁকে যাওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়ায় মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে এই মুহূর্তে বঙ্গোপসাগরে নতুন মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনও বাস্তবসম্মত বা সহজ কোনো বিকল্প নয়।
ফলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ভারতের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
অন্যদিকে, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্থিতিশীল করা ছাড়া দেশের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবন সচল রাখা কঠিন। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রায় অনিবার্য। ভারত আপাতত বাংলাদেশের ডিজেলের চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে এবং অপরিশোধিত অর্থ পরিশোধের চাপ ছাড়াই আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে।
অধিকন্তু, অর্থ থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সচল রাখা সহজ। দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আন্তর্জাতিক প্রভাবের মাধ্যমে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলকভাবে নমনীয় ঋণসহায়তা দেওয়ার পথও উন্মুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি কার্যকর রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ দেখা যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।
তবে চীনা অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে উন্নয়ন ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সে কারণে সরকার শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তববাদী সমঝোতার পথ বেছে নিতে পারে।
এই সমঝোতার রাজনৈতিক অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হতে পারে, তথাকথিত ‘জাকার্তা মডেল’ কার্যকর না হয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ‘নেপাল মডেল’-এর একটি শান্তিপূর্ণ ও আলোচনাভিত্তিক সংস্করণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ফলে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে কয়েক বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চয়তা চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এবং এটিই হবে সরকারের জন্য রাজনৈতিক BATNA (Best Alternative to a Negotiated Agreement)। এতে সাম্প্রতিক গণআন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতারাও কয়েক বছর একটি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে পেতে পারে।
এই মডেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সবাইকে নিয়ে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে জাতীয় নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে থেকেই রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সেই পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। একটি গ্রহণযোগ্য ও সমতাভিত্তিক নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বদলীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারে এবং আদালতের রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক ধরনের নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা কার্যকর করা নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে।
অতএব, বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি শুধু কোন দেশের দিকে কৌশলগতভাবে ঝুঁকবে—তা নয়। বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক অর্থায়ন, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা—এই পাঁচটি বিষয়কে একই সঙ্গে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই আগামী দিনের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
লেখক: অধ্যাপক, এআইইউবি এবং প্রাবন্ধিক ও গবেষক