গাজায় ইসরায়েলি বোমায় মানুষ মারা যাবে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। কেননা সেখানে ঘাতকেরা চিহ্নিত। কিন্তু আমাদের ঘরের ভেতরে ও আশপাশে যে ঘাতকেরা লুকিয়ে আছে, সেটা অনুমান করা কঠিন।
রংপুরের ঘটনাই ধরুন। রংপুরের মাছুয়াবাজারে স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। রংপুর পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি নির্মীয়মাণ তিনতলা বাড়ির ছাদে শব্দ শুনে ওপরে উঠে দেখেন দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা সেবন করছে। গণপতি তাদের বাধা দেন। এরপর এই দুই তরুণ গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। এ সময় তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী তৃতীয় তলার ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতেই তাকে হত্যা করে তারা। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে দুই মাদকসেবী।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন–দুই তরুণ খালি হাতে কীভাবে চারজন মানুষকে হত্যা করল? স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো কেউ সেটা করতে পারত না। কিন্তু মাদকাসক্ত দুই তরুণের তো তখন হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। ফলে তারা হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ ও দুর্বিনীত। হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। নিচতলায় এসে গোসল করেছে, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে। রাতে তারা সেই বাসায়ই ছিল। পরদিন জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা পেয়ে বেরিয়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় চার খুনের পর কেউ ঠান্ডা মাথায় এসব কাণ্ড করতে পারত না। এটাও পুলিশেরই ভাষ্য।
এ ভাষ্য ঠিক থাকলে বলতেই হয় যে, মাদকসেবীরা কতটা হিংস্র ও নৃশংস হতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ। মাদক সেবনে বাধা পেয়ে, মাদকের টাকা না পেয়ে মা–বাবা, ভাই-বোন ও অন্য স্বজনদের হত্যা করতে তারা দ্বিধা করছে না।
আপনাদের নিশ্চয়ই ঢাকার চামেলীবাগের ঘটনার কথা মনে আছে। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী খুন হন ঐশী নামে তাদের কিশোরী কন্যার হাতে। পরে মেয়েটি পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে পুলিশকে জানায়, ‘সে নিজেই বাবা-মাকে খুনে করেছে।’ঐশী এখন কাশিমপুর কারাগারে বন্দী। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালত দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মাদক তিনটি জীবন ধ্বংস করে দিল।
কয়েকদিন আগে জামালপুরের ইসলামবাগে মাদকসেবী ছেলেকে মা পুলিশে দিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের কারদণ্ড দেন। এই ছেলে প্রায়ই মাকে মরধর করত। গত ১৪ আগস্ট ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার শ্যামকুড় গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে খুন হন মা।
পত্রিকা খুললেই এ রকম ঘটনা চোখে পড়ে। বাংলাদেশে আর কিছুর বিকেন্দ্রিকরণ না হলেও মাদকের বিকেন্দ্রিকরণ হয়েছে। রাজধানী থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদকের দৌরাত্ম্য চলছে।
দেশে অর্থনীতির চাকা স্থবির হলেও মাদকাসক্তির সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সমীক্ষার বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানায়, ২০২৫ সালে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮৩ লাখে উন্নীত হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা করেছিল, সেখানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ লাখ।
মাত্র কয়েক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। প্রশ্ন হলো–এই মাদক আসে কোথা থেকে। দেশে তো মাদক উৎপন্ন হয় না। এসব মাদক আসে সীমান্ত দিয়ে। সীমান্তে কোস্টগার্ড আছে। বিজিবি আছে। আছে বিমানবন্দরে কঠিন পাহারা। তারপরও কী করে কোটি কোটি টাকার মাদক দেশে প্রবেশ করছে?
মাদকবিষয়ক প্রতিবেদনে দেশের চারটি অঞ্চলের ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের ৮ জেলার ৪৩টি, পূর্বাঞ্চলের ৪ জেলার ২১টি, উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার ২১টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সরকার কি এসব সীমান্তে মাদক আসা বন্ধ করতে পেরেছে? পারেনি বলেই মাদকসেবীর হাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে জীবন দিতে হয়।
রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের পথ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমানা), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) এবং গোল্ডেন ওয়েজের (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশ যে ঝুঁকিতে আছে, এটা নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়।
মিয়ানমার সরকার কেবল রোহিঙ্গাদেরই আমাদের দেশে ঠেলে পাঠায়নি। সেই সঙ্গে অবৈধ মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের রমরমা ব্যবসাও চলছে। প্রতিটি রোহিঙ্গা শিবির মাদকের অবাধ কারবারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরে মাদক আসে। আবার সেই মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ‘দুষ্টচক্রের’ মাধ্যমে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একজন সংসদ সদস্যও মাদক কারবারের গডফাদার হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। সেই গডফাদারের শূন্যস্থান কেউ না কেউ পূরণ করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকদ্রব্যের বাহকদের ধরছে, কিন্তু রাঘববোয়ালদের কেশাগ্র স্পর্শ করছে না। সরকার যদি মাদকের মহামারি বন্ধ করতে না পারে, তাহলে গণপতি চক্রবর্তীর ঘাতকেরা আমার-আপনার বাড়িতেও হানা দিতে পারে।
গণপতি পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর সংবাদ সম্মেলন করতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তার এই আবেগ যেন নিছক লোক দেখানো না হয়। গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের চার সদস্য নিহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিবেক জাগ্রত হোক। তারা যেন কেবল সংখ্যার হিসেবে মাদক সমস্যাকে না দেখেন। এই মহামারি রুখতে না পারলে মনে রাখবেন, কেউ নিরাপদ থাকবে না। না মানুষ, না অর্থনীতি, না দেশ।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা