জনগণের সরকারের ১৮০ দিন শীর্ষক ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে।
এটা সরকারের নবম পে স্কেল। অতীতে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর এই আয়োজনটি করা হতো। এবার করা হলো ১১ বছর পর। চলতি বছর এবং সামনের বছর মিলে এই বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। সেখানে এই পে স্কেলকে বড় সুখবর বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারি চাকরিজীবীরা বিষয়টা উদ্যাপনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, এটাই স্বাভাবিক ধারণা। কিন্তু মূল্যস্ফীতির করাল গ্রাস এ ক্ষেত্রে একটি বাধাই বটে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে শুধু সরকারি চাকরিজীবী নন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা গত ১৬ মাসে সর্বোচ্চ। গত জুন মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এরপরও এই সূচকের যাত্রা কোনদিকে এগোচ্ছে, সেটা স্পষ্ট নয়। মানুষের আয়ের চেয়ে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী চাপ বেশি থাকায় এমনকি তাদের বাড়তি আয়ের স্বস্তিটুকুও টিকছে না।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাসাভাড়া এবং যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। নিম্ন মানের খাদ্যপণ্য কেনার জন্য অনিবার্য অবহেলায় তারা তাদের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিতে পারছে না। একবার বাড়ি যাওয়ার খরচ তিন মাসে জোগাড় করতে হয়। আয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে পণ্যের দাম বেশি বাড়ায় পারিবারিক অর্থনীতি একটি বিপর্যয়ের মুখে এখন।পে কমিশনের সুপারিশ প্রতিবেদনে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারির ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বেতনের এই অতিরিক্ত অর্থের যোগান দিতে সরকারের লাগবে ১০০ কোটি টাকা।
সরকারি কর্মচারির বেতন বাড়লে অন্য একটি বিষয়ও মানুষের সামনে চলে আসে। দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণ–এটা তো মানুষের মুখে মুখে। তাদের বেলায়ই কি তাহলে শুধু এত সুযোগ, এত সুবিধা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের গল্প কারও ভোলার কথা নয়। ১৫ লাখ টাকায় তার ছেলে ছাগল কিনতে যান। এরপর মতিউরের পরিবার ও আত্মীয়দের বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি এবং রিসোর্টের তথ্য বেরিয়ে আসে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা শত শত বিঘা জমি, ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন। এগুলো তার আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া আছে তার বিপুল অর্থপাচারের বিষয়ও।
এই কাফেলায় আছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান হারুন অর রাশিদ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি।
তবে দুর্নীতির এই চর্চায় সবাই আছেন, তা কিন্তু নয়। বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারিই এর ঊর্ধ্বে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার মূল কারণটি হলো পরস্পরের বিশ্বাসের জায়গাটিতে নেই তারা আর। একই অনুপাতে সহানুভূতির বার গ্রাফটিও ভিন্নদিকে হেলে পড়েছে।
তবে মানুষের জীবনে সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য প্রায়ই মনে কষ্ট ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। নিম্নমধ্যবিত্তদের নিয়েই কথা বলতে চাই।
সরকারি কর্মচারিদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বে অবারিতভাবে। তাহলে নিম্নমধ্যবিত্তদের কী হবে? রাষ্ট্র তার কর্মচারিদের জন্য চিন্তা করবে, ভালো-মন্দ দেখবে–সেটা স্বাভাবিক। আম-জনতার জন্য করছে না, তা বলছি না। কিন্তু এও তো মানতে হবে যে, সাধারণ মানুষই বৈষম্যের বেশি শিকার। তারা কি এমন অবাঞ্চিত থাকবে যুগের পর যুগ ধরে?
দেশে এখন কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫ জন। প্রতি বছর এ সংখ্যা বাড়ছে ১২ হাজার করে। দেশের ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কাছে এখন ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রিভূত। এ জন্য দেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে। অনেক ধনী বা খুব গরিবের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট ফারাক।
দেশে দারিদ্র্য ও ছদ্ম বেকারত্ব বাড়ছে। এমন অবস্থায় কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধি–এটিই প্রমাণ করে যে, সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না।
আসলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারিদের মধ্যে প্রচুর বৈষম্য। একজন আরাম আয়েসে চলছেন, আর অন্যজন প্রমাদ গুনছেন। নাভিশ্বাস উঠছে দ্বিতীয়জনের। প্রয়োজন এই বৈষম্য নিরসন।
লেখক: প্রকৌশলী ও কথাসাহিত্যিক