গেল আগস্টের ১৫ তারিখ নেত্রকোনা জেলায় আমার একমাত্র ছোট বোনের ব্রেইন স্ট্রোক করে। দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নিউরোসায়েন্স বিভাগে রাতে ভর্তির পর সকালে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। এর কয়েক মিনিট পর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ১৯ আগস্ট ২০২৬ বেলা ১১টায় আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাহি রাজিউন।
এই কয়দিন আমি আমার একমাত্র বোনের পাশে থেকে হাসপাতালের একটা বিশেষ চিত্র চাক্ষুস করেছি এবং উপলব্ধিও।
সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় অন্যতম প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও স্থান সংকট। ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি রোগী হওয়ায় অনেককে মেঝে বা বারান্দায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। দ্বিতীয়ত, ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকট। বিনামূল্যে পর্যাপ্ত ওষুধ পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় রোগীদের বেশির ভাগ দামি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।
তৃতীয়ত, চিকিৎসাসামগ্রীর অকার্যকারিতা। অনেক মূল্যবান ও জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি টেকনিশিয়ানের অভাব বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাসের পর মাস নিষ্ক্রিয় থাকে। চতুর্থত, দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিটের জন্য দালাল চক্রের হয়রানি এবং নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর প্রবণতা রয়েছে।
পঞ্চমত, পরিচ্ছন্নতা ও জনবলের ঘাটতি। ওয়ার্ড ও শৌচাগারগুলোর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সেবা ব্যাহত করছে। সবশেষে, রোগী ভর্তির সময় ও পরবর্তীতে দেখতে আসা নিয়ে বিড়ম্বনা। রোগী ভর্তির সময় জরুরি বিভাগে দর্শনার্থীর চাপ এবং পরবর্তীতে রোগীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে আসা দর্শনার্থীর সাথে শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের আসা-যাওয়ায় চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সবাই অনেক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন।
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো মূলত দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান চিকিৎসা নির্ভরতার কেন্দ্র। অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ মানুষদের জন্য এসব হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের সেবা নিয়ে দুর্ভোগের অন্ত নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসেন সরকারি হাসপাতালে।
দীর্ঘ লাইন, সীমিত বেড, চিকিৎসকের স্বল্পতা, নার্সদের অতিরিক্ত চাপ—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা যেন প্রতিনিয়ত সেখানে কাজ করে। অনেক সময় রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না, জরুরি সেবা পেতে বিলম্ব ঘটে, আর এই বিলম্বই কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর কারণ হয়। এ যেন এক অন্ধকার, কেবল হাতের ‘টাকাই’ এখানে সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিশেষ কারো ফোন ছাড়া সাধারণ একজন রোগীর কাছে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। কিন্তু কেন? এর উত্তরে বিস্তর আলাপ আসতে পারে। সংক্ষেপে, আমাদের দৃষ্টি বলে হাসপাতালের কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতা ও উন্নয়নের পরিসংখ্যান এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হয়ে আছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের সময় সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, স্কুল যাওয়ার আগে সকালে থানা সদর হাসপাতালে টিকিট কেটে দাদুর জন্য ওষুধ নিয়েছি।
পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উন্নয়নের পাশাপাশি প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অনুমোদন দেওয়া হয়। আজ উচ্চবিত্তের জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়াশোনা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই ১৫-১৬ বছরে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে ভবন তৈরিতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে, যার সাথে যুক্ত ছিল লাগামহীন লুটপাট।
অন্যদিকে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটসহ রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, কর্মপরিবেশের চাপ এবং কখনো কখনো নিরাপত্তাহীনতা—এসবই তাদের কাজের মান ও মনোবলকে প্রভাবিত করে। ফলে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে রোগী ও সেবাদাতা উভয়ই এক ধরনের অসহায়তার শিকার হয়ে পড়েন।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, নাকি উন্নয়নের বাহ্যিক রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অব্যবস্থা? সরকারি হাসপাতালের সেবা কি সত্যিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে, নাকি দিন দিন সেই আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে?
এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম ও প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে রোগী ভর্তির সময় ও পরবর্তীতে দর্শনার্থী সীমিত করা এবং একটা শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা। অতি সহজেই তা অনেকটা সম্ভব—হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যতিত শিশু, কিশোর ও ৭০ ঊর্ধ্বে বয়স্ক কেউ দর্শনার্থী হতে পারবে না।
সেজন্য দরকার পেশাগত প্রতিশ্রুতি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মমত্ববোধ। তা সম্ভব হবে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের জায়গা থেকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সততা থাকলে।
সরকারি হাসপাতালের সেবার বাস্তব চিত্র দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক দৃশ্য। বহু নতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সংখ্যা ও শয্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। তবে এসব অপরিকল্পিত উন্নয়ন ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হলেও পরিকল্পিত কোনো ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। অনেক হাসপাতালেই আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। কখনো যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস, আবার কখনো অপারেটর না থাকায় সেগুলো ব্যবহারই করা যায় না। ফলে উন্নয়নের এই চিত্র অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।
স্বাস্থ্যখাতে ‘ন্যাশনাল ই-হেলথ প্ল্যাটফর্ম’, রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ, চিকিৎসকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজলভ্য করা এবং চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রশ্নটি প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটি এখন কি আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত?
এই মুহূর্তে দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বিশাল জাতীয় ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেয়ে মানুষের মৌলিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই অনেক বেশি জরুরি। ২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যতথ্যকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা কোনো সাধারণ আইটি প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ, যাচাই, সংরক্ষণ, ব্যাকআপ, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সেন্টার, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারঅপারেবিলিটি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়। শুধু একটি সফটওয়্যার তৈরি করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের আওতায় আনা।
আজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ডেটার অভাব নয়—অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হলো সেবা দেওয়ার সক্ষমতার অভাব।
আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত: প্রথমে মানুষ, তারপর অবকাঠামো, তারপর সেবা, এবং তারও পর ডিজিটাল প্রযুক্তি।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে—কিন্তু ভুল সময়ে, ভুল পরিসরে এবং বাস্তব স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক ঘাটতি উপেক্ষা করে এটি বাস্তবায়ন করলে তা জনগণের জন্য কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পরিবর্তে আরেকটি ব্যয়বহুল সরকারি আইটি প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাই, এখন বাস্তবতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
সেজন্য শুধু কাঠামো উন্নয়ন আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ব্যবহার নাগরিকদের প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে না। দরকার মানুষের মুখে ফিরে আসা সেই নিশ্চিন্ত হাসি—যেখানে ভরসা আছে, নিরাপত্তা আছে, আর আছে বেঁচে থাকার এক দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।
শায়রুল কবির খান: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী