সরকার পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের পরিবর্তে খণ্ডিতভাবে আইন প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। আজ বৃহস্পতিবার রাতে আইন প্রণয়ন কার্যাবলি শুরুর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ তিনটি বিল সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে বিরোধী দল এ ওয়াকআউট করে।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা পুরো সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এভাবে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না।”
অধ্যাদেশ থেকে নতুন বিল
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের লক্ষ্যেও একাধিক আইনি পরিবর্তন আনা হয়। এ সময় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্তমান সংসদে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না হওয়ায় সেগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়।
তবে নতুন করে যাচাই-বাছাই করে বিল আনার কথা বলা হয়েছিল এমন আইনগুলোর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও রয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশও রহিত করা হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের বিল পাস করা হয়। তখন আইনটি আরও যাচাই-বাছাই করে কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছিল।
পরে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের নতুন খসড়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করে।
গুম তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। তবে সংসদে উত্থাপিত বিলে সেই ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখা হয়নি। প্রস্তাবিত আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা তাদের সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত বাহিনী নিজে সেই অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না। এ ধরনের ঘটনায় কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা সরকারের স্বপ্রণোদিত উদ্যোগে অভিযুক্ত বাহিনীর বাইরে অন্য কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন আইন নিয়েও বিভিন্ন মহল আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা এবং কমিশন গঠনে বাছাই কমিটির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে।
‘মূল সংস্কারকে চাপা দেওয়া হচ্ছে’
বৃহস্পতিবার বিলগুলো সংসদে উত্থাপনের আগে শফিকুর রহমান বলেন, “আজকে আমাদের সামনে তিনটি বিল এসেছে। সেগুলো আজকে অবশ্য আলোচনা হবে না, উত্থাপনের জন্য এসেছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটা শুরু হবে।”
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘‘১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি কার্যকারিতা হারিয়েছে বা বাতিল হয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে দেশ মুক্তি পাবে না।’’
জামায়াত আমির বলেন, “আমরা আশঙ্কা করছি, এর মাধ্যমে সংস্কারের যে মূল দাবি, সেটাকেই চাপা দেওয়া হয়। আমরা সেই চাপা দেওয়ার পক্ষে নই। সংস্কারের মূল দাবির পক্ষে আমাদের অবস্থান জোরালো ও স্পষ্ট। আমরা এখান থেকে সরিনি।”
আজ বৃহস্পতিবার সংসদের বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল উত্থাপনও ভালো নজির হবে না বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তার অভিযোগ, সংসদকে একতরফা ও একপেশেভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় নীতিগতভাবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি বলেন, “এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি।”
এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।