বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মাথায় এসে জনগণের বৃহত্তর অংশ যে হতাশ হয়ে পড়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন জনজীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছিল না, তখন তারা এই বলে আশায় বুক বেঁধেছিল যে নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি বদলাবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষিত বাজেটেও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন মোটামুটি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
কিন্তু জনগণকে প্রথমেই যে বিষয়টি আশাহত করল, সেটি হলো মন্ত্রিসভা গঠন। যাদের মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম দু-চারজন বাদে বাকিদের নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো দলীয় নেতাদের প্রশাসন ও রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয় না। জনসভায় যারা গরম বক্তৃতা দিতে পারেন, তাদেরই বড় নেতা ও মন্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এখানে প্রাশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয় না। বহু বছর থেকে চলে আসা এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বিএনপির নেতৃত্বও বেরিয়ে আসতে পেরেছে, এটা বলা যাবে না।
মন্ত্রিসভার আকার নিয়েও কথা উঠেছে। সরকার শুরুতে ছোট মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বললেও দেশবাসী ঢাউস আকারেরই মন্ত্রিসভা পেয়েছে। ছয় মাস পর মন্ত্রিসভা রদবদলের ক্ষেত্রেও খুব একটা গুণাগুণ যাচাই করা হয়েছে বলে মনে হয় না। একজন উপদেষ্টা যখন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, ধরে নেওয়া হয়, তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভালো করেছেন। কিন্তু যখন একজন মন্ত্রীকে নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদ দেওয়া হয় তখন জনমনে ভুল বার্তা যায় বৈকি। কোনো কোনো মন্ত্রী/ প্রতিমন্ত্রীর আচরণ ও পারফরম্যান্স নিয়ে তখন গুরুতর প্রশ্ন ওঠে তখন সেই বদনাম কিছুটা প্রধানমন্ত্রীকেও নিতে হয়।
দেশব্যাপী জ্বালানি সংকটের জন্য সরকার অতীতের সরকারের ওপর দায় চাপাতে পারে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া, দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে তৃণমূল পর্যায়ে একের পর এক নেতা-কর্মীর নিহত হওয়ার দায় নিজেদেরই নিতে হবে। প্রবাদ আছে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও ক্ষমতার বাইরে থাকতে বেশ সংযত থাকেন, সরকারের দমনপীড়নেও তারা হতোদ্যম হন না, ঐক্যবদ্ধ থাকেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়েই এই নিরীহ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা হঠাৎ সহিংস হয়ে ওঠেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় সারা দেশে বিএনপির ৩৭ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন।
জ্বালানি সংকটে দেশ বিপর্যস্ত। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।
কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারের কোনো মন্ত্রী-উপদেষ্টা জনগণকে কৃচ্ছ্রতাসাধনের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা সেটি করতে রাজি থাকত, যদি দেখত সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক। কিন্তু যেখানে টাকার অভাবে সরকার বিদেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি কিনতে পারছে না, জনগণকে কৃচ্ছ্রতাসাধনের পরামর্শ দিচ্ছে, সেখানে যুদ্ধবিমান কেনার তোড়জোড় নিয়ে প্রশ্ন না উঠে পারে না। যুদ্ধবিমানের চেয়ে মানুষের কর্মসংস্থান জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনার পক্ষে সরকার যুক্তি দেখাতে পারেন যে, ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাহিদা মেটাতে এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে সেই যুক্তি খাটে না। নতুন যুদ্ধবিমান কেনার আগে আগের যুদ্ধবিমানগুলোর হাল কী, সেটাও মানুষ জানতে চাইবে।
১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য সরকার বেতন ভাতা বাড়িয়েছে, খুবই ভালো কথা। কিন্তু বেসরকারি খাতের সাড়ে চার কোটি মানুষে বেতন ভাতা তো এক টাকাও বাড়ল না। যদিও তাদেরও বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে। বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য সরকারের পরিকল্পনাটাও জানা দরকার।
এরই মধ্যে দুটি উদ্বেগজনক খবর জনগণের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। একটি হলো খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ান হওয়া, গত দুই-তিন বছরে চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। যেখানে সরকার দেড় বছরে ১ কোটি মানুষকে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেখানে কাজে থাকা হাজার হাজার মানুষ বেকার হলো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। এর সবটা দায় হয়তো ছয় মাস বয়সী বিএনপি সরকারের নয়। কিন্তু তারা কতটা বন্ধ কারখানা চালু করতে পেরেছে, সেই প্রশ্ন করা নিশ্চয় অন্যায় হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহ্সান এইচ মনসুর বলেছেন, সরকার বন্ধ কারখানা খুলতে যে ৬০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, এর পুরোটাই পানিতে যাবে।
সরকারের সামনে যে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—জুলাই সনদ ও গণভোট, তা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল মুখোমুখি। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে, যাতে তারা সই করেছে। কিন্তু জুলাই সনদের বাইরে কিছু করবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, সরকার গণভোটের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতেও তারা যোগ দেননি। ফলে পুরোনো রীতিতেই মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত হয়েছে, বিরোধী দলকে সভাপতি পদ না দিয়েই। এখন ‘ডিম আগে না মুরগী আগে’ অবস্থায় চলে গেছে। কতদিনে এবং কীভাবে এই অচলাবস্থার অবসান হবে সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বিরোধী দলকে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে বলেছেন। যেখানে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, সেখানে তাদের কার্যক্রম ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি আছে বলে মনে করে না বিরোধী দল। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকলে আমরা পুরনো সংসদগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে দেখব। আশা করি, তাদের উভয়ের সুমতি হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ বেছে নেবে।
সবশেষে আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সনাতন ধর্মের মানুষেরা কিছু দাবি দাওয়া তুলে ধরেছেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের অন্য মন্ত্রীরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু বলতে কিছু নেই, সবাই সমান বলে মন্তব্য করেছেন। অতীতে যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারাও একই কথা বলতেন। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের সবক্ষেত্রেই বৈষম্যমূলক আচরণ দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু ধারণা জোরালোভাবেই আছে। কেবল কথা নয়, কাজেই প্রমাণ করতে হবে, এ দেশে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। সবাই সমান।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা।