আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জন্মগ্রহণকারী অনিন্দ্যসুন্দর, অমিত বলশালী এবং সর্বগুণসম্পন্ন কৃষ্ণকে ঘিরে গল্পকথা-কিংবদন্তীর শেষ নেই। কৃষ্ণ যেহেতু অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয় কাজে সদা তৎপর- ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, ধর্মজ্ঞ, নিরহংকার, যোগযুক্ত, তপস্বী- সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ, একইসঙ্গে ঈশ্বরাবতারও, তাই তাকে ঘিরে কাব্য-আখ্যান রচিত ও প্রচারিত হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।
চন্দ্রবংশীয় যদুকুলে কৃষ্ণ আজকের তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেকালে আজকের কালপঞ্জি অনুযায়ী বৎসর পরিমাপের প্রচলন হয়নি। প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিতেরা গ্রহ-নক্ষত্রের চলন থেকে কাল নিরূপণ করতেন।
কংসের পিতা উগ্রসেন ছিলেন যাদবদের রাজা। তার রাজ্যের নাম মথুরা। কংসের পিতা বসুদেব ও মা দেবকী। দেবকী ছিলেন উগ্রসেনের ভ্রাতুষ্পুত্রী। ফলে দেবকী ছিলেন কংসের আপন কাকাতো বোন। কংস ছিলেন ভীষণ উচ্চাভিলাষী। ইতোমধ্যে পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে রাজা হন এবং ক্রমে অতি দূরাচারী হয়ে ওঠেন। তিনি যাদবদের ওপর এমন পীড়ন শুরু করেন যে, অনেকে পালিয়ে অন্য দেশে বসবাস শুরু করেন। বসুদেব তার আরেক স্ত্রী রোহিণীকে যমুনা নদীর অপর তীরে অবস্থিত গোকুলনগরে ঘোষপল্লীতে নন্দ নামে এক গোপ ব্যবসায়ীর গৃহে রেখে এসেছিলেন। তিনি বসুদেবের আত্মীয়। সেখানে রোহিণী এক পুত্রসন্তান প্রসব করেন, সেই পুত্রের নাম বলরাম।
উৎপীড়কমাত্রই কাপুরুষ। কাজেই কংস ভেবেছিলেন, যাদব বংশের যেকোনো পুরুষ সন্তানই তার বিপদের কারণ। বিবাহের পর প্রীতিবশত বসুদেব ও দেবকীর রথচালনা করলেও কংস আশংকা করেছিলেন, তাদের সন্তানও তার জন্য একদিন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সে জন্য তিনি তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং কারাগারে জন্মগ্রহণকারী তাদের একের পর এক সন্তানকে কারাগার থেকে নিয়ে হত্যা করতে থাকেন। এভাবে তাদের প্রথম ছয় সন্তানকে কংস হত্যা করেন। সপ্তম গর্ভের সন্তান গর্ভেই বিনষ্ট হয়। দেবকীর অষ্টমগর্ভে শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন। সেটি ছিল রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম তিথি ঘোর ঝড়জলের এক রাত্রি। বসুদেব কংসের হাতে পুত্রের প্রাণসংশয়ের আশংকায় তাকে রাতের অন্ধকারে যমুনার অপর পাড়ে নন্দের গৃহে রেখে আসেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে থাকেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। নিতান্ত বালক বয়সে একবার প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত থেকে তিনি গোকুলের বিপন্ন মানুষজন ও গরু বাছুর গোবর্ধন পর্বতে নিয়ে গিয়ে রক্ষা করেছিলেন।
যাহোক, যশোদার অপার স্নেহে কৃষ্ণ প্রতিপালিত হতে থাকেন। বাল্যকালে তিনি আর ১০টি শিশুর মতই দুরন্ত ছিলেন; অমিত বলশালীও ছিলেন। কৃষ্ণ-বলরাম দুই ভাইয়ের দস্যিপনা করে দিন কাটত। তার বাল্যলীলা নিয়ে ভাগবতকারদের আখ্যানের শেষ নেই। এ সময় গোকুলে বৃক বা নেকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেলে এবং তাতে কৃষ্ণ ও অন্যান্য শিশুর বিপদের আশংকায় নন্দপ্রমুখ পোপেরা গোকুলের বাস উঠিয়ে দিয়ে অধিকতর নিরাপদ স্থান বৃন্দাবনে বসবাস শুরু করেন।
বৃন্দাবনেও কৃষ্ণের দস্যিপনার শেষ ছিল না। তিনি যমুনার একটি দহে বসবাসকারী কালিয় নামে একটি বিষধর সাপকে খুব নাজেহাল করে বিতাড়িত করেন। তেমনি একটি প্রসিদ্ধ আখ্যান হচ্ছে কৃষ্ণের সঙ্গে রাধিকার লীলা। কিন্তু কংসবধের জন্য কৃষ্ণ-বলরামকে যখন মথুরায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কৃষ্ণ নওল কিশোরমাত্র। সে বয়সে রাধিকা নামে ওই গোপবধূর সাথে তার লীলা খেলা নিতান্তই কবি-কল্পনা।
তাছাড়া, কংসবধের পর কৃষ্ণ আর বৃন্দাবনে ফেরেননি। জরাসন্ধের হাতে প্রাণসংশয়ের আশংকায় তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে হিমালয়ের পাদদেশে আঙ্গীরসবংশীয় ঘোর ঋষির কাছে বিদ্যাশিক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন। কারণ, দুরাচারী কংস ছিলেন অমিত পরাক্রমশালী রাজা জরাসন্ধের জামাতা, যিনি ভারতবর্ষের সম্রাট হবার মনোবাসনা পোষণ করতেন। হিমালয়ে একাদিক্রমে ১০ বছর কৃষ্ণ বেদ শিক্ষা, যোগ ও ধ্যান অনুশীলন করে নিখিল বেদ-বেদাঙ্গ পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
ছান্দ্যোগ্য উপনিষদে আমরা এমন উল্লেখ পাচ্ছি, অথচ প্রাচীন ও মধ্য যুগের রসিক গীতি কবিরা তার এই বেড়ে ওঠার কালকে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজিয়ে রাধার সাথে প্রেম করতে কালাতিপাত করতেই দেখেছেন। এ প্রশ্ন তাদের মনে জাগেনি যে, প্রস্তুতি ছাড়া তিনি ভারতবর্ষের অলোক সামান্য সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে উঠলেন কিভাবে? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ আজো কেন তাকে হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রেখেছেন! তার জীবনের মহোত্তম কীর্তি হচ্ছে মহাভারতের যুদ্ধে নিরস্ত্র অবস্থায় দুর্বল পাণ্ডবদের পক্ষাবলম্বন করে যুদ্ধ-পরাঙ্মুখ অর্জুনকে মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে যুদ্ধে রাজি করা এবং সেই অসম যুদ্ধে জয়লাভ করে ভারতবর্ষে ধর্মের প্রতিষ্ঠা করা।
আজ তার জন্মদিন। শুভ জন্মাষ্টমী। এই শুভলগ্নে বিশ্ব মানবতার কল্যাণ কামনা করি। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।
লেখক: সাংবাদিক