বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি সংখ্যার সাফল্য হিসেবে দেখে এসেছি। আর তা হলো–কতজন মানুষ বিদেশে গেলেন। কিন্তু সময় এসেছে প্রশ্নটি উল্টো করে করার। কতজন গেলেন নয়, তারা কত মূল্য সৃষ্টি করলেন?
আন্তর্জাতিক মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ’র সাথে সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলাম। তিনি গ্লোবাল মাইগ্রেশনের একটি চিত্র তুলে ধরলেন এবং হিসাব কষে শুধু প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের তুলনামূলক বিবরণ দিলেন। তিনি বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের ভারতের অভিবাসী নীতিকে গভীরভাবে অধ্যয়নের পরামর্শও দিলেন। তার মতে, বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ (১১ মিলিয়ন) মানুষ বিদেশে কর্মরত এবং তারা বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। বিপরীতে ভারতের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ (১৭ মিলিয়ন) অভিবাসী প্রায় ১৩৫০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স তাদের দেশে পাঠান।
এত বড় ব্যবধান কেবল অভিবাসীর সংখ্যার কারণে হতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে পেশা, দক্ষতা, মজুরি, গন্তব্য বাজার ও সনদের স্বীকৃতিতে পার্থক্য এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে দক্ষতার ভয়াবহ অসামঞ্জস্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমস্যা শুধু কর্মসংস্থান নয়; সমস্যা হলো কম মূল্যের কর্মসংস্থান। এই সত্যটি স্বীকার করতেই হবে। এই সত্য স্বীকার না করলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে আমাদের সাফল্যের গল্পটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
সুতরাং, আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এখনই বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য বিদেশে গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে না। দেশেই বিশেষজ্ঞ আছেন। শুধু লাগবে সঠিক বিশেষজ্ঞকে খুঁজে বের করা এবং যথাযথ মূল্যায়ন করা। যা হোক, যে বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে, তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু এখানে তুলে ধরা হলো। সরকারের নীতি-নির্ধারকগণ চাইলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পরামর্শ প্রদানের সুযোগ রয়েছে।
‘দক্ষ’ বললেই দক্ষ কর্মী হয় না
বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো, কর্মীদের ‘দক্ষ’ ও ‘অদক্ষ’–এই দুই ভাগে দেখার প্রবণতা। প্রকৃতপক্ষে ‘বাস্তব শ্রমবাজার’ এত সরল নয়। উদাহরণস্বরুপ, একজন প্রশিক্ষিত ইলেকট্রিশিয়ান যদি বিদেশে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন, একজন ওয়েল্ডার যদি হেলপার হিসেবে কাজ করেন কিংবা একজন কারিগরি সনদধারী কর্মী যদি তার যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচের পেশায় নিযুক্ত হন, তাহলে কাগজে তিনি দক্ষ হলেও অর্থনীতিতে তার দক্ষতা অপচয় হচ্ছে। সেজন্য, এখন থেকেই বাজারের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দক্ষতা বা ওভারকোয়ালিফিকেশন; প্রয়োজনের চেয়ে কম দক্ষতা বা আন্ডারকোয়ালিফিকেশন; দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করতে না পারা, অর্থাৎ, স্কিল আন্ডারইউটিলাইজেশন এবং দক্ষতা ও কাজের মধ্যে অসঙ্গতি বা অকুপেশনাল মিসম্যাচ–এসব বিষয় আলাদাভাবে পরিমাপ করতে হবে। গন্তব্য দেশে একজন বাংলাদেশি আসলে কী কাজ করছেন–এই তথ্যকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। এই কাজটি বিএমইটি-এর (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) জন্য আর কোনো ঐচ্ছিক গবেষণা নয়, এটি হওয়া উচিত জাতীয় নীতির প্রথম শর্ত। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে তার অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও শ্রম কূটনীতির অংশ হিসেবে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ইকোনমিক মিশনগুলোর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে হবে।
আজকের নয়, আগামী পাঁচ বছরের বাজার ধরতে হবে
মনে রাখতে হবে, বিষয়টি শুধু আজকের জন্য নয়; দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান চাহিদা দেখে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে এআই, রোবোটিকস, অটোমেশন, গ্রিন ট্রানজিশনের পাশাপাশি জনসংখ্যার গড় বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে যেমন কিছু পেশা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে বয়স্কদের যত্ন, নার্সিং, শিল্প তদারকি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অ্যাডভান্সড ওয়েল্ডিং, মেকাট্রনিকস, আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তার মতো পেশার চাহিদা বাড়ছে।
সুতরাং প্রশ্ন এটি হওয়া উচিত নয় যে, আজ কোথায় শ্রমিকের চাহিদা আছে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত–তিন থেকে পাঁচ বছর পর কোথায় কত দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হবে?
এর জন্য বিএমইটি-র অধীনে অবিলম্বে বৈশ্বিক পরিসরে অভিবাসীদের দক্ষতার সম্ভাব্য চাহিদা সম্পর্কিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা গড়ে তোলা দরকার। ২০-৩০টি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য দেশের চাকরির সুযোগ, মজুরি, ভিসা নীতি ও চাকরিদাতার চাহিদা ছয় মাস পরপর বিশ্লেষণ করে জাতীয় প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কাজটি করা খুব কঠিন নয়। শুধু দরকার সদিচ্ছা। এ জন্য প্রচুর বাজেটের প্রকল্পও দরকার পড়বে না। বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই দক্ষ নীতি-বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ সঠিকভাবে নিয়োগের মাধ্যমে সহজেই তা করা সম্ভব।
শ্রমিক রপ্তানির গন্তব্য বদলাতে হবে
বাংলাদেশের অভিবাসন এখনো তুলনামূলক কম মূল্যের কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অন্যদিকে ফিলিপাইন, ভারত ও ভিয়েতনাম উচ্চমূল্যের স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, প্রকৌশল, উচ্চ দক্ষতার উৎপাদন খাত, ম্যারিটাইম ও বিশেষায়িত সেবার বাজারে ঢুকে পড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাই বাংলাদেশকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ শ্রমঘাটতিসম্পন্ন উচ্চমজুরির বাজারে পরিকল্পিতভাবে প্রবেশ করতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দরকার। ‘কতজন কর্মী পাঠানো হলো’–এটি আর প্রধান মূখ্য মানদণ্ড (কেপিআই) হতে পারে না। কেপিআই হতে হবে–অভিবাসীর গড় আয়, রেমিট্যান্স, উচ্চ মজুরির পেশায় কর্মসংস্থানের হার, দক্ষতার সঙ্গে পেশার সামঞ্জস্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের হার। অর্থাৎ, অভিবাসনের পরিমাণ থেকে গুণগত অভিবাসনের দিকে যেতে হবে।
সনদ স্বীকৃত না হলে দক্ষতাও মূল্যহীন
বাংলাদেশি কর্মীর বাস্তব দক্ষতা থাকলেও গন্তব্যদেশে তার যোগ্যতা স্বীকৃত না হলে তিনি উচ্চ মজুরির চাকরি পাবেন না। সনদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতার অর্থনৈতিক মূল্য কমে যায়। তাই বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি) ও বিএমইটি-র প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক যোগ্যতা কাঠামোর (আইকিউএফ) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতির সমঝোতা (মিউচ্যুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট বা এমআরএ) সম্পাদনকে শ্রম কূটনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ভাষাকেও আর ‘অতিরিক্ত দক্ষতা’ হিসেবে দেখলে চলবে না। জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান কিংবা কারিগরি ইংরেজি–গন্তব্যভিত্তিক ভাষা দক্ষতা এখন ‘মার্কেট অ্যাকসেস টুল’ বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের হাতিয়ার। এভাবেই বিবেচনা করতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একজন কর্মীকে ছয়টি দক্ষতার সমন্বয়ে তৈরি করতে হবে
আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কর্মী শুধু একজন ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার বা কেয়ারগিভার নন। তার একই সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল জানাবোঝা, কর্মক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভাষার ব্যবহার, পেশাগত নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, প্রশিক্ষণের দর্শন বদলে ‘সিঙ্গেল স্কিল’ থেকে ‘স্কিল বান্ডেল’-এ যেতে হবে। অর্থাৎ, কোনো একক দক্ষতার বদলে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পথ তৈরি করে দিতে হবে।
দক্ষতার অপচয়ের দাম কে দেবে?
স্কিল মিসম্যাচ-এর ফলে একজন অভিবাসী সম্ভাব্য আয়ের ৩০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারেন। এজন্য নীতি কাঠামোতে এই হারানো আয় (ওয়েজ পেনাল্টি) পরিমাপের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সেভাবেই পরিকল্পণা ও নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ, এই ক্ষতি শুধু একজন শ্রমিকের নয়। এর অর্থ হলো–কম পারিবারিক আয়, কম রেমিট্যান্স, কম বৈদেশিক মুদ্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির কম মূল্য আহরণ। এর প্রভাব বিশাল। বিষয়টিকে সেভাবেই বিবেচনায় নিতে হবে।
তাই এখন একটি ন্যাশনাল ওয়েজ পেনাল্টি ইনডেক্স তৈরি করতে হবে। আর পরিমাপ করতে হবে–দক্ষতার সঙ্গে কাজের অসামঞ্জস্যের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর কত আয় হারাচ্ছে।
সবচেয়ে জরুরি কাজ: অভিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার পূর্বাভাসের একটি মডেল তৈরি করা। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় পূর্বাভাস কাঠামো, যা বৈশ্বিক জনমিতি, প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ, বিভিন্ন পেশা খাতে সৃষ্ট ঘাটতি, মজুরি, ভিসা রেজিমস, নিয়োগকর্তার চাহিদা এবং দেশের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করবে। এই মডেল পাঁচ ও দশ বছরের পূর্বাভাস দিয়ে সরকারকে সরাসরি সিদ্ধান্তের পথ দেখাবে যে, কোন পেশায় কতজন প্রশিক্ষণ পাবে, কোন ভাষায় কতজন দক্ষ হবে, কোন দেশে কর্মী পাঠানো হবে এবং কোন যোগ্যতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে হবে।
এখানেই বিএমইটি-এর জন্য সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তনের জায়গা। এখন থেকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ হবে পূর্বাভাসের মাধ্যমে। অনুমান দিয়ে নয়।
আর অজুহাতের সুযোগ নেই
পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যেই গন্তব্যদেশভিত্তিক স্কিল মিসম্যাচ সম্পর্কিত জরিপ, অন্তত ২০ দেশের চাহিদা কাঠামো এবং বিএমইটির-এর কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোয় অপ্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কিত নিরীক্ষা শুরু করা সম্ভব। ১৮ মাসের মধ্যে দক্ষতাসমূহের শিক্ষাক্রম, ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন পাথওয়ে ও এমআরএ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। ৩৬ মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণের জন্য আসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস-কাঠামোকে যুক্ত করা সম্ভব।
অতএব, এখন প্রয়োজন আরেকটি কমিটি, আরেকটি সভা কিংবা আরেকটি সাধারণ প্রকল্প নয়। প্রয়োজন নীতি পরিবর্তনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বর্তমান বিপুল ম্যান্ডেট পাওয়া সরকারকে ঠিক করতে হবে–আমরা কি শুধু বেশি মানুষ বিদেশে পাঠাব, নাকি বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে এমন মানুষ বিদেশে পাঠাব? দুই নীতির পার্থক্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পার্থক্য তৈরি করবে।
বিদেশে কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ব্যবহার। কিন্তু সঠিক দক্ষতা ও সঠিক বাজারে কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি করবে। তাই এখনই সময়–কতজন গেল; এই পুরনো প্রশ্ন বাদ দিয়ে–প্রতি অভিবাসী কত মূল্য সৃষ্টি করল’–এই নতুন প্রশ্নকে জাতীয় অভিবাসন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের।
সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সামনে সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট–শ্রম রপ্তানির সংখ্যা বাড়াবেন, নাকি বাংলাদেশের মানুষের শ্রমের আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়াবেন?
লেখক: গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস এক্সপার্ট ও অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়