অবশেষে ঘোষণা হয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল। মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাসের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে গেজেটও জারি করা হয়ে গেছে। এই অস্থির অর্থনৈতিক সময়ে দেশের একটি নির্দিষ্টসংখ্যক চাকরিজীবীর বেতন বাড়ছে—এটি অন্তত একটি খুশির খবর। এতে দেশের বেশ বড় পরিমাণের মানুষ স্বস্তি পাবে, উপকৃত হবে।
কথা হলো, সরকারি চাকরিজীবীর বাইরেও এ দেশে আরও পেশাজীবী আছে। সেই পরিমাণটি অনেক গুণ বেশি। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে অন্তত ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকার মনে করে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর তুলনায় বেসরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সংক্রান্ত নিখুঁত পরিসংখ্যান একেবারে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় নানা অনুমিত পরিমাণ। সরকারি খাত বাদে সবই বেসরকারি খাত। এবং সেই হিসাবে সংখ্যা কয়েক কোটি পার হওয়ার কথা। বেসরকারি খাতে চাকরির ক্ষেত্রে কেবল একটি শ্রম আইন ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এক্ষেত্রে বেতন–ভাতাও বাজার ঠিক করে দেয় মূলত। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বেতন–ভাতার ক্ষেত্রে এমনটাই হওয়ার কথা। তবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, শ্রম আইনও খুব বেশি প্রতিষ্ঠান ঠিকঠাক অনুসরণ করে না। আর সেসব নিয়ে সরকারি দেখাশোনাও তেমন কঠোর নয়। ফলে বেসরকারি খাত একেবারেই চলে মালিকপক্ষ ও বাজারের খেয়াল–খুশি অনুযায়ী। এখানে চাকরির নিশ্চয়তাও পদ্মপাতায় জমা শিশির বিন্দুর মতো, যে কোনো সময় টলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় অর্থ উপার্জনের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর সরকারি চাকরি সে কারণেই সোনার হরিণ বনে যায়। কারণ সরকারি চাকরি হারানো খুব কঠিন! বাংলাদেশে তো আরও বেশি। গত ৫৪ বছরের ইতিহাসে বোধহয় গত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরই সরকারি চাকরি হারানোর ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তা নইলে কর্মস্থলে দিনের পর দিন উপস্থিত না থাকার পরও, কোনো কাজ না করার পরও, সরকারি চাকরি রয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গত দুই দশকের বেশি সময় ধরেই আমাদের দেশে সরকারি চাকরির দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি বেশি। আগে ক্ষমতা থাকলেও, বেতন-ভাতা কিছুটা কম ছিল সরকারি চাকুরেদের। তবে ২০১৫ সালের পে কমিশনে বেতন বৃদ্ধির পর থেকে দুই পাল্লাই প্রায় সমান সমান। সেই সঙ্গে আবাসন থেকে শুরু করে সহজ শর্তে ঋণ পর্যন্ত অন্যান্য বিভিন্ন সুবিধা তো আছেই। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক– সব ধরনের মর্যাদার দিক থেকেই সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে অনেকাংশে এগিয়ে গেছেন সরকারি চাকুরেরা। তাই ক্যাডার হোক বা নন-ক্যাডার–শিক্ষার্থীরা চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য করে সরকারিকেই।
আশা করা যায়, এ দেশে সরকারি চাকরি আদতে কী, তা বোঝা যাচ্ছে নিখুঁতভাবে। সেই সরকারি চাকুরেদের এবার বেতন বাড়ল। গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এর প্রস্তাব উঠেছিল। বিএনপি সরকারের আমলে তা চূড়ান্ত হলো। প্রস্তাবের তুলনায় খুব বেশি বদল হয়নি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে। কিছুটা উনিশ–বিশ হয়েছে বেতনবৃদ্ধির মোট পরিমাণে, আর বাস্তবায়নের পদ্ধতি কিছুটা বদলেছে। নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমোদিত নতুন বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। নতুন বেতন স্কেলের পাশাপাশি অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন স্ল্যাবভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসব সিদ্ধান্ত চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হবে। নতুন বেতনস্কেল এ বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় তা একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে না। চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বল্প আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন এই পে–স্কেল হলো প্রায় ১১ বছর পর। ২০১৫ সালের ওই পে–স্কেলের পরই সরকারি চাকরি তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল বেশ। বর্তমানের পে–স্কেল সেই আকর্ষণ আরও বাড়াবে বৈকি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, সেই সাথে বেসরকারি খাতের সাথে সরকারি খাতের চাকুরেদের মধ্যে তৈরি হওয়া এক ধরনের বৈষম্যও বাড়বে। কারণ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় বেসরকারি খাত অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে এই খাত জেরবার। আবার মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাজার অর্থনীতিও ধুঁকছে। মানুষের খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না সেই গতিতে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিবৃতিতে বলছে, সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ মূল্যস্ফীতি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যা ইতিমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দিশেহারা স্বল্পআয়ের কর্মজীবী নারী-পুরুষসহ সাধারণ জনগণের দুর্দশা আরো বাড়ার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন আশঙ্কা হওয়ার কারণ হলো, টানা সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়েনি। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের এখন টানাটানির সংসার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। এতে করে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আর ‘জীবনযুদ্ধ’ থেকে বের হতে পারছে না। সংগ্রাম বরং আরও বহুমাত্রিক হচ্ছে, মানিয়ে নেওয়ার লড়াই চালিয়েই যেতে হচ্ছে। তা এমন পরিস্থিতিতে যখন একটি নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ জমা হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাজারে সংকট আরও বাড়বে। বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
এখন এই সংকটের আশঙ্কা কিন্তু সরকারের তরফেও দেখা যাচ্ছে। সরকার চিন্তায় আছে এবং বেসরকারি খাত নিয়েও ভাবছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদনের পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তবে স্বাভাবিকভাবেই সেটি ঠিক করা খুব একটা সহজ কাজ নয়।
প্রাথমিকভাবে তাই সরকারি খাতের মজুরিবৃদ্ধির অভিঘাত ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সাথে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের অগত্যা খাপ খাইয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। যে কোনো কিছুই কেউ যদি অনন্যপায় হয়ে করে, তাহলে তাতে কিছুটা হলেও ক্ষোভের সঞ্চার হয়। কারণ তাতে মন থেকে সায় থাকে না। এরপরও হয়তো এই দেশের বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষ তা মেনে নিত অবলীলায়, যদি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনবৃদ্ধির সাথে সাথে সরকারি সেবার মানবৃদ্ধির সরাসরি সংযোগ থাকত, যদি সরকারি সেবাখাতে দুর্নীতি কমত। দিনশেষে এই বাড়তি বেতন বেসরকারি খাত থেকেই আসবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি মানুষগুলো অন্তত বাড়তি বেতন জোগানের কার্যকারণটা মেনে নিতে পারত।
সমস্যা হলো, বেতনবৃদ্ধির সাথে সরকারি সেবার মানবৃদ্ধির নিশ্চয়তা আদতে নেই। সরকারের আশা, নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি, দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইতিপূর্বে সর্বশেষ ২০১৫ সালে বাস্তবায়িত অষ্টম পে স্কেলের ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে একই আশাবাদ ছিল, কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিপরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের ব্যাপকতা ও গভীরতা বেড়েছে অধিকতর হারে। এবার অন্তত তার ব্যতিক্রম হবে-এই বিশ্বাস করতে চাই। এক্ষেত্রে সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক চর্চায় পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা না হলে, সরকারি খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে জনগণের পরিত্রাণের উপায় নেই। অথচ দুর্নীতির ভুক্তভোগী জনগণের অর্থেই সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতাসহ সকল ব্যয় বহন করা হয়।’
পরিসংখ্যান, জরিপও খুব একটা আশা দেখায় না। ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৪তম। ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মেয়াদে সার্বিকভাবে ৭০.৯ শতাংশ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং সেবাখাতে দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্থ খাত হলো পাসপোর্ট, বিআরটিএ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা ও ভূমি খাত। সর্বোচ্চ ঘুষ গ্রহণকারী তিনটি খাত হলো: পাসপোর্ট, বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আমাদের দেশে যেসব সেবাখাত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, তার সবই সরকারি। সাধারণ মানুষদের বেশি ঘুষও দিতে হচ্ছে এসব খাতে। অর্থাৎ, সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য সরকারি চাকুরেদের বেতন দিতে একদিকে কর দিচ্ছে নাগরিকেরা। অন্যদিকে সেই সেবা পাওয়ার জন্য যাতে হয়রানি না হয়, তার জন্য উপরি অর্থও দিতে হচ্ছে টেবিলের নিচ দিয়ে। একেই বোধহয় নিখুঁত ‘ট্র্যাজেডি’ বলে! এবং আরও ট্র্যাজিক বিষয় হলো, এসব সমস্যা কোনো সরকারই কখনো সমাধান করতে পারেনি। বরং সব আশ্বাস কেবলই কথার কথা থেকে গেছে। ফলে আশ্বাসে আর বিশ্বাস করার মানুষও খুব একটা নেই।
অবশ্য সরকারি চাকরিজীবীদের পে–স্কেল নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ভার্চুয়াল ও রিয়েল দুনিয়ায় এখন একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। শুনতে হয় ‘হিংসা হয়?’ ঘরানার প্রশ্ন। আদতে হিংসা হওয়ার তো কিছুই নাই। যে কারও বেতন বৃদ্ধি একটি খুশির সংবাদ। তবে কারও কারও খুশি যদি অন্য একটি বিশাল অংশের মানুষকে আরও অসহায় ও প্রান্তিক করার দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে প্রশ্ন তোলাটা জায়েজ।
কারণ, দিন শেষে ওই বিশাল অংশের মানুষগুলোর কারণেই দেশটা চলে, অর্থনীতি টিকে থাকে।
এখন তারাই যদি নাই হওয়ার পথে চলে যায়, তবে আর বাড়তি বেতন জোগাবে কে? নাই হওয়া মানুষদের ভূতে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা