২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। ওই আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। বাংলাদেশে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ঘটনার মীমাংসা এবং মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের অনুভূতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) পুনরায় চালু করা হয়।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন অনুযায়ী ২০১০ সালে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার বিচার করা।
তবে শুরু থেকেই ট্রাইব্যুনালটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে ২০১১-১২ সালে এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে অভিযোগ ওঠে, ১৯৭১ সালের অপরাধের বিচারের নামে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করতে ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সমালোচকদের কাছে আইসিটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বছর তিন সাংবাদিক এবং একজন সেক্যুলার লেখককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে এসব অভিযোগ আনা হয়।
এই সাংবাদিকরাই সাধারণ আদালতে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হত্যা মামলার অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে তারা।
মানবাধিকার আইনজীবী ও আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটরের সাবেক উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর যথাযথ হিসাব-নিকাশ জরুরি। এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
তবে তার মতে, ভুক্তভোগী ও দেশের মানুষ এমন একটি বিচারপ্রক্রিয়ার অধিকার রাখে, যার লক্ষ্য হবে সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার ও মীমাংসা—প্রতিশোধ নয়। এ কারণে বিচারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা জরুরি। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ, আইনজীবীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগের সুযোগ এবং আটক রাখার সিদ্ধান্তের অর্থবহ বিচারিক পর্যালোচনা থাকা প্রয়োজন।
আইনি মামলায় জড়িয়ে পড়া সাংবাদিকরা
বাংলাদেশের চার সাংবাদিক-ফারজানা রূপা, তার স্বামী শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত এবং লেখক শাহরিয়ার কবির গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৪ সাল থেকে তারা সবাই কারাগারে রয়েছেন।
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিমানবন্দর থেকে ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। পোশাকশ্রমিক ফজলুলের মৃত্যুর ঘটনায় করা একটি হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক মাসে নতুন নতুন মামলায় তাদের একাধিকবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রূপার বিরুদ্ধে নয়টি এবং শাকিলের বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যা মামলা রয়েছে।
মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবিরকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট একই ধরনের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বীকার করেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলাগুলো ‘তাড়াহুড়ো করে’ করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের ২৬ জুন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আরও বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি জানান, ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব মামলা ‘সরকার শুরু করেনি, সাধারণ নাগরিকরা করেছেন’। তিনি আরও বলেন, “আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি, পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে কাউকে গ্রেপ্তার করা উচিত নয়।”
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়। ইশতেহারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা বন্ধ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার এবং নির্যাতন ও হত্যার শিকার সাংবাদিকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
তবে এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই এখনো ওই চার সাংবাদিক ও এক লেখকের জন্য স্বস্তি বয়ে আনেনি।
২০২৪ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকে অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার জামিনের আবেদন করেছেন। এসব আবেদনে বলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই এবং প্রাথমিকভাবে মামলা চালানোর মতো ভিত্তিও নেই। এ ছাড়া কয়েকজন আসামির বয়স বেশি অথবা তারা গুরুতর অসুস্থ বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক শাহরিয়ার কবিরের বয়স ৭৫ বছর। অন্যদিকে মোজাম্মেল বাবু ক্যানসারে আক্রান্ত।
শাহরিয়ার কবির ও মোজাম্মেল বাবুর জামিনের আবেদন বারবার নাকচ হয়েছে।
২০২৬ সালের ১১ মে ঢাকার হাইকোর্ট রূপাকে ছয়টি মামলায় এবং শাকিলকে পাঁচটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। পরে আপিল বিভাগ রূপা ও শাকিলের ওই জামিন স্থগিত করেন।
চলতি বছরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবিরকে পৃথক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রথম মামলাটি ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের অভিযান নিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিবেদন এবং পরে তৈরি করা একটি তথ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে। এতে রূপা, বাবু ও কবিরকে আসামি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় আইসিটি মামলাটি ২০২৬ সালের আগস্টে শুরু হয়। এতে রূপা, বাবু ও দত্তকে আসামি করা হয়। ২৫ আগস্ট এই মামলার শুনানিতে তাদের ওই মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক ধারায় আইনি কার্যক্রম চলছে। সাধারণ ফৌজদারি মামলাগুলো নিয়মিত আদালতে চলছে, যেখানে জামিন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আইসিটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর জন্য পৃথক আইনি কাঠামো রয়েছে। এসব মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই অনিশ্চয়তা কারাবন্দীদের পরিবারগুলোর ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। রূপা ও শাকিলকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন তার মেয়ে মনফুলের বয়স মাত্র ১৭ বছর ছিল। গত দুই বছর ধরে তাদের মুক্তির জন্য কাজ করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
মনফুল বলেন, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময় তার মাথায় একই প্রশ্ন ঘুরত— “আজ কি মা বা বাবা বাড়ি ফিরবেন?”
তার ভাষায়, তিনি এমন এক আতঙ্কের মধ্যে আছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণ কথাবার্তা, পরিবারের সঙ্গে ঘরে রান্না করা খাবার খাওয়া কিংবা জন্মদিন পালন—যেসব বিষয় অধিকাংশ পরিবার স্বাভাবিক জীবনের অংশ বলে ধরে নেয়, সেগুলো তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।
মনফুল বলেন, “প্রতিদিন অপেক্ষা করতে করতে আমি বদলে গেছি। বাংলাদেশে আমার বাবা-মায়ের মতো মামলা অনেক দিন ধরেই একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে এবং আরও অনেক পরিবার এর মধ্য দিয়ে গেছে। আমার মনে হয়, এমন একটি বিষয়ের কারণে আমি আমার শৈশব হারিয়েছি, যার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমি শুধু আশা করি, একদিন এর শেষ হবে।”
রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আইসিটি: বারবার ফিরে আসা রাজনৈতিক ধারা
একাধিক হত্যা মামলা থেকে সাংবাদিকদের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে যাওয়া একটি বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন। ১৯৭৩ সালের আইসিটি আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলার অংশ হিসেবে সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে বোঝায়।
কোনো প্রতিবাদকে ‘উসকানিমূলক’ হিসেবে তুলে ধরা, একটি টেলিভিশন তথ্যচিত্র তৈরি করা কিংবা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংবাদ সম্মেলনে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে কঠিন বা সরাসরি প্রশ্ন করা—এসব কর্মকাণ্ড ওই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না বলে লেখকদের যুক্তি।
আন্তর্জাতিক আইনে (রোম সংবিধিতে) কোনো অপরাধকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে হলে তা কোনো ‘ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলার’ অংশ ছিল কি না—তা প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী অতীতে এটি প্রমাণের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
২০১০-১১ সালের বিচারপ্রক্রিয়ার সময় আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের আইনে থাকা এই ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছিল। তবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া আবদুল কাদের মোল্লা বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলার রায়ে এই শর্তটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মামলাটি ছিল আইসিটি-বিডি মামলা নম্বর ০২/২০১২ থেকে উদ্ভূত।
এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ দেশীয় মানদণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার সুযোগ ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার আইসিটি অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইনে থাকা অপরাধের সংজ্ঞাগুলো রোম সংবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বাস্তবে এসব আইনি মানদণ্ড কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার কিছু দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্রেপ্তার, আটক বা জামিনসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। সংবিধানের কিছু মৌলিক সুরক্ষাও আইসিটি আইনের অধীনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্থগিত থাকে। এর মধ্যে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকারও রয়েছে।
এ ছাড়া আইসিটি আইনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা করে সাজার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে একটি তথ্যচিত্রের প্রযোজক এবং ব্যাপক নৃশংসতার জন্য দায়ী একজন অপরাধী—উভয়ের ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ শাস্তি একই, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড।
এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাদের মক্কেলদের গ্রেপ্তার দেখানোর পরও অভিযোগের সমর্থনে লিখিত কোনো নথি তারা পাচ্ছেন না। অভিযোগপত্র দাখিল হতে কয়েক মাস কেটে যাচ্ছে। ফলে এর আগে কার্যকরভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না।
রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
টবি ক্যাডম্যানের ভাষায়, প্রকৃত ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন ‘প্রসিকিউশনের শৃঙ্খলা’। তার ব্যাখ্যা, শক্ত প্রমাণের ভিত্তি থাকলেই কেবল অভিযোগ আনা উচিত। সেই ভিত্তি ছাড়া করা কোনো মামলা শুধু ব্যর্থই হয় না, বরং যেসব মামলা সফল হওয়ার মতো যথেষ্ট ভিত্তি রাখে, সেগুলোকেও দুর্বল করে দেয়। একই সঙ্গে এটি এমন এক ধরনের সন্দেহ তৈরি করে, যা ট্রাইব্যুনাল কোনোভাবেই বহন করতে পারে না।
১৯৭৩ সালের আইনটি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিচারের জন্য। এক দশক আগের কোনো টেলিভিশন সম্প্রচার বা একজন সাংবাদিকের করা প্রশ্নের ক্ষেত্রে একই আইনি কাঠামো প্রয়োগ করলে এটিকে সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ারে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাংবাদিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে ইতিমধ্যে বিচারিক নজির রয়েছে।
ক্যাডম্যান বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান স্পষ্ট ও কঠোর। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিচারিক নজির প্রতিষ্ঠা করেছে যে কোনো প্রতিবেদন, মন্তব্য বা সম্পাদকীয় অবস্থানের কারণে—তা যতই পক্ষপাতদুষ্ট হোক না কেন অপরাধের দায় তৈরি হয় না।’’
রুয়ান্ডার আরটিএলএমের সম্প্রচারকদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, কারণ তারা শনাক্ত করা ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও গাড়ির নিবন্ধন নম্বর সম্প্রচার করেছিল, যাতে তাদের খুঁজে বের করে হত্যা করা যায়। এসব হত্যাকাণ্ড তখন চলছিল। এমনকি সেই পরিস্থিতিতেও নাহিমানার মামলায় আপিল চেম্বার বিচারিক রায়ের একটি বড় অংশ বাতিল করেছিল।
আদালত বলেছিল, কোনো অপরাধ সংঘটনের সরাসরি আহ্বানে না পৌঁছানো ঘৃণাত্মক বক্তব্যকে উসকানি হিসেবে গণ্য করা যায় না। একইভাবে, কোনো সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানে একজনের উচ্চ পদে থাকা তার নিজের অবদান, উদ্দেশ্য ও জ্ঞান সম্পর্কে প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
ক্যাডম্যানের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যকে অবশ্যই যে ব্যাপক বা পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে, তার অংশ হতে হবে। এটাই মূল আইনি মানদণ্ড। বাংলাদেশেও এই মানদণ্ড এমনভাবেই প্রয়োগ করা উচিত, যেভাবে বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গায় করা হয়।
প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এমন একটি সুযোগ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে পূর্ববর্তী শাসকদের অপরাধী বানানোর ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
একটি টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, যেখানে একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হবে। পাশাপাশি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রমাণনির্ভর ও সুনির্দিষ্টভাবে মামলা পরিচালনা এবং অপরাধী, রাজনৈতিক সহযোগী ও সাংবাদিকদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।
বাংলাদেশকে একটি নীতিনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তখনই আনা উচিত, যখন প্রমাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দায়ের ধরন প্রতিষ্ঠিত হয়।
আর অভিযোগ যদি সাধারণ সাংবাদিকতা বা পেশাগত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে আদালতের উচিত প্রচলিত জামিনের বিধান অনুযায়ী তাদের মুক্তির নির্দেশ দেওয়া, ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন মামলা না দেওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সুযোগ দেওয়া।
এই ন্যায়বিচারের উদ্যোগকে প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। ২০১২ সালে বাংলাদেশ এই ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। এরপর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আইসিটির কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন সংস্কার আনা হয়েছে। তবে বাস্তবে ট্রাইব্যুনাল এসব আইনি মানদণ্ড কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারিক যুক্তি যাচাই হবে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে:
একটি তথ্যচিত্র বা সংবাদ সম্মেলনে করা একটি প্রশ্নকে কি গণহত্যা বা ব্যাপক নৃশংসতার মতো গুরুতর অপরাধের সমান মাত্রায় বিবেচনা করা হবে, নাকি ট্রাইব্যুনাল এ দুটির মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য বজায় রাখবে?
লেখক
জুলিয়া ওয়েজেমান—আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী।
শাহনেওয়াজ পাটোয়ারী—বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আর্টিকেল ১৯ বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার সাবেক প্রোগ্রাম প্রধান।
লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত।