বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিক করতে চীন থেকে একঝাঁক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। চলতি মাসে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে যে, দেশের প্রতিরক্ষা খাতে সাম্প্রতিক অতীতে এত বড় কেনাকাটার ঘটনা বলতে গেলে নেই।
এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে অনেক শক্তিশালী করে তুলবে। প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্কও আরও দৃঢ় করবে। তবে এর একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। এই ফাইটার জেটগুলো বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হলে দেশের সামরিক প্রতিরক্ষা অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে চীনের তৈরি অস্ত্র, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর।
যুদ্ধবিমানগুলো কেনার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে একটি খসড়া প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কেনাকাটার এই প্যাকেজে আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহনের হেলিকপ্টার ও চালকবিহীন বিমান ব্যবস্থাও (ড্রোন) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলমান অর্থবছরেই এই ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তা না হলে এটি পরবর্তী বাজেট চক্রে গড়াবে।
বাংলাদেশ ২০ থেকে ২৪টি বিমান কেনার কথা ভাবছে। বিমানগুলোর মূল দাম ধরা হয়েছিল ৬ কোটি ২৭ লাখ মার্কিন ডলার, তবে প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস, অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে অঙ্কটা প্রায় ১১ কোটি ৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
বিমানগুলো কিনতে বাংলাদেশ এত আগ্রহী হলো কেন? ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় জে-১০সিই-এর পারফরম্যান্সকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, সেটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। সে সময় পাকিস্তানের দাবি ছিল, এই বিমানগুলো রাফালসহ ভারতীয় কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সাহায্য করেছিল, যদিও এ নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। চীন জে-১০ সি বিমানের রপ্তানিযোগ্য যে সংস্করণ (জে-১০সি-ই) বানিয়েছে, অন্য দেশের মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু পাকিস্তানই সেটি ব্যবহার করার কথা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের এই জে-১০সিই যুদ্ধবিমান নিজেদের বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনাটি কেবল তাদের ফাইটার বহরের আধুনিকীকরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ছবি: সংগৃহীত
সে কারণে বাংলাদেশের এই জে-১০সিই যুদ্ধবিমান নিজেদের বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনাটি কেবল তাদের ফাইটার বহরের আধুনিকীকরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, যুদ্ধবিমানটির পূর্ণ সামরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে গেলে দেশটি চীনের প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধব্যবস্থার সাথে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলের দিক থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান কমে এলেও, সামরিক সহায়তার দিক থেকে চীনের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেড়ে যাবে।
এর আগে ‘এশিয়া টাইমস’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশ তাদের এফ-৭ ও মিগ-২৯-এর মতো পুরনো যুদ্ধবিমানে ভরা বহরকে আধুনিক করতে চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে বানানো ‘জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩’ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। এই বিমানগুলোতে (জেএফ ১৭) দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা শত্রুবিমানে আঘাত হানার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন (বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ বা বিভিআর মিসাইল) ও উন্নত অ্যাভিওনিক্স ব্যবস্থা (রাডার, সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেভিগেশন সিস্টেম ইত্যাদি– এক কথায়, যুদ্ধবিমানের মস্তিষ্ক) রাখা হয়েছে।
জেএফ-১৭ কেনা হলে, সে ক্ষেত্রে, জে-১০সি এবং জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান দুটি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একদিকে তুলনামূলক ভারি জে-১০ আকাশে দাপট প্রতিষ্ঠা, আধুনিক রাডার এবং আরও দারুণ অ্যারোডায়নামিক পারফরম্যান্সের দিকে জোর দেবে, অন্যদিকে তুলনায় হালকা জেএফ-১৭ হয়ে উঠবে এমন একটা মাল্টিরোল (যে যুদ্ধবিমান উড়ন্ত অবস্থায় আকাশ ও মাটিতে থাকা শত্রু স্থাপনায় আঘাত করতে পারে) প্ল্যাটফর্ম যেটার খরচ কম, সহজে রক্ষণাবেক্ষণও করা যায়।
এই দুটি মডেলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে সেটা বাংলাদেশকে একটা ‘হাই-লো ফাইটার মিক্স’ (অর্থাৎ, কিছু উচ্চক্ষমতার কিন্তু ব্যয়বহুল জেটের পাশাপাশি তুলনায় কম ক্ষমতার কিন্তু খরচেও কম জেট রাখা) দেবে, যেখানে আকাশে দাপট প্রতিষ্ঠার তুলনামূলক জটিল মিশনগুলোতে জে-১০ যুদ্ধবিমান আর আকাশপথে রুটিন নজরদারি ও হামলার কাজে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানকে কাজে লাগানো হবে।
একদিক থেকে দেখলে, বিমানবাহিনীর বহরকে আরও আধুনিক করার ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা বাংলাদেশের জন্য যৌক্তিক; কারণ এগুলোর খরচ তুলনামূলকভাবে কম, পাশাপাশি চীনের কাছ থেকে যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধযান কেনা এবং পরিচালনায় বাংলাদেশের অনেক বছরের অভিজ্ঞতা আছে।
এখানে অবশ্য একটা কথা থাকে। ২০২৫-এর মে মাসে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জে-১০সি-র যে কথিত পারফরম্যান্স, সেটা যতটা যুদ্ধবিমানটির নিজস্ব ক্ষমতার কারণে হয়েছে, ঠিক ততটাই নির্ভরশীল ছিল বিমানটিকে ঠিকমতো কাজ করার জন্য বানানো সামগ্রিক কমব্যাট নেটওয়ার্কের (অন্য যুদ্ধবিমান, আকাশে থাকা নজরদারি বিমান, স্যাটেলাইট, কন্ট্রোল টাওয়ার ইত্যাদির নেটওয়ার্ক) ওপর। পাকিস্তান ওই যুদ্ধবিমানগুলো চালিয়েছে চীনের বানানো একটা বিশাল ইকোসিস্টেমে (যুদ্ধবিমান, মিসাইল ও অন্যান্য অস্ত্র, রাডার, সারভেইল্যান্স বিমান, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি, পাইলটের প্রশিক্ষণ সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা) থেকে। অর্থাৎ, ওই সংঘাতে পাকিস্তানের যে পারফরম্যান্স ছিল, শুধু জে-১০সিই কিনলেই তেমন কিছু করে ফেলার সক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে না।
ভারতের সঙ্গে ওই সংঘাতের সময়ে চীনের তৈরি যে মাটিতে স্থাপিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সেটা দিয়ে ভারতের যুদ্ধবিমানে আঘাত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে পাকিস্তান। আর চীনের বানানো জে-১০সি দিয়ে যে মিসাইলগুলো ছুড়েছে পাকিস্তান, সে কাজেও ফাইটার বিমানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল চীনের তৈরি এইডাব্লিউঅ্যান্ডসি (এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল) বিমান– এই বিমানে থাকা বিশাল রাডার ও কমান্ড সেন্টার আকাশে থাকা ফাইটার জেটকে (এ ক্ষেত্রে জে-১০সি) দূরে থাকা শত্রু বিমান বা মিসাইলের অবস্থান জানায় এবং কোন যুদ্ধবিমান কোনদিকে যাবে বা কোন শত্রুকে মোকাবেলা করবে সেটা সমন্বয় করে)।
এই ধরনের ইকোসিস্টেমের ওপর নির্ভর হয়ে পড়া অবশ্য ক্রেতা দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে– সেটা যুদ্ধবিমানের নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে যেমন, তেমনি সাপ্লাই চেইনের দিক থেকেও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিয়ানমারকে যে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহ করা হয়েছিল, সেগুলোতে গঠনগত ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে খবরে এসেছে– বিশেষ করে হাই-জি ম্যান্যুভারের (আকাশে খুব দ্রুত ওঠা, নামা কিংবা দিকবদল করা, যেখানে বিমান ও পাইলটের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক চাপ পড়ে) সময় বিমানের ফ্রেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর বাইরে জেএফ-১৭-এর ‘কেএলজে-৭ এআই’ রাডারের রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ভুলতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। বিমানটির ‘ওয়েপন মিশন ম্যানেজমেন্ট কম্পিউটারে’ (যুদ্ধবিমানের মূল কম্পিউটার সিস্টেম) যান্ত্রিক ত্রুটির কথাও এসেছে– এমন ত্রুটি থাকলে বিমানটির দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা শত্রুবিমান বা স্থাপনায় আঘাত করার (বিভিআর কমব্যাট) সক্ষমতাই ব্যাহত হয়।
নিজেদের বহরে থাকা জেএফ-১৭ নিয়ে মিয়ানমার বেশ ঝামেলায় পড়ছে তাদের ওপর থাকা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণেও। যুদ্ধবিমানটিতে যে অ্যাভিওনিক্স ও ইলেকট্রনিকস, সেগুলো পশ্চিমা প্রযুক্তির। নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব সংগ্রহ করতেও বেগ পেতে হচ্ছে মিয়ানমারকে। ফলে সেখানে ব্যবহৃত জেএফ-১৭ বহর তীব্র যন্ত্রাংশ সংকটে ভুগছে।
গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশকে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক এবং মিসাইল সিস্টেম সরবরাহ করেছে চীন– বাংলাদেশের মোট অস্ত্র ক্রয়ের ৭০ শতাংশই যায় চীন থেকে। তবে এ ধরনের কেনা-বেচার কৌশলগত তাৎপর্য কেবল অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কাঠামোর সাথেও গভীরভাবে জড়িত।
উচ্চ পর্যায়ের অস্ত্রব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে, সেটা নির্ভর করে এর যন্ত্রাংশ কতটা সহজে পাওয়া যায়, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট, প্রশিক্ষণ ও বছরের পর বছর সরবরাহকারী দেশের কাছ থেকে যেকোনো সাহায্য পাওয়ার রাস্তাটা কত সহজ থাকে, সবকিছুর ওপর। এই নির্ভরতার কারণে শুরুর লেনদেন ছাপিয়ে ক্রেতা দেশের ওপর চীনের প্রভাব বিস্তারের এমন একটা রাস্তা তৈরি হয়ে যায়, যা ওই ক্রেতা দেশের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষানীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে চীনের স্বার্থের সঙ্গে জুড়ে দেয়।
এই কয়েকটি জে-১০সি কিংবা জেএফ-১৭ দিয়েই এই অঞ্চলের আকাশপথে ভারতের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া সম্ভব হবে না– ভারতের ফাইটার স্কোয়াড্রনই (একাধিক যুদ্ধবিমান, পাইলট ও অন্যান্যদের নিয়ে গঠিত একেকটি সামরিক ইউনিট) আছে ২৯টি। তবে এই যুদ্ধবিমানগুলো কিনলে বাংলাদেশ যেটা পাবে, তা হলো, আকাশে কৌশলগত সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের ঘাটতি অনেকটা কমে আসবে এবং আকাশে নজরদারির ক্ষমতা আরও বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ স্পর্শকাতর ‘শিলিগুড়ি করিডোর’-এর আশপাশের এলাকা নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলবে। উল্লেখ্য, আনুমানিক ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই স্থল করিডোরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে দেশটির মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে। ফলে ভারতকে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে মনোযোগ আর সামরিক সম্পদ– দুটিই আরও বেশি করে বরাদ্দ করতে হতে পারে, বিশেষ করে যেকোনো বিস্তৃত আঞ্চলিক জরুরি পরিস্থিতির সময়ে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বর্তমানে কোনো সক্রিয় আঞ্চলিক সীমান্ত বিরোধ নেই ঠিকই, তবে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই দেশে তার বিরোধীদের অনেকের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভারত অবশ্য বসে নেই। শিলিগুড়ি করিডর যেভাবে দিনে দিনে আরও বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে, সেদিক মাথায় রেখে দেশটি এই করিডোরের চারপাশে তাদের সামরিক উপস্থিতি ও প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
চুম্বি উপত্যকার মধ্য দিয়ে শিলিগুড়ি করিডোরের কাছেই চীনের উপস্থিতি এই করিডোরটিকে এমনিতেই এক জটিল সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। পাশাপাশি এটি বাংলাদেশেও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তরদিকের সীমান্তে যখন ভারতের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনার কারণে বাংলাদেশ এটিকে ভারতের দিক থেকে চাপ হিসেবেই দেখার সম্ভাবনা থেকে যায়।
হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ যখন ভারতের দিক থেকে কিছুটা দূরে সরতে চেয়েছে, চীনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার আরও বড় সুযোগ তৈরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে, চীনের সাথে এই ঘনিষ্ঠতার মানে ভারতের বাড়তি প্রভাব কমিয়ে আনার একটা রাস্তা তৈরি হওয়া। অন্যদিকে ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটি তাদের আগে থেকেই স্পর্শকাতর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে চীনের প্রভাব আরও বাড়িয়ে তোলার একটা মাধ্যম।
তবে বাংলাদেশ যদি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভারতের কথিত আধিপত্য কমানোর চেষ্টা করে, সেটা এক দিকের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা সরিয়ে অন্য দিকের কৌশলগত সীমাবদ্ধতায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। চীনের সামরিক সরঞ্জামের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা রাতারাতি বাদ দেওয়া সম্ভব না হলেও, চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ বিকল্প প্রতিরক্ষা অংশীদারদের সাথে যুক্ত হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ তুরস্কের সাথে তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নত করেছে। সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপে পৌঁছাতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে বার্ষিক ‘২+২’ আলোচনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তুরস্কের পাশাপাশি বাংলাদেশ জাপানের সাথেও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তরের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
সুতরাং, যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি সামরিক বিকল্প বাড়ানোর স্বপ্ন দেখে থাকে, সেটা ততক্ষণ পর্যন্তই কাজ করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা চীনের ওপর অতিনির্ভর না হয়ে পড়বে। চীনের ওপর অতিনির্ভর হয়ে পড়লে সেটা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করে ফেলবে, যে স্বাধীনতা রক্ষা করাই মূলত এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য।
গ্যাব্রিয়েল হোনরাডা: গবেষক, বিশ্লেষক এবং পিপলস’ ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অব রাশিয়ার শিক্ষক