আমাদের জৈবিক ও বিবর্তনীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক কিন্তু আমাদের ‘সারাক্ষণ সুখী রাখার জন্য’ তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে মূলত আমাদের ‘টিকিয়ে রাখার বা বাঁচিয়ে রাখার’ (survival) জন্য। বিবর্তনের ধারায় যে কাজগুলো মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে–যেমন পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ, বিপদ থেকে আত্মরক্ষা কিংবা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে একসাথে বসবাস করা–মস্তিষ্ক সেই কাজগুলোকে এক ধরনের পুরস্কার বা উৎসাহ হিসেবে দেখেছে এবং ইতিবাচক আবেগ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে।
আমাদের পজিটিভ অনুভূতির সময়ে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ সচল হয়ে ওঠে, যেখানে প্রধান ভূমিকা রাখে চারটি জৈব-রাসায়নিক। প্রথমটি ডোপামিন, যা মূলত কোনো লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যাশা ও প্রেষণা জাগিয়ে মস্তিষ্ককে তাড়া দেয়। দ্বিতীয়টি সেরোটোনিন, যা মেজাজ, সম্মান ও আত্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। তৃতীয়টি অক্সিটোসিন, যা প্রিয়জনের স্পর্শ বা স্নেহের মুহূর্তে নিঃসৃত হয়ে ভালোবাসা ও সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করে। আর শেষটি হলো এন্ডোরফিন, যা শারীরিক পরিশ্রম বা হাসির মাধ্যমে নিঃসরিত হয়ে শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক ও আনন্দদায়ক হিসেবে কাজ করে।
তবে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে স্পষ্ট যে মস্তিষ্কে সুখের কোনো একক ‘সুইচ’ নেই। জটিল রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া শরীরের নিউরো-নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে আনন্দ তৈরি করে সত্যি, কিন্তু সেই রাসায়নিক নিঃসরণের পেছনে আমাদের চিন্তাভাবনা, পরিবেশ এবং অভ্যাসের ভূমিকা অপরিসীম।
অর্জনের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না কেন?
শুরুতে আমরা যে চাকরির বা পরীক্ষার উদাহরণ দিয়েছিলাম, মনোবিজ্ঞানে সেই ঘটনাটিকে একটি বিশেষ নামে ডাকা হয়–‘হেডোনিক অ্যাডাপটেশন’ (Hedonic Adaptation) বা সুখের অভিযোজন।
১৯৭১ সালে গবেষক ব্রিকম্যান ও ক্যাম্পবেল প্রথম ‘হেডোনিক ট্রেডমিল’ (Hedonic Treadmill) তত্ত্বটি প্রস্তাব করেন। ট্রেডমিলে মানুষ যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়েও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, মানুষের মানসিক অবস্থাও কিছুটা তেমনই। লটারি জেতার মতো প্রকাণ্ড আনন্দের ঘটনা ঘটুক, কিংবা পদোন্নতির মতো সুখবর আসুক–সাময়িকভাবে আমাদের সুখের পারদ অনেক ওপরে ওঠে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরোতেই আমাদের মস্তিষ্ক সেই নতুন আনন্দময় বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়। ফলে ব্যক্তির সুখের পারদ আবার আগের স্বাভাবিক স্তর বা ‘সেট পয়েন্ট’-এ নেমে আসে।
ড্যানিয়েল গিলবার্ট তার বিখ্যাত গবেষণাভিত্তিক বই Stumbling on Happiness-এ দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের ভবিষ্যতের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া অনুমান করতে গিয়ে প্রায়শই ভুল করে। আমরা মনে করি নির্দিষ্ট কোনো সাফল্য না পেলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব, বা তা পেলে আমরা সারা জীবন মেঘের ওপর ভাসব। কিন্তু আদতে মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা এবং মানসিক সহনশীলতা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
তবে কি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সুখের মাত্রা কখনোই বদলায় না? সাম্প্রতিক সময়ের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণাগুলো দেখায় যে, এই সেট পয়েন্ট একেবারে পাথরে লেখা নয়। যেমন–ফুজিতা ও ডায়নার দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষের জীবনের মূল সুখের স্তরে ইতিবাচক বা নেতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ, হেডোনিক অ্যাডাপটেশন একটি শক্তিশালী জৈবিক সত্য হলেও সচেতন চর্চা ও পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের মাত্রায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সুখের নির্ধারক কী: জিনগত ভাগ্য নাকি অভ্যাস?
আমাদের জীবনের সুখের পাল্লাটা ঠিক কোন দিকে ভারী? এটি কি জন্মসূত্রে পাওয়া জিনগত ভাগ্য, নাকি আমাদের প্রতিদিনের নিজস্ব অভ্যাস? আমাদের আনন্দের কতটুকু নির্ধারণ করে দেয় জন্মের আগে লিখিত বংশগতি, আর কতটুকুই-বা থেকে যায় আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে?
মনোবিজ্ঞানী সোনিয়া লিউবোমিরস্কি (Sonja Lyubomirsky) এবং তার সহযোগীরা দীর্ঘ গবেষণার পর সুখের এই গাণিতিক সমীকরণটিকে একটি চমৎকার মডেলে প্রকাশ করেছেন, যা মনস্তত্ত্বের জগতে ‘হ্যাপিনেস পাই মডেল’ নামে পরিচিত।
এই মডেল অনুযায়ী, যমজ সন্তানদের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা এবং জিনোমিক স্টাডি থেকে দেখা যায়, আমাদের সুখের মূল রেখা বা ‘সেট পয়েন্ট’-এর প্রায় অর্ধেক অংশ (প্রায় ৫০%) নির্ধারিত হয় জন্মসূত্রে। মানুষের সহজাত ব্যক্তিত্বের গঠন–যেমন বহির্মুখিতা কিংবা মানসিক স্থিতিশীলতা–জিনগতভাবেই আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়।
তথ্যটি শুনে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। কিন্তু আমাদের সামাজিক অবস্থান, আয়, বৈবাহিক অবস্থা বা ভৌগোলিক পরিস্থিতির মতো বাহ্যিক বাস্তবতাগুলো (বা জীবনের পরিস্থিতি) মানুষের দীর্ঘমেয়াদী সুখের মাত্রায় মাত্র ১০ শতাংশের মতো প্রভাব ফেলে। আমরা সাধারণত মনে করি প্রচুর অর্থ, সামাজিক মর্যাদা, সুন্দর রূপ কিংবা পছন্দের জায়গায় বসবাস করাটাই সুখের মূল চাবিকাঠি, কিন্তু বিজ্ঞান তা বলছে না।
বাকি বিশাল ৪০ শতাংশ সুখ সম্পূর্ণ নির্ভর করে মানুষের নিজস্ব ইচ্ছাকৃত আচরণ ও অভ্যাসের ওপর–অর্থাৎ, আমাদের প্রতিদিনের চিন্তাভাবনা, দৈনন্দিন অভ্যাস, মানসিক চর্চা এবং সামাজিক সম্পর্কের যত্নের মাধ্যমে। এই অংশটি সম্পূর্ণ আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে।
যদিও পরবর্তী সময়ে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে, জিন এবং পরিবেশের এই সম্পর্কটি অত্যন্ত জটিল এবং এদের নির্দিষ্ট শতাংশের সীমানায় বেঁধে রাখা কঠিন, তবুও এই মডেল থেকে মূল বার্তাটি স্পষ্ট যে, বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন আমাদের যতটা না সুখী করে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা ও আচরণের ধরন। ভাগ্য বা পরিবেশ যাই হোক না কেন, নিজের সুখের একটা বড় চাবিকাঠি সবসময় আমাদের নিজেদের হাতেই থেকে যায়।
আগামীকাল পড়ুন: প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে কোথায়?