হিমালয়ে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যায় নেপাল এবং চীনের তিব্বতে পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যেই নেপাল-চীন সীমান্তে ধ্বংসাবশেষ জমে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় এলাকায় ফের ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আজ শুক্রবার নতুন তৈরি হওয়া নদীর বাঁধ ভেঙে পানি উপচে পড়ায় ওই এলাকায় সাময়িকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিত রাখতে হয়।
নেপালের রসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, নতুন তৈরি হওয়া ‘ব্যারিয়ার লেকটি’ উপচে পড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘‘নদীতে পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে। তবে দুর্গম এলাকার কারণে পানি ঠিক কতটা উঁচুতে উঠেছে তা সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি।’’
নেপালের গবেষক নিতেশ খড়কা বলেন, “এই দুর্যোগ দুটি পৃথক হ্রদের জন্ম দিয়েছে। এর একটি সৃষ্টি হয়েছে ওপরের দিকে হিমবাহের কাছাকাছি স্থানে, যেখানে গলে যাওয়া বরফ জমা হচ্ছে। অন্যটি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদটি তৈরি হয়েছে নেপালের একটি নদীর গতিপথে, যেখানে বিশাল ধস নেমে নদী আটকে দিয়ে একটি প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি করেছে।”
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) সতর্ক করে জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় পলি ও ধ্বংসাবশেষ জমে পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে আকস্মিক প্লাবন তৈরি হতে পারে।
চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হ্রদে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি আটকে আছে। পরবর্তী তিন দিনে এতে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি যুক্ত হতে পারে, যা প্রায় ১২ শটি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের পানির সমান।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই জানান, পাথর, বরফ ও কাদা ধসে নদীর পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সংকীর্ণ ও খাড়া পাহাড়ি উপত্যকা হওয়ায় বাঁধটি ভেঙে গেলে বিশাল বেগে পানি ও কাদা নিচে নেমে আসবে, যা নদী অববাহিকার নিচের অংশের বসতিগুলোর জন্য বড় ধ্বংস ডেকে আনবে।
এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘‘হ্রদটির অববাহিকা নদীর তলদেশের বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ফলে উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত হবে এবং ভাটিতে থাকা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।’’
এই হ্রদটি নেপালের ছোচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। ছোচেন ও পুরেপু নদী দুটি তিব্বত থেকে উৎপত্তি হয়েছে। নেপালে প্রবেশের আগেই নদী দুটি একসঙ্গে মিশে গেছে। নেপালে এই নদী ভোটেকোশি নামে পরিচিত। ভোটেকোশি ত্রিশূলী নদীর প্রধান উজানের উপনদী।
দুর্গম পাহাড়ি পথ ও চরম আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনের প্রকৌশলী চেন হানসিয়াও জানান, হিমবাহ ধসের পর হ্রদের চারপাশে খাড়া ও বিপজ্জনক পাহাড়ি বাধা তৈরি হওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি বা উদ্ধারকারী দল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চীন ইতোমধ্যে ড্রোন ও থ্রিডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে লেকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে।
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রসুয়া জেলায় শুক্রবার উদ্ধারকাজ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ থাকলেও পরে তা আবার চালু করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উপচে পড়া লেকের ঝুঁকি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বন্যায় এই অঞ্চলের ছয়টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নেপাল সরকার এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, ‘‘আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে, এই মুহূর্তে বাইরের সহায়তার প্রয়োজন নেই।’’
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (জিএলওএফ) এবারই প্রথম নয়। ২০১২ সালে নেপালের সেতি নদীতে পাথর ও বরফ ধসে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়ে একটি বিধ্বংসী বন্যা হয়েছিল।
এছাড়া ২০১৬ সালে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় হিমবাহ ধসে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে এসেছিল, যাতে ৯ জন রাখাল মারা যান। এরপর ২০২২ সালে পাকিস্তানের হুনজা উপত্যকার শিশপার হিমবাহ ধসের পর সৃষ্টি হওয়া হ্রদ ভেঙে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরম পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে এই ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়া ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। তবে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, চীন ও নেপালের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা এবং সঠিক সময়ে সতর্কবার্তা পাঠালে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।