চীন থেকে ৪.৫ প্রজন্মের আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান জে-১০ সিই কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে ভারতে। কিন্তু কেন?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন চীনের সঙ্গে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার যে চুক্তি বাংলাদেশ করতে যাচ্ছে, সেটির খসড়ার কাজ চলছে। তিনি এটাও বলেছেন, এ বছর সম্ভব না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হবে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান।
জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান যে বাংলাদেশ কিনতে যাচ্ছে, সেটা জানা গিয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই। সে সময় সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছিল চীন থেকে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা মূল্যে ২০টি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ। তবে এরপর এটা নিয়ে আর কোনো আলাপ হয়নি। উল্টো ইতালি থেকে আরও শক্তিশালী ইউরো ফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার জন্য লিওনার্দো নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্মতিপত্র সই হয়েছিল। এর মধ্যে পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনারও কথা উঠেছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার সাশ্রয়ী মূল্য ও আকাশযুদ্ধ কার্যকারিতা বিচার করে হয়তো জে-১০ সিই কেনার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
কেনা হলে জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানই হবে ২৬ বছর পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজিত প্রথম মাল্টিরোল কমব্যাট যুদ্ধবিমান। সর্বশেষ ২০০০ সালে রাশিয়া থেকে চতুর্থ প্রজন্মের আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান যুক্ত হয়েছিল বিমানবাহিনীর বহরে।
জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানে রয়েছে অত্যাধুনিক পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল। ছবি: সংগৃহীত
জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও ফোর্সেস গোল ২০৩০ বাস্তবায়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই ৪.৫ প্রজন্মের এই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ।
কিন্তু ঢাকা যখন নিজস্ব সুরক্ষায় এই বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের নীতি নির্ধারক ও মিডিয়ায় শুরু হয়েছে নতুন উদ্বেগ। কিন্তু কেন? বাংলাদেশ নিজের আকাশ সুরক্ষিত করলে ভারতের সমস্যা ঠিক কোথায়? চলুন জেনে নেওয়া যাক আজকের বিশেষ বিশ্লেষণে।
প্রথমেই বোঝা দরকার, কেন বাংলাদেশের জন্য এই ফাইটার জেট কেনাটা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আছে মিগ-২৯ বা ইয়াক-১৩০ ছাড়াও কিছু পুরনো এফ-৭ যুদ্ধবিমান। একটি দেশের বিমানবাহিনীতে ২৬ বছর কোনো মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান যুক্ত হয়নি, এটা অদ্ভুত ব্যাপার।
স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য একটি আধুনিক বিমানবাহিনী থাকাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২০টি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে, যেটা নিজেদের সুরক্ষিত করতেই। যে কয়টা কারণ জে-১০সিই কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশকে আগ্রহী করেছে, সেগুলোর মধ্যে এই যুদ্ধবিমানের সাশ্রয়ী মূল্য ও কার্যকারিতার ব্যাপারটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ফাইটার জেটের ক্ষেত্রে মূল খরচ কত সেটা ফাইটার জেটের কনফিগারেশনের বিভিন্ন দিকের ওপর (রাডার কী হবে, সমরাস্ত্র কোন ধরনের হবে, সেন্সর কোন প্রজন্মের হবে) নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে বললে ইউরোফাইটার টাইফুনের একেকটি ইউনিটের খরচ দাঁড়ায় ৯ কোটি থেকে ১২ কোটি মার্কিন ডলার। যেখানে রাফালের খরচ ১১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। জে-১০সি-র খরচ ৬ কোটি মার্কিন ডলারের আশপাশে।
কম খরচে এমন ৪.৫ জেনারেশনের উন্নত বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ (বিভিআর) মিসাইলযুক্ত বিমান পাওয়া বাংলাদেশের মতো দেশের বাজেট ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে- বাংলাদেশ নিজস্ব সামরিক শক্তি বাড়ালে নয়াদিল্লির কেন উদ্বিগ্ন হচ্ছে? ভারতীয় বিশ্লেষকদের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ:
প্রথম কারণ- বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আকাশসীমায় সামরিক ভারসাম্য
জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানে রয়েছে অত্যাধুনিক পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল। বাংলাদেশের কাছে এই শক্তি থাকা মানে হলো, আঞ্চলিক যেকোনো সামরিক উত্তেজনায় বাংলাদেশের আকাশসীমায় কোনো অনুপ্রবেশ বা আগ্রাসন চালানো সহজ হবে না কারও পক্ষেই। হয়তো ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’-এর কাছে বাংলাদেশের এই শক্তিশালী উপস্থিতি ভারতীয় কৌশলবিদদের চিন্তায় ফেলছে।
দ্বিতীয় কারণ- ভারতের বিকল্প অফারের সীমাবদ্ধতা
ভারত তাদের নিজস্ব ৪.৫ জেনারেশনের যুদ্ধবিমান ‘তেজাস’ প্রমোট করতে চাইলেও তারা নিজেদের বিমানবাহিনীকেই এখনো পর্যাপ্ত তেজাস সরবরাহ করতে পারেনি। এর মধ্যে তেজাস যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিরক্ষা দুনিয়ায় এক ধরনের সন্দেহ দানা বেঁধেছে। তাই বাংলাদেশের এই আধুনিকায়নে ভারতের কোনো বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ নেই।
তৃতীয় কারণ- বেইজিং-ঢাকা ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক
২০০২ সালের সামরিক চুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশের সামরিক সরবরাহের এক বড় অংশ চীন সরবরাহ করে আসছে। সাবমেরিন, ট্যাংক, রণতরীর পর যদি ২০টি হাই-টেক জে-১০সিই বাংলাদেশে আসে, তবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন শতভাগ বেইজিংভিত্তিক প্রযুক্তির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে। ভারতের ভয়টা হচ্ছে- এর ফলে বঙ্গোপসাগরে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
যে কয়টা কারণ জে-১০সিই কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশকে আগ্রহী করেছে, সেগুলোর মধ্যে এই যুদ্ধবিমানের সাশ্রয়ী মূল্য ও কার্যকারিতার ব্যাপারটিই গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: সংগৃহীত
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং জাতীয় সুরক্ষায় কোন দেশ থেকে কোন অস্ত্র কেনা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে।
‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়’ এই নীতিতে বাংলাদেশ সব সময়ই বিশ্বাসী।
বাংলাদেশ কোনো আঞ্চলিক সামরিক জোটে নাম লেখাতে চাচ্ছে না। এই ফাইটার জেট কেনার উদ্দেশ্য কেবলই নিজেদের আকাশসীমার সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা। কম্ব্যাট ট্র্যাক রেকর্ডও একটা বড় কারণ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে চীনা এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে, যা বাংলাদেশকে এই ক্রয়ের দিকে উৎসাহিত করেছে।
ইউরোটাইফুনের মতো ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় না করে, দেশের অর্থনীতি সামলে শক্তিশালী বিমানবাহিনী গড়ে তোলার এটাই সেরা বিকল্প।
প্রতিবেশীর সামরিক আধুনিকায়নে ভারতের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক হলেও, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।