গত সপ্তাহের শেষে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি কাণ্ড বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বিষয়ে এমন খুব একটা দেখা যায় না। গত সপ্তাহের শেষে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভবনে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি হিসেবে সেখানে মহড়া চলছিল।
বিষয়টি দ্রুত কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নজরে আসে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা জল্পনা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে নিতে ভারত যে চেষ্টা করছে, সেটিও সামনে আসে।
তারেক রহমান সফরে রাজি কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিবিসি বলছে, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনার জন্য দিল্লিতে আনতে ভারত আগ্রহী। আর এই সফরের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর এটাই তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভরতেই অবস্থান করছেন। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই সময় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়।
তারেক রহমানের সরকার দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আবার ভালো করার সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছে এখন দিল্লি। তবে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান বিষয়টিকে কঠিন করে তুলছে।
বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছে। তারেক রহমানের প্রেস সচিব এএম সালেহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য তারা ভারতকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের এই অনুরোধ তারা বিবেচনা করছে।
শেখ হাসিনার বিষয়টি থাকলেও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে ভারত বারবার উদ্যোগ নিয়েছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ভারত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের আমন্ত্রণ জানায়।
এছাড়া, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও রয়েছেন।
তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে তার প্রাপ্য অনুযায়ী সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দীনেশ ত্রিবেদী।
বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে নেওয়ার চেষ্টা করা দেশটির জন্য বেশ অস্বাভাবিক। প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে ভারত সাধারণত এতটা আগ্রহ দেখায় না।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, “আমার মনে হয়, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা আছে। কারণ শেখ হাসিনাকে হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া বাংলাদেশকে কাছে টানতে তারা প্রায় সব ধরনের চেষ্টাই তারা করেছে।”
শ্যাম শরণ বলেন, বাংলাদেশের জরুরি কিছু প্রয়োজন মেটাতেও ভারত এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা ভিসা দেওয়া। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করতে বেশ কিছু ব্যবস্থাও আবার চালু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারত–দুই দেশের জন্যই এই সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকেও দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য হয়েছে। তবে এতে ভারতই অনেক বেশি লাভবান হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় বাংলাদেশ ও ভারত সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ বাড়িয়েছিল। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন সহজ হয়। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে থাকা ভারতের ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছিল।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগকে ভারত যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। শেখ হাসিনা এখনো ভারতে থাকায় সেই উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
গত ৫ আগস্ট বিষয়টি আবার সামনে আসে। দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা অনলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ডিসেম্বরেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তারেক রহমানের বিএনপি সরকার তার সমর্থকদের দমন করছে।
শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ‘ক্ষুব্ধ’ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের ‘কোনো ভূমিকা’ ছিল না। অনুষ্ঠানে যা বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিষয়ে করা বক্তব্যের সঙ্গেও তারা একমত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, শেখ হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে কথা বলার আগে খবর ছিল যে, তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছিলেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, এতে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে ভালো করার বিষয়ে ভারত আসলেই আন্তরিক কি না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় তারেক রহমান দিল্লি সফর করলে দেশে তাকে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার বিষয়ে আগ্রহের আরও একটি কারণ রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাদের সফর হয়েছে। দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও প্রকাশ্যে বলেছে। এসব বিষয় দিল্লি খুব কাছ থেকে নজরে রাখছে।
২০০০-এর দশকে ভারত অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করেছে এবং তাদের সীমান্ত পারাপারেও সহায়তা করেছে। তবে সে সময় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ–দুই দেশই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
এদিকে চলতি মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নামে পরিচিত এই চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে।
চুক্তিটির বিস্তারিত বিষয় এবং কোন দেশ কী দায়িত্ব নেবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, “মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। তাই মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা চুক্তি বা উদ্যোগ হয়, তাতে অংশ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেখা যাক। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে।”
সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, বাংলাদেশের এ বিষয়ে সতর্কভাবে এগোনো উচিত। তিনি বলেন, কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের একটু সতর্ক হওয়া উচিত। এটা শুধু ভারতকে বিরক্ত করার বিষয় নয়। বাংলাদেশকে কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে মেলে কি না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের জন্য এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর সেই সম্পর্ককে আগের মতো ধরে নিতে পারছে না।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের সরকারেরও দেখানোর প্রয়োজন আছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বড় প্রতিবেশী ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়। অধ্যাপক ইয়াসমিন মনে করেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসার আগেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত।
বিবিসি বলছে, সামনে আরেকটি সুযোগ আসতে পারে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করবে। সেখানে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে একের পর এক আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আগেভাগে ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি বিজ্ঞপ্তির পর এখন দিল্লি আশা করছে, শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যাবেন।