যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো— কোনো কোনো দেশকে একবার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার পর দীর্ঘদিন সেই অবস্থান থেকে বের হতে না দেওয়া। বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ফরেভার ওয়ার’ বা চিরস্থায়ী যুদ্ধ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ‘ফরেভার এনিমি’—অর্থাৎ চিরস্থায়ী শত্রু তৈরির প্রবণতা—নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়।
কোয়িন্সি ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যাডাম ওয়েইনস্টাইনের ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত গত সোমবার-এর বিশ্লেষণ এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। তার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: ওয়াশিংটন প্রায়ই কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাতের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে পরবর্তী কয়েক দশকের নীতির ভিত্তি বানিয়ে ফেলে। ফলে সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, ক্ষমতার কাঠামো বদলায়; কিন্তু আমেরিকার নীতিও বদলায় না।
কোনো বিপ্লব, জিম্মি সংকট, যুদ্ধ কিংবা সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি তখন কৌশলগত বাস্তবতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে আবেগ ও অপমানের স্মৃতি জায়গা করে নেয়। আর সেখানেই তৈরি হয় ‘চিরস্থায়ী শত্রু’র ধারণা।
ইরান এ প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ও তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট আমেরিকার জাতীয় মনস্তত্ত্বে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। জিম্মি মার্কিন কূটনীতিকদের চোখ বাঁধা অবস্থায় প্রদর্শনের দৃশ্যটি শুধু একটি কূটনৈতিক সংকট ছিল না; আমেরিকার কাছে এটি ছিল জাতীয় অপমানের প্রতীক। চার দশকেরও বেশি সময় পরও সেই স্মৃতি মার্কিন নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
এরপর ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলা, লেবাননে মার্কিন নাগরিকদের অপহরণ এবং ১৯৮৫ সালে সিআইএ কর্মকর্তা উইলিয়াম বাকলির হত্যার মতো ঘটনাগুলো ইরানবিরোধী মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করে। ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ‘অ্যাক্সিস অব এভিল’ বা ‘অশুভ অক্ষ’-এর অন্তর্ভুক্ত করেন।
কিন্তু গল্পের অন্য দিকটিও রয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভের পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৮৮ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের গুলিতে ইরান এয়ারের ৬৫৫ নম্বর ফ্লাইট ধ্বংস হয়ে ২৯০ জন নিহত হন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং পরবর্তী কয়েক দশকের কঠোর নিষেধাজ্ঞাও ইরানের জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। অর্থাৎ দুই দেশের সম্পর্কের সংকট একতরফা ইতিহাস নয়। উভয় পক্ষেরই রয়েছে আঘাত, অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা-আশঙ্কার নিজস্ব বয়ান। সমস্যাটি হলো, ওয়াশিংটন অনেক সময় প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে সেই পুরোনো কাঠামোর বাইরে গিয়ে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরান তার বড় উদাহরণ। দেশটিকে শুধু ‘মোল্লা শাসন’ হিসেবে দেখলে এর জটিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো বোঝা যায় না। ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি রেভল্যুশনারি গার্ড, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক গোষ্ঠী দেশটির ক্ষমতার কাঠামোকে প্রভাবিত করে। ১৯৯৭ সালের পর ইরানের সমাজ ও রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মার্কিন নীতিতে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন খুব সীমিত।
এ কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনেইকে সরিয়ে দিলেই পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন নেতাকে সরিয়ে দেওয়া এবং একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া এক বিষয় নয়।আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল দেখা গেছে
একসময় আফগানিস্তান ছিল ওয়াশিংটনের প্রতিদিনের নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্র। ইউএসএআইডি, বেসরকারি সংস্থা, ঠিকাদার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিশাল কার্যক্রম সেখানে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহারের পর দেশটি দ্রুত ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার তালিকার নিচে নেমে যায়।
তালেবানকে শুধু একটি বহিরাগত ও সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে দেখার পাশাপাশি আফগান সমাজকে আমেরিকান মূল্যবোধ অনুযায়ী পুনর্গঠনের যে দীর্ঘ প্রকল্প চালানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলে প্রবেশের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারকে অনেকেই ১৯৭৫ সালের সাইগন পতনের সঙ্গে তুলনা করেন। এই তুলনা আমেরিকার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে আফগানিস্তানকে একটি সামরিক ব্যর্থতা ও জাতীয় অপমানের প্রতীকে পরিণত করে।
কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ভূ-রাজনীতি শেষ হয়ে যায় না
আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলেও দেশটির বাস্তবতা উপেক্ষা করে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কোনো কার্যকর কৌশল নয়। আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে শুধু তালিবান নয়, সাধারণ আফগান জনগণও তার অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য দেয়। অথচ এই একই জনগণের স্থিতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
এখানে ভিয়েতনামের উদাহরণটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ
যে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল, সেই দেশই পরে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। সাবেক যুদ্ধবন্দী ও পরে সিনেটর জন ম্যাককেইন এবং যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ জন কেরি—দুজনেই ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন। সাবেক যুদ্ধবন্দী ডগলাস পিটারসন পরে ভিয়েতনামে প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেন।
আজ যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম কৌশলগত অংশীদার। অর্থাৎ একসময়কার ভয়াবহ যুদ্ধ, বন্দিত্ব ও প্রাণহানির স্মৃতি দুই দেশের বর্তমান সম্পর্ককে চিরকাল নিয়ন্ত্রণ করেনি।
এই উদাহরণটি আমেরিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে: রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অতীতের অপমানে বন্দি হয়ে থাকতে পারে না।
কিউবার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে নিষেধাজ্ঞা ও বৈরিতার পরও কিউবার রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলে যায়নি। বরং দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে হাভানার জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইরাকের ক্ষেত্রেও ২০০৩ সালের যুদ্ধ দেখিয়েছে, কোনো সরকারকে উৎখাত করা সহজ হলেও একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা কত কঠিন। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়াও একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার উদাহরণ হয়ে আছে।
এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো—শত্রুকে দুর্বল করা এবং কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো এক জিনিস নয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ কিংবা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা একটি রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু এগুলো সবসময় সেই রাষ্ট্রের জনগণকে ওয়াশিংটনের পছন্দের রাজনৈতিক পথে নিয়ে যায় না।
বরং দীর্ঘদিনের বৈরিতা অনেক সময় উল্টো ফল দেয়। প্রতিপক্ষের সমাজে জাতীয়তাবাদ বাড়ে, শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের পাশাপাশি বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হয়। তখন সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমে গিয়ে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশকের অবিশ্বাসের পরও যদি ওয়াশিংটন মনে করে সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্রুত বদলে দেওয়া সম্ভব, তাহলে সেটি বাস্তবতার চেয়ে ইচ্ছার ওপর বেশি নির্ভরশীল নীতি হয়ে উঠতে পারে।
আফগানিস্তানও একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে
২০০১ সালের ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যে দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্যের একটি ছিল দেশটিকে আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটিতে পরিণত হতে না দেওয়া। কিন্তু দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির পরও যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেকে দ্রুত প্রত্যাহার করে, তখন বোঝা যায়—সামরিক শক্তি দিয়ে একটি সমাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কতটা কঠিন।
অতীতের অপমান ভুলে যাওয়া মানে অতীতকে অস্বীকার করা নয়। বরং তার অর্থ হলো, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখা।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সম্ভবত এখানেই। ইরান, আফগানিস্তান কিংবা কিউবাকে কয়েক দশক আগের কোনো একটি মুহূর্তে আটকে না রেখে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝা দরকার। শত্রুতা যদি কূটনীতির জায়গা পুরোপুরি দখল করে নেয়, তাহলে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ে।
ভিয়েতনাম দেখিয়েছে, গতকালের শত্রু আগামী দিনের অংশীদার হতে পারে। আবার ইরান ও আফগানিস্তান দেখাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা কখনো কখনো সমস্যার সমাধান না করে তাকে আরও জটিল করে তোলে।
সুতরাং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য বাস্তবসম্মত পথ হলো—চিরস্থায়ী শত্রু নয়, পরিবর্তনশীল স্বার্থকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক নির্ধারণ করা। সব শত্রুকে বন্ধু বানানো সম্ভব নয়। সব বিরোধও আলোচনায় মিটবে না। কিন্তু যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা, প্রতিপক্ষের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখা—এটাই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
অতীতের অপমানকে স্মরণ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অপমানকে ভবিষ্যতের কূটনীতির স্থায়ী ভিত্তি বানানো বিপজ্জনক। রাষ্ট্রের শক্তি শুধু শত্রুকে পরাজিত করার ক্ষমতায় নয়; প্রয়োজন হলে পুরোনো শত্রুতার ওপর উঠে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সক্ষমতাতেও।