ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আওতায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোকেও লক্ষ্য করা হবে। জবাবে ইরান হুমকি দিয়েছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নেবে, তাদের বিরুদ্ধেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার হুমকির জবাবে ইরান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নিয়ে কোনো দেশ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, তাকেও শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাদের বিরুদ্ধেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
রেজাই ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করে বলেন, তারা যদি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করেও তেল পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরও বলেন, কোনো দেশ ইরানকে সামান্যতম সহায়তা দিলেও তাদের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
পরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই ধরনের হুমকি দেন। তিনি বলেন, “আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।” চীনের সহযোগিতাও চান বেসেন্ট। কারণ ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন।
গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান ‘পূর্ণ মাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ রয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরান ভেঙে পড়বে এবং ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। কিন্তু তা হয়নি। বরং ইরান এমনভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে যা পুরো বিশ্বকে বিস্মিত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান কীভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে?
রেজাই জানিয়েছেন, ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা তিন ধাপে নেওয়া হবে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করবে ইরান। তিনি বলেন, প্রথমে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হবে। কিন্তু তারা যদি তা না করে, তাহলে হামলা চালানো হবে।
আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালির বাইরে বিকল্প তেল রপ্তানি পথও ইরানের হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন রেজাই। এটি সম্ভবত লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে বোঝাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পর সৌদি আরব এই পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে। এরপর যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির জন্য এই প্রণালিকে ব্যবহার করছে ইরান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ দিয়েছে। এতে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ক্লিংডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ইরান আগেভাগেই নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা দেখাতে চাইছে। তার অর্থ হলো, ইরানের ওপর হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।
আজিজির মতে, ইরানের নতুন সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। প্রথমটি হলো, সম্ভাব্য হুমকি তৈরি হওয়ার আগেই তা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো, কোনো হামলা হলে তার চেয়েও বড় ক্ষতি করে পাল্টা জবাব দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে কেউ হামলার সাহস না পায়।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের এই সতর্কবার্তাকে মূলত একটি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’ বলে মনে করছেন আজিজি। তার মতে, ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্ব আরও একটি বড় ধরনের সংঘাতের জন্য ক্রমেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ছে। তাই তারা ইরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে। এতে এসব দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তেল ও গ্যাসসহ তাদের বেশির ভাগ পণ্য রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করতে হয়। উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার নিন্দা করেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এসব দেশও বুঝতে পারছে যে ইরানের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। কারণ ইরান তাদের খুব কাছের প্রতিবেশী।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করে। তবে গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে তারা দেশটির ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ইরান অবশ্য এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। এর পেছনে সম্ভবত দুই দেশেরই হিসাব ছিল যে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে নিরাপদ। ইরানের সাম্প্রতিক হামলা এই নীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবে এতে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
যুক্তরাজ্যের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন গত মাসে আল জাজিরাকে বলেছিলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থান বদলাতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত তাদের ইরানের পাশেই থাকতে ও কাজ করতে হবে।
এই বিশ্লেষক মতে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ফলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তা চায় না। কিছু দেশ হয়তো ইরানের ওপর আরও কঠোর হামলার পক্ষে ছিল। তবে তাদের লক্ষ্য সরকার পতন ঘটানো নয়, বরং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী অংশকে দুর্বল করা।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি আল জাজিরাকে বলেন, সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধান হবে–এমন আস্থা এখনো কম। তবে একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই ‘আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বিশ্ববাজারে তেলের মজুতও কমে গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ কারও জন্যই ভালো হবে না।