তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আবারো জামানতবিহীন ঋণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ নামের প্রস্তাবিত নতুন এই স্কিমে প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা করে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঋণের সুদহার হতে পারে ৪ থেকে ৬ শতাংশ। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ এবং আরও ৫০০ কোটি টাকা অনুদানের কথা রয়েছে। তবে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীত ইতিহাস তেমন ভালো নয়। এর আগেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাজ করেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের আটটি বিভাগের নির্দিষ্ট আটটি জেলার সকল উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে নতুন স্কিমটি চলতি মাসের শেষেই চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে এটি সারা দেশে সম্প্রসারিত করা হবে।
এই স্কিমের আওতায় মোট এক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। প্রথমে এই তহবিলের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৫০০ কোটি টাকা উদ্যোক্তাদের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা সরাসরি অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে অনুদানের অর্থ উদ্যোক্তাদের ফেরত দিতে হবে না।
এই সুবিধার জন্য আবেদনকারী তরুণ উদ্যোক্তাদের বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। নির্বাচিত প্রত্যেক উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পাবেন। এর পাশাপাশি ব্যবসা আরও বড় করার জন্য সমপরিমাণ অর্থাৎ আরও ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কারণ বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অর্থায়ন। বিশেষ করে যাদের জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ নেই, তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগেও নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্টার্টআপের জন্য একের পর এক পুনঃঅর্থায়ন, জামানতবিহীন ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করেছিল। তাহলে নতুন করে একই ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজন হচ্ছে কেন? আগের প্রকল্পগুলো কতটা উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছেছিল? আর কোথায় ছিল মূল সমস্যা?
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী চরচাকে বলেন, “যখন সরকার কোনো উদ্যোগ হাতে নেয় তখন আমরা সেটাকে সাধুবাদ জানাই। আমরা আশা করি, সেটা যেন ফলপ্রসু হয়। তবে এটা কতটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটাই আসল কথা। অর্থাৎ প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পাবেন? নাকি যারা উদ্যোক্তা নন তারা ঋণ নিয়ে খেলাপি হবেন?”
২০১৩ সালে ডিসিসিআই-বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকল্প
নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় বড় উদ্যোগ নেয় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ‘ক্রিয়েশন অব ২০০০ নিউ এন্টারপ্রেনার্স’ বা ইটুকে প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল সারা দেশে দুই হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় পরিচালিত এ প্রকল্পে উদ্যোক্তা খোঁজা, ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থায়নের সংযোগ তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও রেখেছিল। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত ও নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণের সুযোগ দেওয়া হয়।
ডিসিসিআইয়ের ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে তিন হাজার ২৯ জন উদ্যোক্তা নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে ৮৬২ জন প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন এবং তাদের কয়েকটি ব্যাংক-যোগ্য প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন হয়েছিল। এই উদ্যোগে দুই হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। তবে লক্ষ্য পূরণের পর কতজন উদ্যোক্তার ব্যবসা টিকে ছিল, কতজন নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেছেন বা কতটি ব্যবসা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে, সে বিষয়ে প্রকল্প পরবর্তী বিস্তারিত মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন সময় এই প্রকল্পকে ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, “অতীত ইতিহাস খুব ভালো নয়। সরকার শুরুটা ভালো করে। মনে হয় যে এবার হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু আসলে তা হয় না। যারা প্রকৃত উদ্যোক্তা তারা ঋণ পায় না। অনেক সময় তহবিলের অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়।”
২০১৪ সালে ফের নতুন তহবিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতের আওতায় আবারো আলাদা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাওয়া উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক মূলধনের ব্যবস্থা করা। এই তহবিলের আওতায় তখন জামানত ছাড়া সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত থাকলে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ ছিল। বয়সসীমা ছিল ১৮ থেকে ৪৫ বছর। আগে ব্যাংক ঋণ না নেওয়া উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য করে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে এই প্রকল্পের আকার ছোট ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত এই নতুন উদ্যোক্তাদের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৫৩ লাখ টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছিল। এক বছর পর, ২০১৬ সালের জুনে মোট ২০৬টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে পুনঃঅর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র আট কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, এই স্কিমের আওতায় মোট ২১৪ কোটি ৪ লাখ টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছিল। সুবিধাভোগী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ উদ্যোক্তা দুই হাজার ৯০২ জন এবং নারী উদ্যোক্তা ১৭৬ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত দুই হাজার ৮১০টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ২১৪ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে।
রাজশাহীর তরুণ উদ্যোক্তা রকিবুল আলমের এই তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ‘ভালো নয়’। চরচাকে তিনি বলেন, “২০১৪ সালে আমি পত্রিকায় সংবাদ দেখে ব্যাংকে ঋণ নিতে গিয়েছিলাম। তখন ব্যাংক ম্যানেজার আমাকে এমনভাবে ‘হাইকোর্ট’ দেখালেন যে আমি আর কখনোই ব্যাংকে যাইনি। পরে জানলাম, সরকার এটা শুধু ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তার তদারকি করে না। আর আমাদের মতো উদ্যোক্তারা ব্যাংকে গিয়ে হয়রানি হয়।”
২০২১ সালে ফের ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড
এরপর আবার বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন উদ্যোগ নেয়। উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ২০২১ সালে ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠন করে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিজেদের তহবিল থেকে প্রতি বছর পরিচালন মুনাফার ১ শতাংশ করে স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের আওতায় ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে এটি পুরোপুরি জামানতবিহীন ছিল না। শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কারিগরি প্রশিক্ষণ থাকতে হবে এমন শর্ত রাখা হয়েছিল। ব্যাংকগুলোকে আবার নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হতো, যেমন- খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের মধ্যে থাকা এবং মূলধন পর্যাপ্ততা ও তারল্য সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করা।
অর্থাৎ, কাগজে নতুন উদ্যোক্তার জন্য বড় একটি তহবিল তৈরি হলেও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, যোগ্যতা যাচাই এবং বিভিন্ন শর্তই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ থাকা আর একজন নতুন উদ্যোক্তার হাতে সহজে টাকা পৌঁছানো, এক বিষয় নয়।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, “এমন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ করেছিল যে, তারা ব্যাংকে গেলেও ঋণ পাননি। আমরা তখন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু উদ্যোক্তাদের লিংক করে দিয়েছিলাম। এতে কিছু উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করেছে। তবে এই সংখ্যাটা খুবই কম।”
এবারের ‘উদ্যোগ’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
চলতি বছরের প্রস্তাবিত ‘উদ্যোগ’ স্কিমে পুরনো সমস্যার কিছুটা ভিন্ন সমাধানের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০০ কোটি টাকা ঋণ এবং ৫০০ কোটি টাকা অনুদানের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১০ লাখ টাকা এবং সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সময়মতো ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অনুদান দেওয়ার ধারণাও রয়েছে।
এই কাঠামো কার্যকর হলে আগের স্কিমগুলোর তুলনায় একটি বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। কারণ শুধু ঋণ দেওয়ায় নয়, ভালো উদ্যোক্তাকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে এবার। এতে উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের আগ্রহ বাড়তে পারে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিও কমতে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আগের স্কিমগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা যদি হয়ে থাকে ঋণ ব্যাংক থেকে প্রকৃত নতুন উদ্যোক্তার কাছে অর্থ পৌঁছানো, তাহলে নতুন স্কিমে সেই বাধা কীভাবে দূর করা হবে? ১০ লাখ টাকা জামানত ছাড়া দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের যদি আয়, সম্পদ, কাগজপত্র বা ক্রেডিট হিস্ট্রির মতো কঠিন শর্ত আরোপ করে, তাহলে আগের সমস্যাই ফিরে আসতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ঋণের পরিমাণ, তহবিলের আকার এবং যোগ্যতার বিষয়গুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত হলে সেখানে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তখন সেটা প্রজ্ঞাপন আকারে ঘোষণা দেওয়া হবে।”