গত শনিবার রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রীয়মের মরদেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ঘটনাটি সামনে আসে। এত সময় কেন লাগল? এ বিষয়ে প্রতিবেশীরা কি কিছু জানত না? নাকি তারা জেনেও চুপ ছিল?
এই ঘটনায় আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস গ্রেপ্তারের পর দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দাবি ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় একে একে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ। আসামি দুজন সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধকে।
সুরতহাল প্রতিবেদন এবং আসামি দুজনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শুক্রবার ভোরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তা জনসম্মুখে এসেছে প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর। কীভাবে এই ঘটনা সামনে এল, তার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে চরচা। মূলত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর বন্ধু এবং প্রেমিকের তৎপরতায় জানাজানি হয় ঘটনাটি।
প্রার্থীর বন্ধু এবং প্রেমিকের সঙ্গে কথা হয় চরচার। সাংবাদিকতার রীতি মেনে ওই যুবকের নাম পরিচয় প্রকাশ করছে না চরচা।
পুলিশি পাহারায় আসামিদের আদালতে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: ইউএনবি
বুধবার দুপুরে ওই যুবকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, প্রার্থীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক প্রার্থীর মা জানতেন। তবে এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না প্রার্থীর বাবা গণপতি চক্রবর্তী। নিয়মিত প্রার্থী এবং তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ওই যুবকের। এমনকি এক মাস পর প্রার্থীর মায়ের যুবকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বিয়ের বিষয়ে আলাপ শুরুর প্রস্তুতিও ছিল। ঘটনার আগে সবশেষ রাত দেড়টার দিকে প্রার্থীর সঙ্গে ওই যুবকের ৪০ সেকেন্ড হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। সেসময় প্রার্থী তাকে পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই সঙ্গে প্রার্থী জানতে চেয়েছিলেন, বাসায় ওয়াইফাই-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট কানেকশন নিতে কী করতে হবে? ৪০ সেকেন্ডের আলাপচারিতায় এটুকুই ছিল। কিন্তু এ সময় প্রার্থীদের বাসা বিদ্যুৎহীন ছিল–এমন কোনো তথ্য যুবককে দেননি। এই যুবক প্রার্থীদের পাশের এলাকায় থাকেন। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে ফোন করলে প্রার্থীর নম্বর বন্ধ পান তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে এটিকে গুরুত্ব দেননি তিনি।
ওই যুবক বলেন, “প্রায় সময় এমনটা হতো যে, প্রার্থীর নম্বর বন্ধ থাকে। তাদের বাসায় ব্রডব্যান্ডের ইন্টারনেট ছিল না। মোবাইল ডেটা দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করত। দুই ভাইবোন মোবাইলে লুডু খেলত। লুডু খেলার সময় ফোন এসে যেন খেলার মাঝে ব্যাঘাত না ঘটায়, সেজন্য ফোনটি ফ্লাইট মোডে রেখে দিত–এমনটা অনেকবার হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা মোবাইল বন্ধ পেলেও আমি গুরুত্ব দিইনি। সন্ধ্যার পর আমি তার মাকে ফোন করি। কিন্তু ওনার নম্বরও বন্ধ। তখন আমার একটু টেনশন লাগা শুরু হয়। রাতে অনেকবার ফোনে চেষ্টা করি, ফোন বন্ধই থাকে। কিন্তু সরাসরি বাসায় যেতে অস্বস্তি লাগছিল। তাই শনিবার দুপুরে তাদের একটি হোমিওপ্যাথির দোকান আছে, সেখানে গিয়ে খোঁজ নিই। দোকান বন্ধ দেখে আশপাশের অন্য দোকানিদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানান বৃহস্পতিবারের পর দোকান খোলা হয়নি।”
দোকান বন্ধ থাকার তথ্য পেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন নিহত প্রার্থীর বন্ধু। এরপর তিনি তার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রার্থীদের বাসায় ছুটে যান। বাড়ির বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখতে পান দোতলায় বাতি জ্বলছে। এ সময় প্রতিবেশীদের কাছে প্রার্থীদের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা কেউ কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। এ সময় প্রার্থীদের বাড়ির মেইন গেটের ভেতরে উঠানে তিন নারীকে বসে থাকতে দেখেন ওই যুবক এবং তার বন্ধু। তাদের দেখে মেইন গেটের ভেতরে ঢুকে প্রার্থীর বন্ধু ওই নারীদের কাছে প্রার্থী এবং তার পরিবারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় এক বিস্ময়কর তথ্য দেন ওই তিন নারী।
তারা প্রার্থীর বন্ধুকে বলেন, প্রার্থী এবং তার পরিবার শুক্রবার সকালে এখান থেকে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন, তারা কেউ তা জানেন না। প্রার্থীর বন্ধু চরচাকে বলেন, “ওই তিন নারীর এই কথায় খুব অবাক হয়েছি আমি। কারণ, বাসার দোতলার বাতি দিনের বেলাতেও জ্বলছিল। এভাবে বাতি জ্বালিয়ে কেউ বাসা থেকে চলে যাওয়ার কথা না। সেসময় আমি ওই তিন নারীর পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের পরিচয় না দিয়ে বাড়ির উঠোন থেকে বেরিয়ে যান।”
ওই তিন নারীর এমন আচরণে সন্দেহ জাগে যুবকের মনে। তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে প্রার্থীদের নির্মাণাধীন বাড়ির দোতলায় যান। কিন্তু এ সময় এলাকার বিদ্যুৎ চলে যায়। অনেকক্ষণ দরজায় কড়া নেড়েও কারো সাড়া মেলে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ এলে কলিংবেল বাজিয়েও ভেতর থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। এভাবে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ওই যুবক প্রার্থীর এক মাসিকে ফোন করেন।
প্রার্থীর মাসি জানান, বৃহস্পতিবারের পর থেকে তাদের সঙ্গে কারোর কোনো যোগাযোগ নেই। মাসিকে দ্রুত প্রার্থীদের বাসায় আসার অনুরোধ করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রার্থীর মাসি এবং তার স্বামী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। আবার সবাই মিলে ডাকাডাকি করেও ব্যর্থ হন। একসময় ওই যুবক এবং তার বন্ধু বাড়ির পেছন দিয়ে দেয়ালে চড়ে দোতলার জানালা খুলে উঁকি দিতেই দেখেন ঘরের সকল জিনিস এলোমেলো পড়ে আছে।
প্রার্থীর ওই বন্ধু চরচাকে বলেন, “আমি জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েই বুঝেছি, ঘরে ডাকাতি হয়েছে। আমরা দ্রুত কোতোয়ালি মডেল থানায় গিয়ে পুলিশকে ঘটনাটি জানাই। কিন্তু তারাও প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ চুরির বিষয় মনে করে আমলে নেয়নি। সেখানে আমাকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। থানা থেকে বলা হয়, আমি যেন লিখিত অভিযোগ দিই। আমার তখন দুশ্চিন্তায় হাত পা চলছিল না। তবুও কোনো রকমে একটা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তারপর রাতে দরজা ভেঙে ঘরে কাউকেই পাওয়া যায় না। ঘরের জিনিস, আসবাবপত্র–সবই ছিল এলোমেলো। দেখে বোঝাই যাচ্ছিল ডাকাতি হয়েছে। পরে পুলিশ সদস্যরা ছাদে উঠতে সিঁড়িতে গিয়ে প্রার্থী এবং তার মায়ের মরদেহ আর ছাদে গিয়ে পান স্যারের মরদেহ। অনেকক্ষণ খুঁজে দোতলার বাসার প্রিয়মের রুমে খাটের পাশে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় প্রিয়মের মরদেহ খুঁজে পায় পুলিশ।
আজ বুধবার দুপুরে রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে একই বক্তব্য তুলে ধরেন প্রার্থীর ওই বন্ধু। তার পুরো বক্তব্য ভবিষ্যৎ আলামত হিসেবে ভিডিও এবং লিখিত আকারে রেকর্ড করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এই ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন প্রার্থীর এই বন্ধু। তিনি জানান, প্রার্থীর বাবা তাদের সম্পর্কের কথা না জানলেও প্রার্থীর মা দুজনের সম্পর্ক খুব ভালোভাবে মেনে নিয়েছিলেন। তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য নিজে থেকে মঙ্গলসূত্র এবং হাতের শাখাও বানিয়ে রেখেছিলেন। এক মাসের মধ্যে প্রার্থীর বাবাকে সব জানিয়ে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
প্রতিবেশীরা জেনেও চুপ ছিল?
প্রার্থীর বন্ধু এবং প্রেমিক ওই যুবকের তথ্যের সূত্রে সেদিন উঠোনে অবস্থান করা তিন নারীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তারা কারা এবং কেনইবা ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন–এটি নিয়ে তদন্ত করছে রংপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা বিভাগ।
আবার ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে চরচা নিশ্চিত হয়েছে যে, নিহতদের বাড়ির সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী হিসেবে যারা আছেন, তাদের দুই পরিবারের সদস্য সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ এ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। এর বাইরে অন্যান্য লাগোয়া প্রতিবেশী যারাই আছেন, তারাও কোনো না কোনোভাবে দুই আসামির ঘনিষ্ঠ। তাই প্রতিবেশীরা এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জেনেও প্রায় দুদিন পুলিশকে খবর দেয়নি–এমনটাও হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী চরচাকে বলেন, “আমরাও এমনটাই মনে করছি যে, প্রতিবেশীদের অনেকেই ঘটনাটি জানতেন। কিন্তু জেনেও তারা চুপচাপ ছিলেন। নিজে থেকে পুলিশকে জানাননি কেউই। আমাদের তদন্তকাজ চলছে, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়া আমরা এর পূর্ণ তদন্ত শেষে আরও কেউ জড়িত থাকলে, তাদেরও আইনের আওতায় আনব।”
ঘটনাটি যে প্রতিবেশীদের জানা ছিল এবং তা তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন–এই সন্দেহ আরও দৃঢ় করেছে আসামি সিদ্ধার্থকে আটকের প্রক্রিয়া। বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা এবং নিহত তিনজনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে কোন তথ্য না মেলায় এর আসামী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া দুষ্কর ছিল। কিন্তু প্রতিবেশীদের একজন নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছে সিদ্ধার্থের নাম বলেছিলেন। পরে সিদ্ধার্থকে আটকের পর তার শরীরে একাধিক নখের আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়, যা নিহত প্রার্থীর নখের আঁচড় বলে এরই মধ্যে আদালতে স্বীকার করেছেন সিদ্ধার্থ।