চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সাংস্কৃতিক পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে বলে দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এর প্রভাবে ভাটা পড়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রধান অনুষঙ্গ বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, বাদ্যযন্ত্র বিক্রি কমে গেছে ৫০% এরও বেশি।
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাউল-ফকির সাধকদের চারণভূমি মাজারে মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর আক্রমণ, বিভিন্ন জায়গায় কনসার্টে তৌহিদী জনতার আক্রমণ, নৌকা বাইচ, পালাগান, বাউল গানের আয়োজন পণ্ড করে দেওয়া, স্কুল-কলেজে সাংস্কৃতিক আয়োজনে হামলার হুমকির মতো অনেক কিছু ঘটেছে। শিল্প-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এর প্রভাব পড়েছে বাদ্যযন্ত্র বেচা-কেনায়।
তবে সরকার বলছে, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাক এমনটা তারা চান না। আইনের ব্যত্যয় হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি। আজ মঙ্গলবার তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ সাংবাদিকদের বলেছেন, “কোনো কনসার্ট বাতিল হওয়াকে সরাসরি সরকারের অসহযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারণে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হতে পারে।”
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যতটুকু হয়েছে, আমরা আশা করি এগুলো খুব দ্রুতই আমরা ঠিক করতে পারব।” মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট প্রতিষ্ঠান এ্যাকোস্টিকার সৈকত বিশ্বাস টুটুল চরচাকে বলেন, “এখন ঢাকায় সায়েন্সল্যাবে আমার তিনটি শোরুম। চট্টগ্রামেরটা আমরা ২৪ এর পরেই অফ করে দিয়েছি। এখন ব্যবসায়ের অবস্থা হলো, ২০২৪-২৫ সালতো এমনিই খুব খারাপ ছিল কারণ দেশের একটা পরিবর্তন ছিল। বর্তমান সরকার আসার পর আমরা চিন্তা করেছিলাম এই ব্যবসাটার একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এখন আসলে দিনকে দিন আরও খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে। আগে বলতাম ৫০% ব্যবসা খারাপ। এখন দিনেই কোনো সেল নাই তারপর আবার বিদ্যুৎ থাকে না। এখন বিক্রি ৬০% এর উপরে পরে গেছে। যেখানে প্রতিদিন একটা ভালো এ্যামাউন্ট সেল করতাম এখন আসলে খুব বাজে অবস্থা।”
১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করা ‘মেলোডি অ্যান্ড কোং’ বাদ্যযন্ত্র প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী শংকর সরকার চরচাকে বলেন, “যেহেতু কনসার্ট হচ্ছে না বা কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সে জন্য ব্যবসাও খুব খারাপ দিকে যাচ্ছে। একটা কনসার্ট দেখলে একটা তরুণ ভাবে যে আমি একটা গিটার বাজাব বা একটা ড্রাম কিনব। যেহেতু কনসার্ট হচ্ছে না সেহেতু আমাদের বেচা-কেনার অবস্থায়ও খারাপ। বিশেষ করে, সাউন্ডের ব্যবসার অবস্থাতো খুবই খারাপ। আপনি যদি বলেন, আগের চেয়ে এখন ৫০% এর নিচে নেমে আসছে আমাদের ব্যবসা। আমি বলব যে প্রায় ৩০% এ নেমে আসছে।”
রাজধানীতে বাদ্যযন্ত্র বেচা-কেনার দুইটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র সায়েন্সল্যাব মোড় ও পুরান ঢাকা। সায়েন্সল্যাবের একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রি হয় হারমোনিয়াম-তবলাসহ গিটারের মতো আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা আশায় ছিলেন যে, হাওয়া বদলাবে। কিন্তু আশার গুড়ে বালি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সায়েন্সল্যাবের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসায়ী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সুরশ্রীর স্বত্ত্বাধিকারী দুলাল সরকারের কন্ঠেও হতাশার সুর।
চরচাকে তিনি বলেন, “এটা একান্ত শখের জিনিস। মনের খোরাক। মানুষের আনন্দ-বেদনাকে প্রকাশ করতেই মানুষ গান বাজনা করে। বেচা-বিক্রি তেমন একটা ভালো বলা যাবে না। চলছে আরকি। আগের মতো টেনশন ফ্রি না আমরা। হয়তো এক মাস একটু ভালো হয় আরেক মাসে ভাড়াই দিতে পারতেসি না। তবে কারেন্টটার জন্য আমাদের একটু বেশি সমস্যা হচ্ছে।”
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে আমদানিতে দীর্ঘ সময় আর বাড়তি খরচ। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রাত ৮টার মধ্যে দোকান-পাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনাও হয়ে উঠেছে মাথা ব্যথার কারণ।
সিভিক মিউজিক পয়েন্ট-এর স্বত্ত্বাধিকারী ফরিদ আহমদে ভুইয়া চরচাকে বলেন, “সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলাতো বন্ধ করেই দিসে একরকম। ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছি। এখন তো আমাদের করুণ অবস্থা। চাইলেই তো একটা ব্যবসা বদলানো যায় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। আমরা চাই যে ব্যবসা করে কোনো মতে সংসারটা চালাই। আমরা কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখি না।”
এ্যাকোস্টিকার স্বত্ত্বাধিকারী সৈকত বিশ্বাস টুটুল চরচাকে বলেন, “চেয়েছিলাম পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এখন কীভাবে যে আসবে, কোনো পথ বা কূল কিনারা পাচ্ছি না। ইম্পোর্ট থেকে শুরু করে সবকিছুতেই খরচ বেড়ে গেছে। একটা লট আসতে ২/৩ মাস সময় লাগে আগে যেটা দেড়-দুই মাসে হয়ে যেত। ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবেই আমাদের মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্টের ব্যবসা ক্ষতির মুখে।”
রাজধানীর পুরান ঢাকার লক্ষীবাজার বাদ্যযন্ত্রের একটি জমজমাট জায়গা। সেখানে শত বছর ধরে ব্যবসায় নিয়োজিত ঐতিহ্যবাহী যতীন অ্যান্ড কোং। প্রতিষ্ঠানের ম্যানাজার নব কুমার জানান, ব্যবসা তো নেই-ই তার ওপর দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় অনেকে হারমোনিয়াম ফেরত দিয়ে যাচ্ছে। ১৯১০ সালে স্থাপিত ‘যতীন অ্যান্ড কোং’ মূলত হারমোনিয়ামের আদি ব্যবসায়ী।
নবকুমার চরচাকে বলেন, “২৪ এর পরে গান-বাজনাতো বন্ধই ছিল। অনেকেই হারমোনিয়াম ফেরত দিয়া গেছে। বলছে, ‘দাদা, গান বাজনা করা যাবে না’। তাছাড়া অনেকে বলে, ‘মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিসি। হবে না। গান করবে না। আপনাদের হারমোনিয়াম আপনারা রাখেন’।”
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি একটু পরিবর্তন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারেক রহমান আসার পর যখন বলছে যে, সাংস্কৃতিকমনা হতে হবে। লেখা-পড়ার পাশাপাশি আর্ট কালচার গান-বাজনা না হলে মানুষের মন ভালো থাকে না। এর পর থেইক্যা এই ফেরত দেওয়াটা একটু কমে গেছে।”
বিক্রি কেমন জানতে চাইলে নবকুমার বলেন, “না, আগের মতো সেই বিক্রি নাই।”