মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুলনা মহানগরী ও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় খুন-খারাবি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
পুলিশের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে অপরাধীদের পারস্পরিক বিরোধের জেরে ঘটছে। বাকি ৫ শতাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে অন্যান্য কারণ।
পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র-মাদক উদ্ধারে অভিযান চালালেও কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে অনেকে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খুন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
চলতি বছর নগরীতে ২২ হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের শুরু থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ২২টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর অধিকাংশই আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শমসের আলী মিন্টু বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
শমসের আলী বলেন, “মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থায় তারা খুবই অসন্তুষ্ট। প্রশাসনের দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
মাদকের আধিপত্যের কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ খুন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর দায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এড়িয়ে যেতে পারে না।
বিষয়টি এড়িয়ে যাননি খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। চরচাকে তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি হয়েছে। আগে যে উদ্যম নিয়ে তারা কাজ করতেন, সেটি এখন অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।”
তাজুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “৫ আগস্টের পর পুলিশ যে ধাক্কা খেয়েছে, সেটা এখনো পুরোপুরি সামলাতে পারেনি। দ্বিতীয় বিষয় হলো, মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত, সেটি কমে গেছে। মানুষ যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।”
খুলনার পুলিশ সুপার বলেন, “সব ঘটনার জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না। সমাজব্যবস্থার উন্নতির দায়িত্ব আমাদের সবার।”
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, যারা অপরাধীদের সহযোগিতা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সম্প্রতি চরমপন্থীদের তৎপরতা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “৯৫ শতাংশ হত্যাকাণ্ডই মাদককেন্দ্রিক।”
মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণই কি মূলে
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে মাদকের বিষয়টি ঘুরেফিরেই সামনে আসছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের তরফ থেকে অভিযান চালালেও মাদক কারবার ও এর নিয়ন্ত্রণ ঘিরে হওয়া অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিগত সরকার আমলেও খুলনায় মাদক কারবার ছিল। তবে তখন মাদক ব্যবসা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি তেমন একটা দেখা যায়নি।
বর্তমানে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একাধিক গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বাড়ছে।
গত জুলাই মাসে নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া বড় খালপাড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ইসমাইল (৩২) নামের এক যুবক। ফাইল ছবি
এরই জেরে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মূল উৎস হচ্ছে মাদক।
প্রেসক্লাবের এই নেতা বলেন, “মাদকের বিক্রি এত বেড়ে গেছে যে, বিভিন্ন সিন্ডিকেট একে অপরকে কীভাবে ঘায়েল করে আধিপত্য বিস্তার করবে এবং যুবসমাজের কাছে কীভাবে মাদক পৌঁছে দেবে–এসব নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।”
এ পরিস্থিতিকে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এর জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। বিশেষ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। নাগরিক নেতাদেরও কথা বলার সময় এসেছে।”
তরিকুল ইসলাম বলেন, “ঘরে ঘরে যদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখতে না চান, তাহলে সবাইকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।”
ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে মাদক জড়িত বলে মনে করেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার তিনি বলেন, “বারবার বলা হচ্ছে, মাদকের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মাদককেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের অনেকেই ধরা পড়ছে না।”
যদিও পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। খুলনার পুলিশ সুপার এম এম শাকিলুজ্জামান চরচাকে বলেন, “আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হচ্ছে, আসামিও গ্রেপ্তার হচ্ছে।”
পুলিশের দাবি, অভিযান থেমে নেই
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যর্থ–এমনটা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান দেখলেই পুলিশের কার্যক্রমের বিষয়টি বোঝা যাবে।
হরিণটানা এলাকার দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সাইফির নাম এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তাকেও এর আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে জামিনে বের হয়েছে।”
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে মাদকের বিষয়টি ঘুরেফিরেই সামনে আসছে। ছবি: সংগৃহীত
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। তেমনি সমাজের সবারও যার যার দায়িত্ব পালন করা উচিত।”
শহরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকেই এসব ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে মাদকেরও যোগসূত্র রয়েছে।
মানুষকে সচেতন করতে উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনতে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।
তবু প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কোনো সময়ের তুলনায় খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।
বাবুল হাওলাদার বলেন, “এটা দীর্ঘদিনের একটি সংকটে রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন শাখা এখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের প্রশ্ন প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে কি না, পেশাদারত্বের ঘাটতি রয়েছে কি না, নাকি প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে? কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে।” তিনি বলেন, “ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত কোথাও মানুষ নিরাপদ নয়। যখন-তখন খুনের ঘটনা ঘটছে।”
খুলনাকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে জনবল বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এনে টেকনিক্যাল সহায়তা বাড়াতে হবে।
খুলনা নাগরিক সমাজের কাছেই সন্ত্রাসীদের তালিকা এবং তাদের কাছে থাকা অস্ত্রের তালিকা রয়েছে বলে দাবি করেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। চরচাকে তিনি বলেন, “সেগুলো উদ্ধার হচ্ছে না। তারা গ্রেপ্তারও হচ্ছে না।”
আছে আশ্বাস ও নাগরিক সম্পৃক্ততার আহ্বান
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসবিরোধী সভা করা হচ্ছে। খুব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু চরচাকে বলেন, “সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। গত কয়েকদিনের ঘটনায় জনগণ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বুধবারের দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।”
প্রশাসনকে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন সেভাবেই কাজ করছে।
সন্ত্রাস দমনে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
একই ধরনের আশ্বাস মিলল খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনার কাছ থেকেও। চরচাকে তিনি বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে নগরবাসীর সঙ্গে তারাও উদ্বিগ্ন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনকে আমরা জানিয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দলের পক্ষ থেকে অচিরেই উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
আর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শুধু পুলিশের একার পক্ষে সমাজের সব ধরনের অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।