খুলনা মহানগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের ‘মশক নিধন কর্মসূচি’ কোন কাজে আসছে না। ইতিমধ্যেই নগরীর চারটি ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) পরিসংখ্যানেও নগরীতে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি । এ ওয়ার্ডে ১১১ জন ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছে ২৯ নম্বর ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডে ১০০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ জন এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী রয়েছেন। ৩০, ২৯, ২৮ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড রেড জোনের আওতায়। এই চারটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু পরিস্তিতি ভয়াবহ।
অপরদিকে ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ‘কমলা জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব পাঁচ ওয়ার্ডে মোট ২৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। কম ঝুঁকিপূর্ণ ‘হলুদ জোনে’ থাকা ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে এ পর্যন্ত ১১৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আর চিকিৎসার জন্য নতুন ১৩৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ইতিমধ্যেই গত এক সপ্তাহে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চলতি বছরে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। এর মধ্যে শুধু খুলনা জেলাতেই মারা গেছেন ১৪ জন।
এছাড়া বাগেরহাটে একজনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে আরও ১৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। অনেক রোগীকে শয্যার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি খুলনা সিটি করপোরেশনও মশক নিধন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে।
আজ বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৩৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১০১ জন সরকারি হাসপাতালে এবং ৩২ জন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনায়। এ জেলার ৯টি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় ২৪ ঘন্টায় নতুন রোগীর সংখ্যা ৬৮ জন। এছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন। এছাড়া বাগেরহাটে ৩, যশোরে ১২, ঝিনাইদহে ৩, সাতক্ষীরায় ৩, কুষ্টিয়ায় ৪, মাগুরায় ২, নড়াইলে ১ এবং চুয়াডাঙ্গায় ২ জন ভর্তি হয়েছেন। তবে মেহেরপুরে নতুন করে কোন রোগীর ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ শেখ মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, “চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৩ হাজার ৮২৩ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩ হাজার ২৬৭ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫০২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ৩৯ জন রোগীকে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়েছে। রোগীর চাপে খুমেক হাসপাতালসহ ২৪ ঘণ্টায় খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জেলার অন্যান্য হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ৩৪৪ জন রোগী ভর্তি আছেন।”
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, “হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।”
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা জেনারেল হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য কেসিসিতে পাঠানো হয়।
এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, “পরীক্ষায় পজিটিভ আসা রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতেই ওয়ার্ডভিত্তিক আক্রান্তের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় কেসিসি নগরীর ওয়ার্ডগুলোকে ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন জোনে ভাগ করে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রের মাধ্যমে মশক নিধন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালায় মশক নিধনে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে হুইল ব্যারো ফগার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিস্কার পরিচ্ছন অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত, কেসিসির কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল, মশক নিধনের পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে অভিযান চালানো হচ্ছে। গত শনিবার থেকে কেসিসির উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হচ্ছে।”
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই সতর্ক করেছে যে খুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হতে পারে। সরকারও এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। আরও দুই থেকে তিন মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।” তিনি বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। নগরবাসীকে সতর্ক করতে দিনরাত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্নভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কেসিসিকে সহযোগীতায় রেড ক্রিসেন্টের যুবকরা কাজ করছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।”
কেসিসি প্রশাসক আরও জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। আক্রান্তের হার বিবেচনায় নগরীর চারটি ওয়ার্ডকে রেড জোন, পাঁচটি ওয়ার্ডকে কমলা জোন এবং বাকি ওয়ার্ডগুলোকে হলুদ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা নগরবাসীকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি পরিস্কার করার জন্য বলা হয়েছে।