বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে অনেকটা অনুকূল পরিবেশে আছে, তার প্রামণ পাওয়া যায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে কোনো নির্বাচনে জামায়াত এত আসন পায়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ–এই তিন ইসলামী দলও সংসদে জায়গা করে নিয়েছে।
১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম জামায়াতের বাইরে একাধিক ইসলামপন্থী দল জাতীয় সংসদে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করছে। যদিও একটি বাদে বাকি দলগুলো জামায়াত জোটের শরিক। এদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরের দলগুলোও রাজনীতিতে সক্রিয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের রাজনীতি এখন আর শুধু ‘জামায়াত বনাম অন্য দল’, এই সমীকরণে আটকে নেই। বরং জামায়াতের নেতৃত্ব, চরমোনাইয়ের স্বতন্ত্র ধারা, কওমিপন্থী দলগুলোর নিজস্ব রাজনীতি, বিএনপির সঙ্গে জমিয়তের উলামায়ে ইসলামের সমঝোতা এবং হেফাজতকেন্দ্রিক ‘কওমি ঐক্যের চেষ্টা’, সব মিলিয়ে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে একাধিক কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
এই মেরুকরণ আগামী দিনের বিরোধী রাজনীতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ভোটের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় সাতটি কওমি ঘরানার দল নিয়ে ‘নতুন জোট’ গঠনের চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ, ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনীতিতে এখন একসঙ্গে তিনটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেগুলো হলো–জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী রাজনীতি, স্বতন্ত্র ইসলামী রাজনীতি এবং কওমি ঘরানার নতুন ঐক্য গঠনের চেষ্টা।
সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য এখন কার্যত ৯ দলের প্ল্যাটফর্ম। এই জোটের শরিকরা অবশ্য সবাই ইসলামী দল নয়। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কয়েক মাস ধরে জোটের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত। গত ২৫ জুলাই দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেয়।
শহীদ মিনারে ১১ দলীয় জোটের নেতাদের শ্রদ্ধা। ছবি: তথ্য অধিদপ্তর
সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়া জামায়াতের এক প্রার্থী চরচাকে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী তার শরিক দলগুলোর বিষয়ে অনেক আন্তরিক। তারপরও কেন খেলাফত মজলিস জোট ছেড়ে গেল–এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা জামায়াতে ইসলামী মধ্যেও রয়েছে।” গত নির্বাচনে দল হিসেবে এই জোটের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে জামায়াতের ঘরে। দলটি ৬৮টি আসন পায়। জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পায়। ফলে নির্বাচনের পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মোট আসন দাঁড়ায় ৭৭।
৭ ইসলামী দলের নতুন উদ্যোগ
গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ‘ইচ্ছায়’ কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী দলের নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে কওমিপন্থীরা একটি নতুন জোটের ইঙ্গিত দেন। সাতটি ইসলামী দলের তিনজন করে প্রতিনিধি ওই বৈঠকে অংশ নেন। দলগুলো হলো–জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বৈঠকে দলগুলো ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে চলার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছায়। তবে এখনো এটিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোট বলছে না দলগুলো। এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে।
সভা শেষে হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমান বলেন, “সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অল্পদিনের মধ্যেই সেই ঐক্যের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে।”
বৈঠক শেষে হেফাজতের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও একই ধরনের তথ্য জানানো হয়েছে।
সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোটে কওমি ধারার চারটি দল ছিল। ওই জোট ‘১১ দলীয় ঐক্য’ নামে পরিচিত, যারা সংসদে বিরোধী জোটের ভূমিকায়। এই জোটে রয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদের খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। চারটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বই হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন শীর্ষ পদে রয়েছেন।
নির্বাচনের প্রচারে মামুনুল হক। ছবি: সংগৃহীত
জামায়াতের ওই চার ‘রাজনৈতিক মিত্র’ ছাড়াও হেফাজতে ইসলামে কওমি ধারার আরেক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে সংসদ নির্বাচন করে।
গত নির্বাচনের সময়ও জামায়াতকে ভোট না দিতে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছেন। গত বছর আগস্টে চট্টগ্রামে এক জনসভায় বাবুনগরী জামায়াতে ইসলামীকে ‘ভণ্ড ইসলামি দল’ আখ্যা দেন।
অন্যদিকে শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও নির্বাচনের আগে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কাছাকাছি এলেও নির্বাচনের আগেই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। অবশ্য এর আগে জামায়াতের ‘আকিদা’ নিয়ে খোলামেলা দলটির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারাও। জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে আসায় গত জানুয়ারি মাসে ইসলামী আন্দোলনকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
মামুনুল হকের দল দুই দিকেই
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক আলোচিত নেতা মাওলানা মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। আগামী স্থানীয় নির্বাচনেও জোটের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে দলটি প্রার্থী দেবে বলে জানিয়েছে। সংসদ নির্বাচনে দলটি ময়মনসিংহ-২ ও মাদারীপুর-১ আসনে জয় পায়। মাদারীপুর-১ আসনে সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা মাত্র ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
কওমি-ভিত্তিক জোটে দলটির থাকার বিষয়ে এক জ্যেষ্ঠ নেতা চরচাকে বলেন, “দলের আমিরও তো প্রস্তাব দিয়েছেন (৭ দলীয় ঐক্যে)। তবে দল এখনো জামায়াত ছাড়বে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়নি।”
তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, তারা দুদিকেই থাকবেন। তাতে কোনো সমস্যাও দেখছে না তারা। চরচাকে তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। সেখানে কওমি ঘরানাদের সাতটি দল কীভাবে কাছাকাছি থাকা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াত জোট ছাড়বেন কি না–জানতে চাইলে জালালুদ্দীন বলেন, “এখানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো–রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তে প্রত্যেকটা দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকবে। আমাদের দেওয়া প্রস্তাবনায় এমন আছে। এ জন্য আমি মনে করি ওখানে (কওমি জোট) অ্যালায়েন্স হতে পারে। এতে আমাদের ১১ দলীয় জোটে কোনো প্রভাব পড়বে না।”
খেলাফত মজলিস: জামায়াত থেকে বেরিয়ে ‘একা’
খেলাফত মজলিসও জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্যের শরিক ছিল। গত নির্বাচনে দলটি সিলেট-৫ আসনে জয় পায়। কিন্তু গত ২৫ জুলাই দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা ঘোষণা করে, তারা আর ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। দলের বক্তব্য, জোট ছিল মূলত নির্বাচনী সমঝোতা; নির্বাচন শেষ হওয়ায় সেই সমঝোতার রাজনৈতিক প্রয়োজন শেষ হয়েছে। তবে সংসদে নির্বাচিত সদস্য বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবেন।
১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে দলীয় অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের চরচাকে বলেন, “আমরা এককভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। সারা দেশে বৃহত্তর জেলায় সমাবেশ হবে। আমরা এককভাবে এখন কাজ করতে চাই।”
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের সঙ্গে জোট করবেন কি না–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা হবে কি না, এখনো বলা যাচ্ছে না।”
ইসলামী আন্দোলন: নিজস্ব রাজনীতির পথে
দেশের বড় ইসলামী দলগুলোর একটি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন। দলটি নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের অভিযোগ ছিল, জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়াহভিত্তিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। দলটি সে সময় ২৬৮টি আসনে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেয়। নির্বাচনে অবশ্য চরমোনাই পীরের দল সেরকম সাফল্য পায়নি। ২৫৯ আসনে লড়ে একটি আসনে জয় পায় তারা। বরগুনা-১ আসনে দলটির প্রার্থী মো. ওলি উল্লাহ এখন সংসদে। হেফাজতে ইসলামের আমিরের ‘পরামর্শে’ কওমিপন্থীদের সম্ভাব্য সাতদলীয় জোটে তারা থাকবে বলে জানা গেছে।
সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
নির্বাচনের পর দল পুনর্গঠনে ইসলামী আন্দোলন মনোযোগী বলে চরচাকে জানিয়েছেন দলটির সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ। তিনি চরচাকে জানান, নতুন সাতদলীয় কওমী জোটে তারাও প্রস্তাব দিয়েছেন।
চরমোনাই পীরের দলের বড় রাজনৈতিক দাবি হলো, জুলাই সনদ অনুযায়ী ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা।
ইসলামী ঐক্যজোট: কওমি জোটের নতুন মেরুকরণের শরিক
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাবেক চারদলীয় জোটে থাকা অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে কওমি-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য হলেও পৃথকভাবে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য হয়নি ইসলামী ঐকজোটের।
ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে ইসলামী ঐক্যজোট আলাদাভাবে রয়েছে। দলটি জামায়াত জোটে যায়নি। তবে কওমিভিত্তিক সাত দলে শরিক হতে যাচ্ছে বলে দলের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজী চরচাকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, তারা ১১ দলীয় জোটের নেই। তবে কওমি জোটে থাকবেন। দল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার কাজ চলছে বলে জানান সাখাওয়াত।
কওমিভিত্তিক দলগুলোর নতুন জোট নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজী চরচাকে বলেন, “সাতদলীয় কওমি জোট হবে। সেখানে সবাই প্রস্তাবনা দিয়েছে। সেই প্রস্তাবনাগুলো সামনে রেখে একটি নীতিমালা তৈরি হবে। সেই নীতিমালায় যারা একমত হবে, তারা থাকবে।”
তবে ইসলামী ঐক্যজোট শুধু বৈঠক ও জোটের আলোচনা নয়, পথেও সক্রিয়। গত মে মাসে দলটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর ‘হামলা, নির্যাতন, মসজিদ-মাদরাসায় আক্রমণ ও সীমান্তে হত্যার’ অভিযোগে ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন: জামায়াত জোট ছেড়ে নতুনের অপেক্ষায়
হাফেজ্জী হুজুরের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল। তবে নির্বাচনের পর দলটি আর ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশ নেয় না বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এখনো বিষয়টি নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে খেলাফত আন্দোলন হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নতুন কওমি জোটে যেতে পারে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। জোট ছাড়ার পেছনে আসন সমঝোতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব এবং আদর্শিক মতপার্থক্যের বিষয় সামনে এসেছে।
দলটির নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনে তারা কয়েকটি আসনে সমঝোতা করতে চাইলেও জামায়াত তাদের কোনো আসনে ছাড়েনি।
বর্তমান দলীয় অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে দলের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদী চরচাকে বলেন, “আমরা এখন ১১ দলীয় জোটে নেই। আমরা এককভাবে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। আমরা তো কওমি ধারার সঙ্গেই সম্পৃক্ত বেশি। সে ক্ষেত্রে জোট হলে খেলাফত আন্দোলন থাকবে ইনশাল্লাহ।”
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা আলাদাভাবে প্রার্থী দেবে বলে জানিয়েছেন মুজিবুর রহমান।
যে অবস্থায় নেজামে ইসলাম পার্টি
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক। গত বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায় দলটি। নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতায় দলটির জন্য দুটি আসনে ছাড় দেয় জামায়াত। নির্বাচনে আসন না পেলেও দলটি জোটের কর্মসূচিতে সক্রিয়। এই দলের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে কওমি ও আলেমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। কওমি জোটে যাবে কি না–জানতে দলটির শীর্ষ নেতাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম: একলা চলো নীতি
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ গত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী সমঝোতার অংশ ছিল। যদিও গত ২০ জুলাই যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বৈঠক করেন, সেখানে তারা যায়নি।
দলটির বর্তমান অবস্থান নিয়ে জমিয়তের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুর রব ইউসূফী চরচাকে বলেন, “আমরা কোনো সময়ই বিএনপি জোটে ছিলাম না। আমরা শুধু নির্বাচনে সমঝোতায় ছিলাম।”
বর্তমানের দলীয় অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা এখনো আগের অবস্থানেই আছি। আমরা আমাদের মতো চলছি। এককভাবে। আগে পরিস্থিতি দেখি।”
গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলটির জন্য চারটি আসন ছেড়েছিল। দলটির সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক সে সময় বিএনপিকে দেশের কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার জন্য ‘বেশি বিশ্বাসযোগ্য’ দল হিসেবে আখ্যা দেন। দলটির বর্তমান অবস্থান দেখায় যে, কওমি ঘরানার সব দল জামায়াতের সঙ্গে যাচ্ছে না; একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতাকে বেশি কার্যকর মনে করছে।
কী অবস্থা জাকের পার্টির?
ছোট ইসলামী দলগুলো যখন জোটগতভাবে রাজনীতি করতে আগ্রহী, তখন আলাদাভাবে রাজনীতিতে রয়েছে জাকের পার্টি। গোলাপ ফুল প্রতীকে দলটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলটির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমীর ফয়সল এবং মহাসচিব শামীম হায়দার।
জাকের পার্টি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন কিংবা কওমিপন্থী অন্য দলগুলোর সঙ্গে এক কাতারে যায় না। দলটি নিজেদের রাজনীতির ভিত্তি হিসেবে দলীয় আদর্শ, সুফিবাদ, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বলে।
জোটে না থাকার কারণ জানতে চাইলে দলটির আইন-বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক খান চরচাকে বলেন, “জোটে গেলে দলের লক্ষ্য নিয়ে তো কথা বলা যায় না। সেখানে তো জোট নিয়েই কথা বলতে হয়। দলের আদর্শ প্রচার করতে হলে জোটে গেলে সেটা তো হবে না।’’
জাকের পার্টি নির্বাচনী রাজনীতিতেও সক্রিয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অল্প কয়েকটি আসতে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি অংশ নেবে বলে জানিয়েছে দলটির দপ্তর সম্পাদক মনিরুজ্জামান। তিনি চরচাকে বলেন, “আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেব। আমরা পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রার্থী দেবে। আমাদের প্রার্থী ঠিক আছে। নির্বাচনের তফসিল হলে প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাবে।”
বৃহত্তর সুন্নি জোটের কী খবর?
ছোট ইসলামী দলগুলোর রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলো ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’। গত সংসদ নির্বাচনে আগে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট, চরমোনাই পীরের দল কিংবা কওমি ধারার বাইরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, তরিকত ও দরবারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনটি নিবন্ধিত দলের সমন্বয়ে জোটটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয়। সেই তিন দল হলো–বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। তবে নির্বাচনে পর জোট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
জোটের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন চরচাকে বলেন, “নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে আর জোট নিয়ে খুব একটা কথা হয়নি। কোনো সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচিও নেওয়া হয়নি। আপতত এটা নিষ্ক্রিয়ভাবে আছে।”
আগামীতে জোট নিয়ে পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি দেখি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব।” কী কারণে নিষ্ক্রিয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের শরিকদের মধ্যে কিছুটা অমিল আছে বলে মনে হয়েছে। সে জন্য নিষ্ক্রিয়।”
দল জোটে থাকবে কি না–জানতে চাইলে এম এ মতিন বলেন, “আগে আমরা শরিকদের মনোভাব বুঝব। এর পর বলা যাবে–জোট বহাল আছে।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই প্রার্থী দেব। আমরা টার্গেট করেছি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য ও চেয়ারম্যান পদে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চেয়ে সেখানে অধিক গুরুত্ব দেব।”
বৃহত্তর সুন্নি জোটের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–এটি মূলত দরবার, তরিকত ও সুফিবাদভিত্তিক সুন্নি মুসলিম ভোটারদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে। জোটের নেতারা নিজেদের ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’-এর অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেন।
জোটের ভোট নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন চরচাকে বলেন, “শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের আরও বিভিন্ন স্থানে আমাদের ভোট আছে। যেমন-হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগর, কুমিল্লায় তিনটি নির্বাচনী এলাকায় আমাদের ভোট আছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, নীলফামারীতে ভোট আছে আমাদের।”
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ আবেদীয়া মোজাদ্দেদীয়া দরবার শরীফের পীর সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী। মহাসচিব আবুল বাশার মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন জুবাইর। চাঁদপুরে দলটির বেশ সমর্থক রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি মাইজভাণ্ডারী দরবারের অনুসারীদের প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এটি। অতীতে দলগতভাবে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি।