দেশের পুঁজিবাজারে এক অস্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেসব কোম্পানি অনেক ভালো অর্থাৎ, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে আছে, সেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম না বেড়ে বরং যেসব কোম্পানি খারাপ অর্থাৎ, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে আছে, সেগুলোর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার লেনদেনের পর সর্বশেষ এক সপ্তাহের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), সেই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সপ্তাহ শেষে দাম বৃদ্ধির তালিকায় থাকা ১০টি কোম্পানির মধ্যে আটটিই ‘জেড’ ক্যাটাগরির। সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের। ‘জেড’ ক্যাটাগরির এই শেয়ারের দাম এক সপ্তাহেই ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
দাম বৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে একই ক্যাটাগরির তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড। এই কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ৩ নম্বরে আছে জিবিবি পাওয়ার লিমিটেড। এই কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এছাড়া, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেডের দাম ২৫ শতাংশ, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের দাম ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের দাম ২০ শতাংশ এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেডের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। তালিকায় থাকা অন্য ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
দাম বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষ ১০ শেয়ারের মধ্যে কেবল দুটি ভালো অর্থাৎ, ‘এ’ ক্যাটাগরির। এর মধ্যে প্রাইম ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ চরচাকে বলেন, “আসলে এগুলো লো ক্যাপ (স্বল্প পুঁজির) কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলো নিয়ে গ্যাম্বলিং বা জুয়া খেলা হয়। এরা প্রকৃত বিনিয়োগকারী না। আমাদের শেয়ারবাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর চেয়ে জুয়াড়ির সংখ্যা বেশি। বাজার বড় না হলে এই সংকট কাটানো কঠিন হবে। বিএসইসির ভূমিকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে এমন ট্রেন্ড চলতে থাকলে সংস্থাটি কোন ধরনের উদ্যোগ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।”
জুয়াড়িরা শেয়ারবাজারে কীভাবে জুয়া খেলে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রুপ খোলে। সেখানে হাজার হাজার লোক থাকে। সেখানে একজন ঘোষণা করে যে, ‘অমুক শেয়ারের দাম এক সপ্তাহে অনেক বেড়ে যাবে।’ এই ঘোষণার পর কিছু বিনিয়োগকারী তখন সেই কোম্পানির শেয়ার কিনতে শুরু করে। এতেই দাম বেড়ে যায়।”
এসব বিনিয়োগকারী তাদের কথা শোনে কেন, জানতে চাইলে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “এরা তো এসব বিনিয়োগকারীকে ধোঁকা দেয়। এরা মাঝে মাঝে এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে, যেটা পরে সত্য হয়ে যায়। এটা দেখিয়ে তারা নিজেদেরকে মার্কেট সম্পর্কে অনেক জানে- এমন ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারপর একদিন একটা কোম্পানির দাম বাড়ার কথা বলে, তখন বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং সেটি কিনে ফেলে। তারপর ধরা খায়।”
‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারের দরপতন
ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দর পতনের বা টপ লুজারের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায় একদম বিপরীত চিত্র। এখানে স্থান করে নিয়েছে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো। সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি দর হারিয়ে শীর্ষ লুজারে পরিণত হয়েছে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড। কোম্পানিটির দাম কমেছে ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।
তবে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম কমার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সম্প্রতি এস আলম গ্রুপের যে ১১টি কোম্পানির কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে এই কোম্পানিটিও রয়েছে। তবে অন্য কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমার পেছনে তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
এছাড়া, ‘এ’ ক্যাটাগরির তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সি-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের দাম কমেছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পোশাক ও ওষুধ খাতের ভালো কোম্পানিগুলোও দরপতন এড়াতে পারেনি। অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেডের দাম ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ, ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেডের দাম ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং আর্গন ডেনিম লিমিটেডের দাম ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে। এর পাশাপাশি ‘জেড’ ক্যাটাগরির এসবিএসি ব্যাংক লিমিটেড দাম কমেছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। প্রযুক্তি ও প্রসাধন খাতের টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের দাম কমেছে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জি কিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের দাম কমেছে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
‘বি’ ক্যাটাগরির ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের দাম কমেছে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ‘এ’ ক্যাটাগরির ফাইন ফুডস লিমিটেডের দাম ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, দাম কমার তালিকায় ১০টি কোম্পানির মধ্যে সাতটি ‘এ’ ক্যাটাগরির, একটি ‘বি’ ক্যাটাগরির ও দুটি ‘জেড’ ক্যাটাগরির।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম চরচাকে বলেন, “আমরা এসব কোম্পানির কার্যক্রম প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি। শুধু আমরাই না, আরও কয়েকটি সংস্থা এই কাজ করছে। তারপরও যদি কিছু চোখে পড়ে, সেটা আমরা নিবিড়ভাবে তদন্ত করি।”
খারাপ কোম্পানির শেয়ারগুলোর দাম কীভাবে বাড়ানো হচ্ছে, এ নিয়ে কিছু করা হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অবশ্যই। ইতোমধ্যেই বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। কেন এসব কোম্পানির (শেয়ারের) দাম বাড়ছে, এটা কি মার্কেটের স্বাভাবিক গতি, নাকি অন্য কিছু কাজ করছে, তা নিয়ে তদন্ত করা হবে।”
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবস্থা
‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক আচরণের পরিপন্থী। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু চক্র ও তাদের কারসাজির কারণে মৌলিকভাবে দুর্বল ও উৎপাদনে না থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার দ্রুত কেনাবেচা হচ্ছে, যার ফলে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয়ে দাম বাড়ছে।
অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা বা ভালো শেয়ারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার কারণে ভালো মানের কোম্পানিগুলো নিয়মিত দাম হারাচ্ছে। এতে করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবারো ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আব্দুল্লাহ নোমান একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। তিনি চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের শেয়ারবাজার অনেক ছোট। আর আমাদের অনেকে শেয়ারবাজার বিষয়ে জানে না। তারা মূলত লোকসানের মুখে পড়ে। তবে যারা শেয়ারবাজার বিষয়ে কিছুটা হলেও জ্ঞান রাখে, তারা এসব স্ক্যামে পা দেবে না।”
তার নিজের শেয়ারের কী অবস্থা জানতে চাইলে নোমান বলেন, “আমি কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনে ফেলে রেখেছি। আশা করি, আমি লোকসানে পড়ব না। কারণ, আমি যেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছি, সেগুলো ভালো কোম্পানি। এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম আজ হোক বা কাল হোক, বাড়বেই।”
তবে সবার অবস্থা একরকম নয়। অনেক বিনিয়োগকারী আছেন, যারা শেয়ারবাজার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। এমন একজন বিনিয়োগকারী হলেন মোতালেব হোসেন। তিনি চরচাকে বলেন, “আমার এক বড় ভাইয়ের কথা শুনে আমি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন আমি প্রায় ৭ লাখ টাকা লোকসানে আছি। অর্থাৎ, ৫ বছর আগে আমি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন আমি শেয়ার বিক্রি করতে গেলে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পাব। আমি আর কাউকে শেয়ারবাজারে আসতে পরামর্শ দেব না।”
কোন ক্যাটাগরিতে কী বোঝায়?
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মূলত বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে তাদের পারফরম্যান্স, নিয়মিত এজিএম করা, ডিভিডেন্ড দেওয়ার ইতিহাস এবং কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে মূলত পাঁচটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়।
প্রথমটি হলো ‘এ’ ক্যাটাগরি। যেসব কোম্পানি নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করে এবং সর্বশেষ বছরে ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, সেগুলো এই ক্যাটাগরিতে স্থান পায়। এই ধরনের কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি সাধারণত বেশ শক্তিশালী থাকে।
দ্বিতীয়টি হলো ‘বি’ ক্যাটাগরি। যেসব কোম্পানি নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করে ঠিকই, তবে সর্বশেষ বছরে ১০ শতাংশের কম কিন্তু শূন্য শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিয়েছে, সেগুলোকে এই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়।
তৃতীয়টি হলো ‘এন’ ক্যাটাগরি। শেয়ারবাজারে সদ্য তালিকাভুক্ত হওয়া নতুন কোম্পানিগুলোকে শুরুতে এই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়। বাজারে আসার পর প্রথম বছর বা প্রথম লভ্যাংশ ঘোষণার আগ পর্যন্ত শেয়ারগুলো এই ক্যাটাগরিতেই থাকে। পরে তাদের পারফরম্যান্স অনুযায়ী ‘এ’, ‘বি’ অথবা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়।
চতুর্থ ক্যাটাগরি হলো ‘জেড’ ক্যাটাগরি। নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা না করা, প্রতি বছর লভ্যাংশ দিতে না পারা, দীর্ঘদিন উৎপাদন বা ব্যবসা বন্ধ থাকা, কিংবা নেতিবাচক রিটার্ন থাকা দুর্বল কোম্পানিগুলো এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভূক্ত থাকে। এই ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ, ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলো হলো পঁচা বা খারাপ ক্যাটাগরির।
পঞ্চমটি হলো ‘জি’ ক্যাটাগরি। মূলত সরকারি বন্ড, ট্রেজারি বন্ড কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি সিকিউরিটিজ লেনদেনের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ ক্যাটাগরি ব্যবহার করা হয়।