২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন! এই সময়ে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ২০২১ সালে ৯৩.৫৮ শতাংশ। তবে ওই বছর কোভিডের কারণে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কোভিডের ওই বছর বাদ দিলে স্বাভাবিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ২০১৪ সালে ৯১.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, এক যুগের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৯.০৯ শতাংশ। আর পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৫.১৯ শতাংশ।
শুধু পাসের হারই নয়, একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে অর্ধেকের বেশি। ২০২২ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬-এ। অর্থাৎ, জিপিএ-৫ পাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
তবে সামগ্রিক ফলাফলের চেয়েও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষায়। দাখিলে পাসের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫৮.২০ শতাংশ।
২০২৬ সালে দাখিল পরীক্ষায় মোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন। প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে দাখিলে পাসের হার ছিল ৮২.২২ শতাংশ। অর্থাৎ, চার বছরের ব্যবধানে পতন ২৬.৭৩ শতাংশ পয়েন্ট।
কারিগরি শিক্ষায় পতন আরও বেশি চোখে পড়ার মতো। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৯.৫৫ শতাংশ। এরপর থেকেই পাসের হার কমেছে। তবে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এ হার ৮০ শতাংশের ওপরেই ছিল। ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে যায় ৭৩.৬৩ শতাংশে। আর এবার ২০২৬ সালে গড় পাসের হার নেমে গেছে ৬০ শতাংশের নিচে! অর্থাৎ, চার বছরের ব্যবধানে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার কমেছে ৩১.৩৫ শতাংশ।
এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।
কেউ পাস করেনি ৩১২ প্রতিষ্ঠানে
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন। অর্থাৎ, মোট শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানের ২৫৫টিই এই দুই ধারার, যা মোট শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮২ শতাংশ।
এ ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চিত্রটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ৮৬টি মাদরাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৪০টি!
এবারের এসএসসি ফলাফলের এমন চিত্রের বিষয়ে শিক্ষা গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান চরচাকে বলেন, “নিম্নমূখী ফলাফলের এই ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি নির্দিষ্ট বছর ফলাফল খারাপ হলে প্রশ্নপত্র, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা সাময়িক কোনো সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক পতন হলে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।”
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, “একে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে সেটি শুধু পরীক্ষার্থীর ব্যর্থতা হতে পারে না।”
ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন আমাদের প্রশ্ন করতে হবে–এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিলেন কি না, নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও একাডেমিক তদারকি কতটা কার্যকর ছিল এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা কী ধরনের নজরদারি করেছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলের প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গড় পাসের হার দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার পুরো চিত্র বোঝা যায় না। ৩১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস না করা এবং অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পাসের হার থাকা দেখাচ্ছে–প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের ব্যবধান বড় হতে পারে।
বিশেষ করে ২২৬টি মাদ্রাসা ও ২৯টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা বলছে, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পদ্ধতি, শিক্ষক উপস্থিতি, একাডেমিক পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এখন প্রয়োজন শূন্য-পাস প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা তথ্য বিশ্লেষণ করা। সেখানে কতজন পরীক্ষার্থী ছিল, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কত, কতটি পদ শূন্য, গত তিন বছরে ফলাফল কী ছিল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি হয়েছে কি না–এসব তথ্য একসঙ্গে দেখতে হবে।”
কারিগরি শিক্ষার করুণ দশা নিয়ে এই গবেষক বলেন, “কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়; শিক্ষার্থীকে শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেওয়াই এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।”
কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তি হওয়া উচিত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ওয়ার্কশপ, যন্ত্রপাতি, ইনস্ট্রাকটর এবং নিয়মিত হাতে-কলমে শিক্ষা না থাকলে ‘কারিগরি শিক্ষা’ কাগজে কারিগরি হলেও বাস্তবে তা পরীক্ষানির্ভর সাধারণ শিক্ষার মতো হয়ে যেতে পারে। এ কারণে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে শুধু পাসের হার নয়, শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী দক্ষতা অর্জন করছে–সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।
ইংরেজি আর গণিতে ভয় পেয়েছে শক্ত ভিত্তি
এবারের এসএসসি ফলাফলে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক দুর্বলতার চিত্রও সামনে এসেছে। ইংরেজিতে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার ৬৬.৬৪ থেকে ৮১.২৯ শতাংশের মধ্যে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সাতটিতেই ইংরেজিতে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে।
গণিতেও বোর্ডভেদে পাসের হার ৬৯.৬১ থেকে ৮৩.৩৪ শতাংশের মধ্যে। এই তথ্য শুধু এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির দুর্বলতা নয়, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক দক্ষতার প্রশ্নও সামনে আনে বলে মনে করেন শিক্ষা গবেষকরা।
এ ক্ষেত্রে ড. মোস্তাফিজ চরচাকে বলেন, “ইংরেজি ও গণিতে কম পাসের হার দেখেই ‘শিক্ষক দুর্বল’, ‘পাঠ্যক্রম ব্যর্থ’ বা ‘শিক্ষার্থীরা শিখছে না’–এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। প্রশ্নপত্রের কঠিনতার মাত্রা, সিলেবাসের সঙ্গে প্রশ্নের সামঞ্জস্য, মূল্যায়নের ধরন এবং আগের বছরের তুলনামূলক তথ্যও বিশ্লেষণ করতে হবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে একটি মানুষের সামর্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না। শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হলে অবিভাবক ও শিক্ষকদের উচিত তার পাশে বসা। তার কথা শোনা। তাকে আশাবাদী করে তোলা তাদের দ্বায়িত্ব।
তারা মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা ও পুনঃপ্রস্তুতির ব্যবস্থা করতে হবে। সমাজকেও তাদের ‘ব্যর্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অকৃতকার্য? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শিক্ষার্থীকে নয়; রাষ্ট্রকে, বিদ্যালয়কে, শিক্ষককে, পরিবারকে এবং সমাজের সুবিধাভোগী প্রতিটি নাগরিককেই দিতে হবে।