
গাজায় বাড়ছে লাশের সারি, শান্তি কোথায়
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে ১০ মাস আগে। কিন্তু গাজায় এখনো শেষ হয়নি মৃত্যুর হিসাব। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে, এখনো চলছে দাফন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সাম্প্রতিক সমীকরণে হরমুজ প্রণালি এখন আর শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়। এটি পরিণত হয়েছে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্রে। ইরান এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ছাড় আদায় করতে চাইছে। লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্রকে আবার জুনের সেই সমঝোতার টেবিলে ফিরিয়ে আনা, যে সমঝোতা সইয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্টিভ এরলাঙ্গার এক বিশ্লেষণে বলেছেন, তেহরান এখনই হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নিতে রাজি নয়। কারণ ইরানের কাছে এটি এমন একটি কৌশলগত সুবিধা, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা যায়। প্রণালিটি দীর্ঘ সময় সীমিত বা কার্যত বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ কমে যায়, বাড়ে জ্বালানির দাম। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর, যাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশই এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
তেহরান এই বাস্তবতাকে খুব হিসাব করেই কাজে লাগাচ্ছে। ইরানের যুক্তি হলো, তারা যদি আগে হরমুজ খুলে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমে যাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো সংকটের একটি সাময়িক সমাধান দেখিয়ে সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু ইরানের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নিশ্চয়তাগুলো বাস্তবায়িত হবে না। তাই হরমুজকে ইরান শুধু চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে নয়, মার্কিন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি ‘কমিটমেন্ট মেকানিজম’ হিসেবেও ব্যবহার করছে।
ইরানবিষয়ক অর্থনৈতিক কূটনীতি বিশ্লেষক এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিজের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য এখানেই। তার মতে, তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র আগে তার প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলো বাস্তবে নিশ্চিত করুক। তারপর হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে শিথিল হবে। কারণ ইরানের আশঙ্কা, হরমুজ খুলে দেওয়ার পর ট্রাম্প যদি চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই সরে যান, তাহলে তেহরানের হাতে আর কার্যকর চাপ প্রয়োগের মতো বড় কোনো কার্ড থাকবে না।
এই কৌশলকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ওয়ায়েজ আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়, হরমুজ এখন ট্রাম্পের মাথার ওপর ঝুলে থাকা ‘ডেমোক্লিসের তরবারি’। ইরান তার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত সম্পদটি আগে ছাড়তে চায় না। বরং সেই সম্পদ ধরে রেখেই আগাম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়।
এখানে ইরানের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা সরাসরি নতুন কোনো সর্বোচ্চ মাত্রার দাবি দিয়ে আলোচনাকে অসম্ভব করে তুলতে চাইছে না। বরং জুনের ১৭ তারিখে যে ১৪ দফা সমঝোতা হয়েছিল, সেটিকেই আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবি ছাড়া ইরানের বর্তমান শর্তগুলোর প্রায় সবই ওই সমঝোতার মধ্যে ছিল। কিন্তু চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে এবং ট্রাম্প নিজেই সেটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করেন।
এখন তেহরানের বক্তব্য—নতুন করে শূন্য থেকে আলোচনা শুরু করার প্রয়োজন নেই। আগের সমঝোতায় ফিরে আসাই হতে পারে সমাধানের পথ।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার কয়েকটি শর্ত প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে— মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো বা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা ও সরাসরি হুমকি বন্ধ করা।
এই দাবিগুলোর মধ্যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নতুন হলেও অন্য অধিকাংশ শর্ত জুনের সমঝোতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে ক্ষতিপূরণের দাবি আসলে একটি অতিরিক্ত দরকষাকষির হাতিয়ার বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তেহরান চাইছে, আলোচনায় এমন একটি প্রাথমিক অবস্থান তৈরি করতে, যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত ছাড় আদায় করা সহজ হবে।
অন্যদিকে, ইরান ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজে জাহাজ চলাচলের কারিগরি কাঠামো নিয়েও আলোচনা করছে। সম্ভাব্য নৌপথ, চলাচলের নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কাজ এগিয়েছে। কিন্তু এখানেও তেহরান একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—কারিগরি সমঝোতা আর হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া এক বিষয় নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই অবস্থান জানিয়েছেন। তার মতে, ওমানের সঙ্গে কারিগরি চুক্তি হলেও হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি খুলবে কি না, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মৌলিক শর্তগুলো কতটা পূরণ করছে তার ওপর। অর্থাৎ, নৌপথ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে ইরান বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে আলাদা করছে না।

এই জায়গাটিই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিষয়টি আসলে হরমুজের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, ইরানের অর্থনীতি, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং সর্বোপরি পারমাণবিক কর্মসূচি। ফলে একটি জলপথকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বৃহত্তর নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমীকরণ জড়িয়ে গেছে।
তবে তেহরানের ভেতরেও এ নিয়ে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। চ্যাটাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের নীতিনির্ধারণী মহলে মূলত দুটি প্রবণতা রয়েছে। একদল মনে করে, যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য কূটনৈতিক সমঝোতা জরুরি। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা মনে করেন, কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। তাদের কাছে অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দরকষাকষির শক্তিশালী কার্ডটি হাতে রাখা।
তেহরান একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রশাসনের একাংশ কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে, অন্য অংশ সামরিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে। এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে ট্রাম্পের অবস্থানও পুরোপুরি স্থির নয়। ইরানের কাছে এটিই একটি বড় সুযোগ। কারণ ওয়াশিংটন যত বেশি বিভক্ত থাকবে, তেহরানের দরকষাকষির সুযোগ তত বাড়বে।
ট্রাম্প অবশ্য মনে করছেন, সময়ের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি তেহরানকে আপস করতে বাধ্য করবে। তিনি আপাতত বড় কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপের হুমকি না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। কিন্তু ইরানও জানে, সময় তার বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে। তাই তারা এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে নিজেদের সবচেয়ে বড় চাপের অস্ত্রটি আগেভাগেই হাতছাড়া হয়ে যায়।

এখানেই দুই দেশের কৌশলের মৌলিক পার্থক্য। ট্রাম্পের হিসাব হলো অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত ইরানকে নরম করবে। ইরানের হিসাব হলো হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে এবং ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফিরতে হবে।
তবে এর মধ্যে বড় ঝুঁকিও আছে। হরমুজ দীর্ঘ সময় অচল থাকলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে ইরানের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। ফলে তেহরান এমন একটি ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বিপর্যস্ত হবে না।
এই কারণেই ওমানের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি পর্যায়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে ইরান একদিকে তার কৌশলগত চাপ ধরে রাখতে পারবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর সম্পূর্ণ অস্থিরতার দায়ও নিতে হবে না। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। সেটি নির্ভর করবে ওয়াশিংটন কতটা বাস্তব নিশ্চয়তা দিতে পারে তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত পুরো সংকটটি গিয়ে ঠেকছে আস্থার প্রশ্নে। ইরান বিশ্বাস করে না যে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিলে তা অবশ্যই পালন করবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের বড় অংশ মনে করে, ইরান কৌশলগত সুবিধা পেলেই আবার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যেই হরমুজ হয়ে উঠেছে দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দু।
তাই ইরানের বর্তমান কৌশলকে শুধু ‘হরমুজ বন্ধ রাখা’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। তেহরান আসলে হরমুজকে একটি রাজনৈতিক জামানত হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের বার্তা স্পষ্ট—আগে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, তারপর ছাড়।
জুনের সমঝোতা তাই এই সংকটের সম্ভাব্য চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। যদি ওয়াশিংটন ও তেহরান সেই সমঝোতার কাঠামোয় ফিরে যেতে পারে, তবে হরমুজ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে এই জলপথ আরও দীর্ঘ সময় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী তাই এখন শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়। এটি ইরানের হাতে থাকা একটি কৌশলগত ‘কার্ড’—যার মূল্য শুধু তেলের বাজারে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতার টেবিলেও। তেহরান সেই কার্ডটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাতে রাখতে চাইছে। আর ওয়াশিংটনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সামরিক চাপ বাড়িয়ে সেই কার্ড ভাঙার চেষ্টা করবে, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সেটি টেবিলেই নিষ্ক্রিয় করবে।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে ১০ মাস আগে। কিন্তু গাজায় এখনো শেষ হয়নি মৃত্যুর হিসাব। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে, এখনো চলছে দাফন।

জুনে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের নির্বাহী আদেশ বাতিল করে। যদিও তার প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব অবৈধ অভিবাসন এবং জন্ম পর্যটনকে উৎসাহিত করে।

দেশের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেই জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসতে চাইছে সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের বেসরকারিকরণে তড়িঘড়ি করে নীতিমালা তৈরির এ উদ্যোগ নিয়ে

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিল ১১ দলীয় জোট, এর পেছনে উদ্দেশ্য কী? আর কারও নাম বিবেচনায় ছিল তাদের?