গত জুনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। সে সময় ওই আদেশ ‘বার্থ ট্যুরিজমের’ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে অভিযোগ করেছিলেন এক বিচারক।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি ৬-৩ ভোটে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করা হয়েছিল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ওই সময় বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো বলেন, এই রায়ের ফলে যেসব নারী শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এখানে আসেন, তাদের সন্তানেরাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী হবে।
এরপর গত বৃহস্পতিবার জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) পাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে দুটি নতুন নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নতুন আদেশ অনুযায়ী, কথিত ‘সন্ত্রাসী’, নাগরিকত্ব ‘কেনার’ উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ব্যক্তিদের সন্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে জন্ম নেওয়া কিছু শিশুকেও এই সুবিধার বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারিকে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলতে শুধু সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে গর্ভবতী নারীদের দেশটিতে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রথাকে বোঝানো হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের নতুন আদেশের এই অংশটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাদের মতে, এতে এমন একটি শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাদের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি করেছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে গবেষণাকারী ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক আমান্ডা ফ্রস্ট বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়ার কারণেই এসব শিশু নাগরিক। তাদের বাবা-মায়ের বেআইনি কর্মকাণ্ড তাদের নাগরিকত্বের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।”
রক্ষণশীল অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প বহু বছর ধরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান কঠোর করার হুমকি দিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
সেখানে বলা হয়েছিল, অস্থায়ী ভিসাধারী বা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসীদের সন্তানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। তবে চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ট্রাম্পের ওই উদ্যোগ সংবিধানের নাগরিকত্ব ধারার পরিপন্থি এবং তাই তা আইনসম্মত নয়।
বার্থ ট্যুরিজম ঠেকাতে নতুন নির্বাহী আদেশ
বার্থ ট্যুরিজম সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন একটি নির্বাহী আদেশে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো শিশুর বাবা-মায়ের একজন যদি ‘নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকেন, তাহলে ওই শিশুকে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিতে।
দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশে বার্থ ট্যুরিজমের সন্দেহ রয়েছে—এমন বিদেশিদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
বর্তমানে ফেডারেল বিধিমালায় নবজাতকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে অস্থায়ী ভিসা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প আবারও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “মানুষ বার্থ ট্যুরিজমকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে তুলছে।” তিনি আরও দাবি করেন, হাজার হাজার মানুষ অন্যায়ভাবে এর সুবিধা নিচ্ছে।
তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে এর চেয়ে অনেক কম সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অনুমান করেছেন, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার শিশু বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে।
বার্থ ট্যুরিজমের পাশাপাশি ট্রাম্পের নতুন নির্দেশনায় স্বয়ংক্রিয় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ঐতিহাসিক কিছু ব্যতিক্রমও সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ব্যতিক্রমের মধ্যে রাষ্ট্রদূতসহ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সন্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখলকারী শত্রু দেশের সেনাদের সন্তান অন্তর্ভুক্ত।
নতুন আদেশে বিদেশি সরকারের কর্মী এবং বিদেশি সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদেরও এই ব্যতিক্রমের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ
এই ব্যতিক্রমগুলোর কিছু সম্প্রসারণ আদালত অনুমোদন করতে পারে কি না, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফ্রস্ট বলেন, কূটনীতিকদের শ্রেণি সম্প্রসারণ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বৈধ হতে পারে। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতা থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সুরক্ষা দিতে হবে।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে বিচার বিভাগে কাজ করা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের আইন অধ্যাপক জন ইউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বিদেশি শত্রু বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্বাহী আদেশের প্রচেষ্টা ‘শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে’।
তবে অন্যরা মনে করেন, কিছু সম্প্রসারণ সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক স্যাম এরম্যান বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানি অভিবাসীদের বিদেশি শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রশাসনের এই নিয়ম অনুযায়ী, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্বও প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।”
বিভিন্ন বিধানের বৈধতা নির্ভর করতে পারে সরকারি সংস্থাগুলো সেগুলো কীভাবে কার্যকর করে তার ওপরও। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ হিরোশি মোটোমুরা বলেন, ‘বিদেশি শত্রু’ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ‘উদ্দেশ্যর’ মতো কিছু শব্দের সংজ্ঞা বেশ নমনীয়।
এর ফলে ‘বিবেচনার বিশাল ক্ষেত্র’ তৈরি হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাদের সন্দেহের ভিত্তিতে অথবা আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখিয়ে ভিসা বা দেশে প্রবেশের অনুমতি প্রত্যাখ্যানের সুযোগ দিতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়
জুনে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের নির্বাহী আদেশ বাতিল করে। যদিও তার প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব অবৈধ অভিবাসন এবং বার্থ ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছিলেন, “১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা এই অধিকার দেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক স্বাধীন ব্যক্তির জন্য নিশ্চিত করেছিলেন। আজও আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।”
ভিন্নমত পোষণ করে আলিটো অবশ্য কঠোর ভাষায় আপত্তি জানান। তিনি লিখেছিলেন, “আমার বিবেচনায় আদালত এমন একটি ভুল করেছে, যা দেশের ভবিষ্যতে গুরুতর প্রভাব ফেলবে। এমনকি অল্প সময়ের জন্য এখানে থাকা কোনো মায়ের সন্তানও ১৪তম সংশোধনীর অধীনে নাগরিক।”
আলিটোর মতে, এর ফলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হযতে পারে। তিনি বলেন, যেসব বিদেশি বৈধভাবে অভিবাসন করতে চায়, তাদের অনেক সময় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অথচ বার্থ ট্যুরিস্টদের সন্তান এখানে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা নতুন নির্বাহী আদেশগুলোর পক্ষে সাফাই দেন।
হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ বলেন, এখানে এমন কিছুই নেই, যা এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কোনো রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন আইন অধ্যাপক র্যাচেল রোজেনব্লুম বলেন, আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাহী আদেশে যুক্ত করা নতুন ব্যতিক্রমগুলো টিকে থাকলে তিনি অবাক হবেন। তার ভাষায়, এগুলো ‘স্পষ্টতই অসাংবিধানিক’।