মার্কিন রাজনীতিতে নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসে, রাজনৈতিক সমীকরণ ততই জটিল হয়ে উঠছে। শেষ মুহূর্তের কোনো ঘটনা, কোনো প্রার্থীর বিতর্কিত বক্তব্য কিংবা কোনো অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তন মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে নির্বাচনের হিসাব।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং এবার নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মিশিগানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের প্রাইমারি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর কংগ্রেসের দুই কক্ষ-সেনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস—কার দখলে যাবে, সেই লড়াইয়ের চিত্র কিছুটা পরিষ্কার হলেও একই সঙ্গে নতুন সংকটও তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা। সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশের বিচারে এটি তাদের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ভালো ফল করার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির এই সুবিধা সব অঙ্গরাজ্যে সমানভাবে কাজ করে না। মার্কিন নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থী, আঞ্চলিক জনমত এবং ভোটারদের নিজস্ব পছন্দ অনেক সময় জাতীয় প্রবণতাকেও ছাপিয়ে যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এখন সেই স্থানীয় সমীকরণই ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মিশিগান। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে প্রগতিশীল নেতা ডা. আবদুল আল-সায়েদের জয় দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূলধারা তার বিরুদ্ধে হ্যালি স্টিভেনসকে এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দলীয় এস্টাবলিশমেন্টের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। আল-সায়েদের জয় প্রমাণ করেছে, ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থী ও প্রগতিশীল অংশ এখন আর দলের প্রান্তিক শক্তি নয়; তারা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসনে নিজেদের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার মতো শক্তি অর্জন করেছে।
তবে এখানেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা। মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে আল-সায়েদ সাধারণ নির্বাচনে কতটা গ্রহণযোগ্য হবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তার সমর্থকেরা মনে করছেন, তিনি দলের মূল ভোটারদের আরও বেশি উৎসাহিত করে ভোটকেন্দ্রে আনতে পারবেন। একজন উদ্দীপনাময় প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রচলিত মধ্যপন্থী প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোটারকে সক্রিয় করতে পারেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা তার অতীতের বিতর্কিত বক্তব্য, বামপন্থী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইসরায়েল-সংক্রান্ত অবস্থানকে প্রচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। এর ফলে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থী ও কিছু বিশেষ ভোটারগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কঠিন হিসাবকে আরও কঠিন করেছে। রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে হবে ডেমোক্র্যাটদের। কিন্তু সেই আসনগুলোর কয়েকটি এমন রাজ্যে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। ফলে মিশিগান বা পেনসিলভানিয়ার মতো তুলনামূলক সম্ভাবনাময় কোনো আসনে সমস্যা তৈরি হলে ডেমোক্র্যাটদের আরও গভীরভাবে রিপাবলিকান ঘাঁটিতে ঢুকতে হবে। বাস্তবে সেটি অত্যন্ত কঠিন কাজ।
তবু ডেমোক্র্যাটদের জন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। আলাস্কা, আইওয়া, ওহাইও এবং টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে। কানসাসেও ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী পেয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাউথ ডাকোটা, আইওয়া ও নেব্রাস্কার মতো রাজ্যে দলীয় প্রার্থীর বদলে নির্দলীয় প্রার্থীদের সমর্থন করার কৌশল নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার—যেখানে সরাসরি ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জয় কঠিন, সেখানে একজন জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সামনে রেখে রিপাবলিকানদের আসন ঝুঁকিতে ফেলা।
তবে এই কৌশলের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, নির্দলীয় প্রার্থীরা জরিপে যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ভোটের মাঠে অনেক সময় ততটা ভালো করতে পারেন না। তারপরও ডেমোক্র্যাটদের জন্য এসব রাজ্যে রিপাবলিকানদের চাপে রাখা রাজনৈতিকভাবে জরুরি। কারণ প্রতিপক্ষকে তার নিরাপদ আসন নিয়েও প্রচারে অর্থ ও শক্তি ব্যয় করতে বাধ্য করা নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে রিপাবলিকানদের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক। দলীয় আইনপ্রণেতাদের একের পর এক ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি রিপাবলিকান নেতৃত্বকে বিব্রত করছে। ম্যাক্স মিলার, কোরি মিলস ও চাক এডওয়ার্ডসকে ঘিরে বিতর্ক ইতিমধ্যে তাদের নিজ নিজ আসনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এডওয়ার্ডস নৈতিকতা-সংক্রান্ত তদন্তের পর পুনর্নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে মিলার ও মিলসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যদিও তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত নয়। এসব ঘটনা রিপাবলিকানদের পুরো হাউস কৌশলকেই দুর্বল করে দিতে পারে। দলটি বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে নিজেদের আসন যতটা সম্ভব নিরাপদ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো আসনের প্রার্থী যদি ব্যক্তিগত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেই আসনের কাঠামোগত সুবিধাও অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে রিপাবলিকানদের জন্য একসময় নিরাপদ বলে বিবেচিত আসনগুলোও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৬ সালের নির্বাচনের তুলনাও সামনে আসছে। তখন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন অত্যন্ত অজনপ্রিয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক যুদ্ধ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একাধিক কেলেঙ্কারি দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। একই সঙ্গে সাধারণ কংগ্রেসনাল ভোটের জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে ছিল। ২০২৬ সালের পরিস্থিতিতেও এর বেশ কিছু মিল দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বিতর্ক এবং ডেমোক্র্যাটদের জাতীয় পর্যায়ের ভোট-সমর্থন—সব মিলিয়ে ২০০৬ সালের স্মৃতি ফিরে আসছে।
তবে ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। ডেমোক্র্যাটদের সামনে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও প্রার্থী বাছাইয়ের ঝুঁকি। রিপাবলিকানদেরও ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি, নির্বাচনী সীমানা এবং দলীয় সংগঠনের সুবিধা রয়েছে। ফলে এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন যে সিনেট বা হাউস কার দখলে যাবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকান লড়াই নয়। এটি দুই দলের ভেতরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি পরীক্ষা। ডেমোক্র্যাটরা কি মধ্যপন্থা ও প্রগতিশীলতার দ্বন্দ্ব সামলে একটি কার্যকর নির্বাচনী জোট গড়তে পারবে? রিপাবলিকানরা কি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ও ট্রাম্প-নির্ভর রাজনীতির চাপ সামলে হাউসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে? নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন করে আঁকবে।