দেশের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেই জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে আসতে চাইছে সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের বেসরকারিকরণে তড়িঘড়ি করে নীতিমালা তৈরির এ উদ্যোগ নিয়ে সংশয় ও উদ্বেগ বাড়ছে খাতটির বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাদের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার জারি করা এক চিঠিতে বিপিসিকে ১০ আগস্টের মধ্যে এ সম্পর্কিত খসড়া জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। মাত্র চার দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কৌশলগত পণ্যের বিষয়ে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ কোনো অবস্থাতেই বাস্তবসম্মত নয় বলেও মনে করছেন তারা।
এদিকে নির্দেশনা থাকলেও বিপিসি এখনো এ নীতিমালা তৈরির জন্য কোনো কমিটি গঠন করেনি। বিপিসি থেকে জানা গেছে, কমিটির প্রধান কে হবেন, তাও ঠিক হয়নি। বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিটি গঠিত হওয়ার পর তারা আমদানির পরিমাণ বা মজুতকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে।
এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (অপারেশনস) সামসুল আহসান চরচাকে বলেন, “গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বিপিসি-তে এসেছে। সরকারের জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, নীতিমালা তৈরির কাজ করবে বিপিসি।” বিষয়টি নিয়ে তাড়াহুড়া করা হচ্ছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
মাত্র চারদিন আগে নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান নিয়োগ, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিনে নামিয়ে আনা এবং আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত–এই তিনটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটায় জ্বালানি বিশ্লেষক ও সরকারের বিরোধীপক্ষরা একে বাঁকা চোখে দেখছেন।
জ্বালানি তেল ও বর্তমান বাস্তবতা
অনেকের ধারণা, দেশে জ্বালানি তেলের ওপর বিপিসির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে আছে। বাস্তবে তা পুরোপুরি সত্য নয় বা আংশিক সত্য। বাস্তবতা হচ্ছে, অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েলের বেশির ভাগই বিপিসি সরাসরি জি-টু-জি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) চুক্তির মাধ্যমে আমদানি করে। এসব তেল আনা হয় থাইল্যান্ডের ওকিউটি, আমিরাতের ইএনওসি, চীনের পেট্রোচায়না-ইউনিপেক, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি, ভারতের আইওসিএল-এর মতো ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এর পর ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তা পরিশোধনের পর ও পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে সারাদেশের ভোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
অন্যদিকে, দেশের পেট্রোল ও অকটেনের সিংহভাগ এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে। গত অর্থবছরে দেশের পেট্রোল চাহিদার মাত্র ১৬ শতাংশ এসেছে রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে। বাকি ৮৪ শতাংশের জোগান এসেছে চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে। চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল (টিকে গ্রুপ), পারটেক্স পেট্রো, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি ও বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি–যারা কনডেনসেট ও ন্যাপথা পরিশোধন করে পেট্র্রোল-অকটেন উৎপাদন করে। তারপর বিপিসি তা কিনে নেয় ও বাজারে বিতরণ করে।
একইভাবে স্বতন্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (আইপিপি) দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব ব্যবস্থায় ফার্নেস অয়েল আমদানি করে আসছে। ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতের দখলে রয়েছে অন্য জ্বালানি এলপিজির বাজার।
এখন ডিজেল, অকটেন, পেট্রোলের মতো আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরাসরি আমদানি, মজুত ও খুচরা বিপণনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে নতুন নীতিমালা তৈরি করছে সরকার, যা এখন পর্যন্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি। এখানেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে। কারও কারও এই বিষয়ে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তবে সরকার যে জ্বালানি খাত পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতে এই পথে হাঁটছে, সে বিষয়ে মোটাদাগে একমত পোষণ করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “সরকার এই খাতে চুরি ঠেকাতে পারে না, অযৌক্তিক অন্যায় ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে কারণে সরকার বেসরকারি খাতে দিয়ে অত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এটা তো সরকারের ফেইলিওর; সরকার তো এখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।”
এ ধরনের উদ্যোগকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “সরকারের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে এটা সরকারের কনস্টিটিউশনাল (সাংবিধানিক) অবলিগেশন (দায়বদ্ধতা)। সে পলিসি করে তার অবলিগেশন ঝেড়ে ফেলে দেবে–এটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা।”
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন। চরচাকে তিনি বলেন, “জ্বালানি খাতের পরিধি এখন এত বড় হয়ে গেছে যে, সরকার এটি আর নিজেরা ম্যানেজ বা পরিচালনা করতে পারছে না। এই ব্যবস্থাপনার ভার বইতে পারছে না বলেই সরকার এখন এর একটি অংশ বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
এই অধ্যাপকের পর্যবেক্ষণ–এই নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, এ খাত নিয়ে ‘সরকারের অসুবিধা হচ্ছে–এটি ক্লিয়ার’।
তবে নতুন সরকার যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে এ খাতকে সুশৃঙ্খল করতে চায়, তাতে সরাসরি বাধা দেওয়াটা ঠিক হবে না বা তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন বুয়েটের এই অধ্যাপক। একইসঙ্গে অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সাবধান করে বলেন, “যেখানে সরকার বর্তমান বাজারই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, সেখানে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পর তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।”
আর অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “রেগুলেটরি বডিগুলো (যেমন–বিইআরসি) বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল এবং তারা জনস্বার্থের বদলে ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর। এই ভঙ্গুর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়া আত্মঘাতী হবে।” একে তিনি তুলনা করেন, ‘বিষ খেয়ে পরীক্ষা করার’ সঙ্গে।
সরকারের জ্বালানি বিভাগ থেকে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিতে এই উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করা হলেও অধ্যাপক আলম মনে করেন, “এটি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র।”
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশও যদি সে পথে হাঁটে, তাতে অসুবিধার কিছু নাই। তবে তাড়াহুড়া করলে সমুহ বিপদের মুখে পড়তে হবে। এ ছাড়া সরকার-ঘোষিত এই পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা জনগণের জানার অধিকার আছে।”
একইসঙ্গে বর্তমান অকার্যকর রেগুলেটরি ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ আছে বিশেষজ্ঞওদর। তাদের মতে, বেসরকারি খাতকে ভালো করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে তবেই এই পথে হাঁটা উচিত
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কী?
বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেলের বাজার ছাড়ার ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে বিশেষজ্ঞদের। ওই দুই দেশের জ্বালানি তেল খাত বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র–দুই দেশই ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা ও বাজারে সিন্ডিকেট ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে, পরিকল্পিতভাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে যেমন একাধিক শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র প্রতিযোগী রয়েছে, তেমনি ভারতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ ধরে রেখে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখছে। আবার দুই দেশেই প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বাজারে অনিয়মের তদন্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে বড় অঙ্কের জরিমানা করতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নজিরও রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একদিকে পুঁজি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে পর্যাপ্তসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রতিযোগী তৈরি হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভবিষ্যতে বিপিসি বাজারের কতটা অংশ ধরে রাখবে, তারও স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের এফটিসি বা ভারতের সিসিআই-এর মতো স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থারও স্পষ্ট কাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিশ্চিত না করে জ্বালানি তেল খাতে প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের সুযোগ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো বিপত্তির জন্ম দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানি খাত বিশ্লেষকরা।