ads

ট্রাম্প হরমুজ দখল করতে পারবেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্প হরমুজ দখল করতে পারবেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন সামরিক অভিযানে অবতীর্ণ হয়েছে, যা মূলত পূর্ববর্তী অঘোষিত যুদ্ধেরই একটি ধারাবাহিকতা। এই নতুন পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। তবে এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ঠিক কতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার মাসেরও বেশি সময় আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রথম ধাপে মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, যুদ্ধজাহাজ এবং নৌ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে উৎখাত করা। এই যৌথ অভিযানের সাফল্য মিশ্র প্রকৃতির ছিল। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নিহত হলেও, তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন নেতৃত্ব পূর্বের তুলনায় আরও বেশি কট্টর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলেও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।

Advertisement

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া প্রায় ৯০ দিনের একটি অনিয়মিত যুদ্ধবিরতির পর এই আপেক্ষিক শান্তিপ্রক্রিয়ার অবসান ঘটে এবং যুদ্ধটি দ্বিতীয় দফায় প্রবেশ করে। এই দ্বিতীয় রাউন্ডের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হলেও এর সার্বিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম পর্বের যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র আক্রমণ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ইরানের নৌ সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন যেকোনো মূল্যে এই প্রণালির ওপর থেকে ইরানের দখল শিথিল করতে মরিয়া।

এই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে ট্যাংকার জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপকূলীয় রাডার, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ইরানের ছোট আকৃতির আক্রমণাত্মক বোটগুলোর ওপর বিমান হামলার নির্দেশ দেন। এরপর একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি দিয়ে চলতি সপ্তাহে টানা তিন দিন ধরে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করা হয়, যার প্রথম দিনেই ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এই ব্যাপক আক্রমণের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ঘোষণা করেন যে, ইরান ব্যতীত বিশ্বের সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা হয়েছে। তিনি ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে মিথ্যাবাদী, হিংস্র ও ক্ষতিকারক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন যে, এই নেতৃত্ব ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই জলসীমায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য কোনো স্থল বা নৌ অভিযান পরিচালনা করবেন কিনা। যুদ্ধের প্রথম ধাপে তিনি মার্কিন মেরিন সেনাদের এই দ্বীপটি দখলের নির্দেশ দেওয়ার কথা ভাবলেও, অতিরিক্ত মার্কিন সেনা হতাহতের আশঙ্কায় সেই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে খার্গ দ্বীপে যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী পদক্ষেপগুলোর চেয়ে অনেক বড় আকারের উস্কানি ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে সেনা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে। সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশাল সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী, ২০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক ও নজরদারি বিমান অন্তর্ভুক্ত। মার্কিন সামরিক মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি থেকে ৭০০ মাইলেরও বেশি দূরে উত্তর-পূর্ব ইরানের একটি রেলওয়ে সেতুতে মার্কিন হামলা চালানো হয়েছে, যা মূলত ইরানের সামরিক লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার অংশ, যাতে তারা বিতর্কিত যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছাতে না পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানকে এই স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়াতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে তারা সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত হয় এমন স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। ইরান যদি এই জলপথ উন্মুক্ত না করে, তবে মার্কিন নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ শ্বাসরোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের।

কিন্তু এই সামরিক কৌশলের বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হলেও তাদের একটি বড় অসম সামরিক সুবিধা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি অচল করার জন্য ইরানকে প্রতিটি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তারা কেবল কয়েকটি জাহাজে আঘাত হেনে এবং নিয়মিত হুমকি সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যেই ওমান উপকূলের কাছে ও প্রণালির দক্ষিণ অংশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এবং একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। এই ধরনের ঘটনা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী এই সংকটে সময় হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করছে, কারণ মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়ে ইরান তাদের অবরুদ্ধ তেল ট্যাংকারগুলো খালাস করতে পারলেও, নতুন করে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে তাদের তেল রপ্তানি আবারও স্থবির হয়ে পড়বে এবং রাজস্বের উৎস শুকিয়ে যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত মূল ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ের ওপর। ইরানের নতুন কট্টরপন্থী নেতৃত্ব তাদের দেশের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও কতদিন টিকে থাকতে পারে, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও এর ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ কতদিন সহ্য করতে পারেন, তার ওপরই এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিণতি নির্ভর করছে।

সম্পর্কিত