ads

দুর্যোগে পরীক্ষা: যৌক্তিক দাবির আন্দোলন অযৌক্তিকতার দিকে যাচ্ছে কি?

দুর্যোগে পরীক্ষা: যৌক্তিক দাবির আন্দোলন অযৌক্তিকতার দিকে যাচ্ছে কি?
বিগত বছরের তুলনায় প্রশ্ন অনেক বেশি কঠিন হওয়ার বিষয়টিও তুলেছেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। বিশেষ করে যখন তাদের নিরাপত্তা, পরীক্ষার মান বা মূল্যায়নের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অসংবেদনশীল মন্তব্য–এসবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ স্বাভাবিক।

Advertisement

প্রশ্ন হচ্ছে, সেই যৌক্তিক প্রতিবাদ যখন ধীরে ধীরে ‘অটোপাস চাই’, ‘সহজ প্রশ্ন না হলে পরীক্ষা দেব না’, ‘কঠোর গার্ড চলবে না’ কিংবা সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়, তখন আন্দোলন কি তার নৈতিক শক্তি হারাতে শুরু করে?

সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যা ঘটছে, তা শুধু একটি পরীক্ষা নিয়ে ক্ষোভের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, আন্দোলনের সংস্কৃতি এবং প্রত্যাশার পরিবর্তিত মানসিকতারও একটি প্রতিচ্ছবি।

যেভাবে শুরু

আন্দোলনের সূচনা মূলত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে। সেদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ বন্যাকবলিত কয়েকটি জেলার চিত্র। কোমরসমান পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ছবি ও ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কোথাও দেখা যায়, এক শিক্ষার্থী ভিজে যাওয়া এড়াতে প্যান্ট খুলে মাথায় নিয়ে হাফপ্যান্ট পরে কেন্দ্রে যাচ্ছেন।

আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, পানির নিচে থাকা গর্তে পড়ে গিয়ে এক পরীক্ষার্থী পুরোপুরি ভিজে গেছে। অনেক অভিভাবককে দেখা গেছে সন্তানকে কাঁধে করে কেন্দ্রে পৌঁছে দিতেও।

এসব দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

প্রশ্ন ওঠে, যখন অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতেই জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, তখন পরীক্ষা কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়া হলো না কেন?

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সাধারণ নেটিজেন, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

অনেকেই লেখেন, ‘পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার্থীর জীবন কি তার চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ?’ আবার কেউ মন্তব্য করেন, ‘যে পরীক্ষায় পৌঁছাতেই যুদ্ধ করতে হয়, সেই পরীক্ষায় সমতা কোথায়?’

এই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও ছড়িয়ে পড়ে।

একসময় নকলবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে ‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামে পরিচিত শিক্ষামন্ত্রীকে এবার অনেকেই ‘ওয়াটার মিলন’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেন।

‘হেলিকপ্টার মিলন’ নামটির পেছনেও একটি ইতিহাস রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি সরকারের আগের মেয়াদে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে তিনি হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করে নকল দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। সে সময় তার এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। ফলে নতুন করে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, তিনি আবারও শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন।

কিন্তু এবারের সিদ্ধান্তের পর সেই পুরোনো পরিচিতিই উল্টো ব্যঙ্গের উপাদান হয়ে ওঠে। ফেসবুক, এক্সসহ (সাবেক টুইটার) বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘হেলিকপ্টার মিলনের’ বদলে ‘ওয়াটার মিলন’ নামটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, “উনি যখন আবার শিক্ষামন্ত্রী হলেন, আমি ‘হেলিকপ্টার মিলন’ জিন্দাবাদ লিখে পোস্ট দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম শিক্ষাব্যবস্থায় আবার পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত না করা খুবই কেয়ারলেস সিদ্ধান্ত। উনি মানুষটা হয়তো একই আছেন, কিন্তু সময় বদলেছে, বয়স হয়েছে। তাই আগের সুনাম বেচে এখনও শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ারে বসে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এই বাস্তবতা উনাকেও মানতে হবে।”

আরেকজন লিখেছেন, “হেলিকপ্টারে নকল ধরেছিলেন, এবার অন্তত নৌকায় করে পরীক্ষার্থীদের দেখতে যেতেন।”

এমন শত শত পোস্টে শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ ও ‘সংবেদনশীলতার অভাব’ বলে মন্তব্য করা হয়।

এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর একটি কথিত অডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করা হয়। অডিওটির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেটি আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। অনেক শিক্ষার্থী এটিকে ‘অপমানজনক’ উল্লেখ করে তাকে (শিক্ষামন্ত্রী) প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে দুটি ভুল ধরা পড়ার পর। প্রশ্ন প্রণয়নের মতো মৌলিক একটি বিষয়ে এমন ভুলকে শিক্ষা প্রশাসনের বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন অনেকেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, ‘দুর্যোগে বেরিয়ে এলো আসল গলদ।’

এভাবেই দুর্যোগে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ ধাপে ধাপে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, ভাইরাল অডিও এবং প্রশ্নপত্রের ভুল–সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় পরিসর পেরিয়ে যায়। রূপ নেয় মাঠের আন্দোলনে।

গত মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকাসহ কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নুজিয়া হাসিন রাশা চরচাকে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীর এমন জঘন্য বক্তব্যের প্রতিবাদে যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর ‘যারা পড়াশোনা করে, তারা পরীক্ষা দিতে পারবে’–এই বক্তব্যকে সামনে আনা সেই পুরোনো ছাত্রলীগীয় কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। যাদের পানিতে ডুবে, দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হলো যে, তারা কোনো ‘ফার্মের মুরগি’ নয়, তাদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছে এই রাষ্ট্রই। এটি সরকারের সীমাবদ্ধ ও শ্রেণিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।”

একইসঙ্গে বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষামন্ত্রীর নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি জানান বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর এই নেতা।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

দুর্যোগের মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং প্রশ্নপত্রে ভুলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে সরকারও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়।

১৪ জুলাই সকালে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে বিভিন্ন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে তারা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থান নেয়। সন্ধ্যার দিকে পুলিশ তাদের সড়ক ছেড়ে দিতে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করলেও কয়েক ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা আবার সেখানে জড়ো হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়। রাত ১০টার দিকে তারা দাবিনামা ও পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে কর্মসূচি শেষ করে।

এদিকে, আন্দোলনের মধ্যেই জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হয়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস, জেলা প্রশাসন এবং মাঠ প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতেই পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।”

শিক্ষামন্ত্রীর দাবি, সারা দেশের প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার কারণে সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, যেসব কেন্দ্রে বা যেসব ক্ষেত্রে বাস্তব কারণে পরীক্ষা গ্রহণে সমস্যা হয়েছে, প্রয়োজন হলে সেখানে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়েও সংসদে ব্যাখ্যা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনের কাজ প্রায় দুই বছর আগে শুরু হয়েছিল। ফলে এবারের প্রশ্নপত্র আগের সময়ের মডারেশন প্রক্রিয়ার আওতায় প্রস্তুত হয়েছে। তবে এ কারণে সরকার দায় এড়িয়ে যাচ্ছে না। প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা প্রশ্নগুলোর জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পুনঃপরীক্ষাও নেওয়া হবে।

এদিকে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্য নিয়েও সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, তার ব্যক্তিগত ওই মন্তব্যে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। কাউকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্যটি করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যদি কেউ আহত হয়ে থাকে, সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।”

সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত প্রধান অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং প্রশ্নপত্রের ভুল, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর প্রদান, প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা এবং বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে সংকট নিরসনের উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে।

এরপরও কেন আন্দোলন?

সরকার প্রশ্নপত্রে ভুলের জন্য পূর্ণ নম্বর, প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন থামেনি। গতকাল বুধবার সকালে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা প্রথমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নেন। পরে সেখান থেকে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় আগের দাবিগুলোর পাশাপাশি নতুন কয়েকটি দাবিও সামনে আনেন তারা। যেমন–

  • অটোপাস দিতে হবে
  • প্রশ্ন আরও সহজ করতে হবে
  • পরীক্ষার হলে কঠোর গার্ড রাখা যাবে না
  • শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হবে

শাহবাগে সমাবেশে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, শুধু দুঃখপ্রকাশে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের ভাষায়, “ক্ষমা চাইলেই হবে না। এটা জুতা দিয়ে গরু দানের মতো ব্যাপার।”

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের কারণে লাখো পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তার পদত্যাগ ছাড়া এই সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে না।

আন্দোলনে থাকা হামিম নামে এক শিক্ষার্থী বলেছেন, “মন্ত্রী বলেছেন–যারা ভুল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তারা পূর্ণ নম্বর পাবেন, আর যারা উত্তর করেননি, তাদের কী হবে? এভাবে আসলে একটা পরীক্ষা হতে পারে না। আমরা তার পদত্যাগ চাই।”

জিহাদ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের দাবি এখন একটাই। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। যে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে অবহেলা করছে, তাকে পদত্যাগ করতে হবে।”

বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আন্দোলনকারীরা সরকারকে রাত ১০টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করার আল্টিমেটাম দেন।

আন্দোলনকারীদের ঘোষণা অনুযায়ী, দাবি আদায় না হলে আজ বৃহস্পতিবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি পালন করা হবে। তারা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রা করে সেখানে অবস্থান নেওয়া হবে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

আন্দোলন চলতে থাকা কতটা যৌক্তিক

দুর্যোগে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা যৌক্তিক হতে পারে। প্রশ্নপত্রে ভুল থাকলে তার দায় কর্তৃপক্ষকে নিতেই হবে। কোনো মন্ত্রীর বক্তব্য শিক্ষার্থীদের আহত করলে তার ব্যাখ্যা বা ক্ষমা চাওয়াও প্রত্যাশিত।

কিন্তু যখন সরকার পরীক্ষা প্রয়োজনে আবার নেওয়ার ঘোষণা দেয়, ভুল প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় এবং মন্ত্রীও দুঃখ প্রকাশ করেন, তখনও যদি আন্দোলনের মূল দাবি ‘অটোপাস’, ‘সহজ প্রশ্ন’ বা ‘কঠোর গার্ড প্রত্যাহার’-এ গিয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে–আন্দোলনের লক্ষ্য কি সমস্যার সমাধান, নাকি পরীক্ষার মানদণ্ডই বদলে দেওয়া?

শিক্ষাবিদদের মতে, মূল্যায়নব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা জরুরি, কিন্তু পরীক্ষার মান কমিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানিয়েছিলেন, আন্দোলনের দাবির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সমর্থনের একটি অংশে পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে ‘অটোপাস’, ‘পরীক্ষার হলে কঠোর গার্ড না রাখা’ এবং ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের’ মতো নতুন দাবিগুলোকে অনেকেই অযৌক্তিক বা অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করছেন।

ফেসবুকে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যৌক্তিক দাবি পর্যন্ত পাশে ছিলাম। এখন আর নেই। ঘরে ফিরে যাও। পড়াশোনা করো।”

আরেকজন লিখেছেন, “সরকার প্রশ্নের ভুলের দায় স্বীকার করেছে, পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষার কথাও বলেছে। এখন আন্দোলনের লক্ষ্য যেন বারবার বদলে যাচ্ছে।”

‘অটোপাস’ মানসিকতার ছায়া?

করোনাকালে বিশেষ পরিস্থিতিতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটোপাস বা বিকল্প মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একটি পরীক্ষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিকল্প মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত আসে।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, আগের এসব সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ধারণা জন্মেছে–সংগঠিত আন্দোলন করলে পরীক্ষা স্থগিত বা মূল্যায়নের নিয়ম বদলে দেওয়া সম্ভব। ফলে যেকোনো সংকটেই অটোপাসের দাবি দ্রুত সামনে চলে আসছে।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরি চরচাকে বলেন, “প্রথমত, দুর্যোগে পরীক্ষা নেওয়ার আগে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করা উচিত। সব জেলায় একই পরিস্থিতি না থাকলে অঞ্চলভিত্তিক সিদ্ধান্তও বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্রে ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন প্রণয়ন ও যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা দরকার।”

শিক্ষার্থীদের বাকি দাবিগুলোর প্রসঙ্গে এই শিক্ষাবিদ বলেন, “তৃতীয়ত, আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও তার লক্ষ্য হতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন; পরীক্ষার মান কমানো নয়। চতুর্থত, অটোপাস বা অতিরিক্ত শিথিল মূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতি করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।”

আন্দোলনের সংস্কৃতি কি বদলাচ্ছে?

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, অনেক আন্দোলন যৌক্তিক দাবি দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেখানে এমন কিছু দাবি যুক্ত হয়, যা মূল ইস্যুকে আড়াল করে ফেলে।

এর ফলে দুটি সমস্যা তৈরি হয়। একদিকে, সরকার প্রকৃত অভিযোগগুলোকেও গুরুত্বহীন বলে উপস্থাপনের সুযোগ পায়। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও কমে যায়।

এইচএসসি পরীক্ষার আন্দোলনেও একই প্রশ্ন উঠছে–যেখানে নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্রের মান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সেখানে অটোপাস বা সহজ প্রশ্নের দাবিগুলো কি আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে?

সরকারেরও দায় আছে

তবে সব দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকা, প্রশ্নপত্রে ভুল, এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিতর্কিত মন্তব্য–এসবই পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে। অর্থাৎ, সংকটের সূচনা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকেই হয়েছে।

একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাও। দুর্যোগে পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, ভুল প্রশ্নের প্রতিবাদ করা কিংবা জবাবদিহি দাবি করা–এসব দাবি গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক।

কিন্তু সেই আন্দোলন যদি ধীরে ধীরে অটোপাস, সহজ প্রশ্ন কিংবা কঠোর গার্ড প্রত্যাহারের দাবিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তা শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

এখন প্রয়োজন দুই পক্ষেরই আত্মসমালোচনা। সরকারের উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সংবেদনশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া। আর শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে, আন্দোলনের শক্তি তার নৈতিক অবস্থানে। যৌক্তিক দাবি যত স্পষ্ট থাকবে, আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে। কিন্তু অযৌক্তিক দাবি সামনে চলে এলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই যৌক্তিক দাবিগুলোই, যেগুলোর জন্য আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।

সম্পর্কিত