ads

আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড

ম্যারাডোনার ইতিহাস জড়ানো ম্যাচে মেসির শুরু…শেষও?

রাজ শুভ নারায়ন চৌধুরী
রাজ শুভ নারায়ন চৌধুরী
ম্যারাডোনার ইতিহাস জড়ানো ম্যাচে মেসির শুরু…শেষও?
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানেই ম্যারাডোনা, ওদিকে মেসি প্রথম মুখোমুখি হচ্ছেন ইংল্যান্ডের। ছবি: এক্স

ছিয়াশির কোয়ার্টার ফাইনালের কথা বারবার এসেছে। আসারই কথা। আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে মুখোমুখি হচ্ছে, সেটাও আবার নকআউট পর্বে, আর সেখানে ডিয়েগো ম্যারাডোনার নন্দিত-নিন্দিত দুই কাণ্ডের স্মৃতিমাখা ম্যাচের কথা আসবে না!

আর বাকি সবার কথা বাদই দিন, ইংলিশ মিডিয়া এ নিয়ে চুপ থাকার কোনো কারণই নেই! নিতান্তই ম্যারাডোনা বেঁচে নেই বলে তার গোল অব দ্য সেঞ্চুরির কথাও ইংলিশ মিডিয়ায় সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। না হলে সেটি ফুটনোটই হয়ে থাকত, আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির হ্যান্ড অব গড কেন ও কীভাবে ফুটবলের চেতনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, এ নিয়ে ইংলিশ মিডিয়ায় হাজারো শব্দ হয়তো খরচ হতো। পিটার শিলটনও হয়তো আরেকবার ম্যারাডোনা নামেই তার বিতৃষ্ণার কথা সগর্বে জানিয়ে দিতেন। ম্যারাডোনা জীবিত থাকার সময়ে যেমন দিতেন।

Advertisement

মরে গিয়ে লোকটা বেঁচে গেলেন!

অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, ম্যারাডোনার নাম বারেবারে ফিরে ফিরে আসছে যে ম্যাচে, সে ম্যাচই কিনা ম্যারাডোনার সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি লিওনেল মেসির ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম সাক্ষাৎ! মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার পর যে একবার আর্জেন্টিনা খেলেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, ২০০৫ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, সে প্রীতি ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার কারণে ছিলেন না মেসি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির প্রথম ম্যাচই কি বিশ্বকাপে–হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতেও–তার শেষ ম্যাচ হয়ে যাবে?

আর্জেন্টিনা অতি অবশ্যই তা চায় না। প্রসঙ্গ যখন মেসি আর টুর্নামেন্টটা যখন বিশ্বকাপ, শিরোপামঞ্চ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই মেসির বিদায়মঞ্চ হিসেবে মানতে চায় না আর্জেন্টিনা। কিন্তু চাইলেই তো হবে না, তেমন খেলতেও তো হবে! আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা বলছে, তারা রক্ষণে এতটাই দুর্বল, পাল্টা আক্রমণে এতটাই বেদিশা যে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই মেসির বিদায় দেখার সম্ভাবনা একেবারে কম নয়।

ইংল্যান্ডও যে একেবারে প্রতিপক্ষকে ডানে-বামে উড়িয়ে দিয়ে সেমিফাইনালে এসেছে, এমন নয়। আর্জেন্টিনার মতোই, দাপটের নিক্তিতে দেখলে ধুঁকতে ধুঁকতে আর উত্তেজনার লেন্সে দেখলে রোমাঞ্চ ছড়িয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। তবে হ্যারি কেইনের পাশাপাশি জুড বেলিংহামের পারফরম্যান্স, দুজনের সমন্বয়, দুজনের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনতে যেভাবে দলটাকে খেলাচ্ছেন কোচ টমাস টুখেল… তাতে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে পাওয়া দুঃখের জবাব মেসির আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে ইংলিশরা।

আর্জেন্টিনা একাদশ তো একাদশ, খেলার ছকই বদলে ফেলবে কি না; টুখেলের ট্যাকটিকস কী হবে; মেসিকে কীভাবে আটকাবে ইংল্যান্ড; ওদিকে ইংল্যান্ডের নাম্বার টেন বেলিংহাম আরেকবার নকআউট ম্যাচে ঝলক দেখাবেন কি না… বিস্তর আলোচনা হচ্ছে ম্যাচের আগে।

তবে এসব ট্যাকটিকসের খসড়ার পাশাপাশি এ ম্যাচে না চাইলেও যা চলে আসবে, তা ম্যাচটাকে ঘিরে থাকা ইতিহাস। ফকল্যান্ড যুদ্ধ ঘিরে বিজয়ী ইংল্যান্ডের গর্ব আর বিজিত আর্জেন্টিনার জ্বালা তো আছেই। ফুটবলেও ইতিহাস কম নয় এবং সেটা ম্যারাডোনাকে দিয়েই শেষ নয়, শুরুও ম্যারাডোনাকে দিয়ে নয়।

১৯৬৬-তে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ‘জানোয়ার’ বলা এবং নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে জার্সি বদল করতে নিষেধ করে দেওয়ার পর থেকেই যে ‘শত্রুতা’র শুরু, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের এর পরের প্রতিটি ম্যাচে তার শুধু পারদ চড়েছে।

৮২-তে ফকল্যান্ডের (আর্জেন্টাইনদের কাছে যা আইলাস মালভিনাস) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭৪ দিনের যুদ্ধ এবং এর চার বছর পরই ম্যারাডোনার কাণ্ডকীর্তি সে পারদের মাত্রা এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে বটে। তবে ১৯৯৮-তে শেষ ষোলোতে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড ও ইংল্যান্ডের হার, কিংবা ২০০২-এ বেকহামেরই গোলে আর্জেন্টিনার হার–যা শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্বেই আর্জেন্টিনাকে বাড়ির রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে… বিতর্ক এ ম্যাচের ‘বাই-প্রোডাক্ট!’

সেমিফাইনালে আজ দুই দলের সাক্ষাতের আগে দুই দলের কোচই বিতর্ক আর ইতিহাসকে এক পাশে রেখে এটিকে শুধুই আরেকটা ম্যাচ–খুব গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচ–বলেছেন বটে। তবে ম্যাচে কোনো একটা বিতর্ক কিংবা একটা কড়া ট্যাকলই যে এই ‘সুবোধে’র পালিয়ে যাওয়ার কারণ হবে না, যুদ্ধংদেহী মনোভাব যে সেই জায়গাটা নিয়ে নেবে না, তা কে বলতে পারে!

তা যদি হয়, ধরে নেবেন, ম্যারাডোনা স্বর্গেও ছুটোছুটি করছেন উত্তেজনায়!

ধরে নেবেন, আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে ইতিহাস কখনো পেছনের পাতায় থাকার ব্যাপার নয়।

সম্পর্কিত