ads

ইলেকট্রনিক বাস নাকি সড়কে শৃঙ্খলা, কোনটা আগে দরকার?

ইলেকট্রনিক বাস নাকি সড়কে শৃঙ্খলা, কোনটা আগে দরকার?
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

“হচ্ছে হবে ডট কম কয়া লাভ নাই। ২৬ বছর ধইরা এই লাইনে। ইঞ্জিন বদলাইলে লাভ কী হইব? অক্ষনো ঢাকা শহরে বাস স্টপ একখানে আর বাস থামে একখানে।” কথাগুলো বলছিলেন মিরপুর-যাত্রাবাড়ি রুটের বাসচালক (আপাতত বেকার) শেখ রহমত আলী। ঢাকায় চার শ ইলেকট্রনিক বাস নামানোর প্রসঙ্গে এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার ভাষ্য–সড়কে শৃঙ্খলা না এনে শুধু গণপরিবহনের ধরন বদলালেই কাজ হবে না।

ঢাকায় ‘চার শ ইলেকট্রনিক বাস’ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে রাজধানীবাসীর মধ্যে নানা আলোচনা আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন সড়কের শৃঙ্খলা নিয়ে।

Advertisement

ফেরা যাক শেখ রহমত আলীর কাছে। ভারতের চেন্নাই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে চরচাকে তিনি বলেন, “১৫ বছর আগে চেন্নাই শহরে গিয়া দেখছি হেরা যাত্রীগরে ২ টাকার টিকিটও দেয় একখান মেশিন (ইলেকট্রনিক টিকেটিং মেশিন) দিয়া। যাত্রী-মালিক কেউ ঠকে না। সুন্দর কইরা আইসা জায়গামতো বাস দাঁড়ায়, যাত্রী ওঠে-নামে। আবার আমাগো মেট্রোরেলের মতো কয় মিনিট পর বাস আইবো সেইটাও মোবাইলে জানা যায়। কই হেগো বাসতো হাইফাই না। এক্কেরে সাধারণ বাস। আর আমগো! অফিস টাইমে বাস আর যাত্রীগো পারাপারি দ্যাখছেন? সিস্টেম এইডা রাইখা কারেন্টের বাস আনলে কী লাভ অইব? আইজকা হইব, কাইলকা বদলাইব কয়া লাভ নাই। হুনতাছি আগে বাস আইব, হেরপর সিস্টেম বদলাইব! এই ইলেকটিক (ইলকট্রনিক) বাসের গল্পো তো হুইনা আইতাছি তাপসের সময় থিকা।”

একই ধরনের কথা বললেন মিরপুর ডেন্টাল কলেজের ছাত্র শিবলী সালাম। নিয়মিত বাসে যাতায়াত করেন তিনি। তার মতে, “সড়কের ব্যবস্থাপনা যদি এমন থাকে, তাহলে চকচকে ওই বাসগুলোর ছালবাকল উঠতে ৭ দিন সময় লাগবে।”

তিন বছর আগে ২০২৩ সালের ৯ মে নগর ভবনে বাস রুট র‌্যাশনালইজেশনের সভা শেষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামকে পাশে নিয়ে এক বছরের মধ্যে ১০০ ইলেকট্রনিক বাস নামানোর ঘোষণা দেন তখনকার ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ফজলে নূর তাপস।

২০২৪ সালের আগস্টে নগরভবন ছেড়ে গায়েব হয়ে যাওয়ার আগের দুই বছরেও সেই এক শ বাসের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (মেট্রো আরটিসি) সভায় ২২টি রুটে তিন হাজারের বেশি এসি ও নন-এসি বাসের জন্য আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কমিটি নন-এসি বাসের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু ১০টি রুটে ৬৯০টি এসি বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়। ছয় মাসের মধ্যে এসব বাস নামানোর সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো বাস নামেনি। বাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কেউ এখনো এসি বাস আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারেনি।

রাজধানী ঢাকা, ইলেকট্রনিক বাস ও প্রকল্প

বাস না নামলেও এখনো আছে ২০২৩ সালে তৈরি করা ‘বৈদ্যুতিক মোটরযান নিবন্ধন ও চলাচল নির্দেশিকা ২০২৩’। ওই নির্দেশিকা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক যানে (ইভি) রূপান্তরের বাধ্য-বাধকতা আরোপ করা হয়। সেই বাধ্যবাধকতা পূরণে এখন উদ্যোগী হয়েছে বিএনপি সরকার।

ঢাকায় ‘চারশ ইলেকট্রনিক বাস’ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ৩৬৫ কোটি টাকা। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা যায়, ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার জন্য তিনটি চার্জিং ডিপো নির্মাণ করা হবে। পূর্বাচলে ডিটিসিএর ১ দশমিক ৩ একর জমিতে একটি ডিপো হবে। এ ছাড়া ঝিলমিল এলাকায় আরেকটি ডিপো এবং কাচপুরে আরও একটি ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিআরটিএর আওতায় ভেহিকেল ইনস্পেকশন সেন্টার (ভিআইসি) নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।

এই প্রকল্পে শুধু বাস কেনাই নয়, ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস), প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের বাজেটেও ই-বাসের আমদানির শুল্ক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। যেমন-২০৩০ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে মোট কর ৩৭% এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে সংযোজনের জন্য কর ১৫.২৫% নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে ই-বাসের মূল চ্যালেঞ্জ যে চার্জিং স্টেশন, তার জন্য বিনিয়োগকারীদের ১০ বছরের আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কার্বন নিঃসরণ কমানো, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ক্লিন এয়ার প্রকল্পের আওতায় যে ইলেকট্রনিক বাসগুলো ঢাকার রাস্তায় নামানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এতে নগরীর মানুষের গণপরিবহনকেন্দ্রীক ভোগান্তি কতটা কমবে বা কতটা স্বস্তি পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের।

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় নজর না দিয়ে কেবল ডিজেল ইঞ্জিনের বাস বদলে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিন বাস নামানোর হাজার কোটি টাকার প্রকল্পকে ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার’ সাথে তুলনা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অবশ্যই বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর মানুষ আধুনিক গণপরিবহন প্রাপ্য; কিন্তু তার আগে তাদের চাই শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি গণপরিবহন কাঠামো। সাধারণ মানুষ ন্যূনতম ভোগান্তি ছাড়া গণপরিবহন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা চান।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব চরচাকে বলেন, “গণমানুষের জন্য সার্বজনীন গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা থাকা দরকার, তা নেই বলেই শৃঙ্খলা ফেরানোর চেয়ে বড় প্রকল্প বেশি পছন্দ নীতিনির্ধারকদের।”

প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

ইকবাল হাবিব বলেন, কেবল ইঞ্জিন বা বাস পরিবর্তন করে লাভ হবে না। বাসের আগে করিডোরভিত্তিক অবকাঠামো (ফুটপাত প্রশস্ত করা, পথচারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি, প্রতি এক কিলোমিটার অন্তর বাস স্টপেজ, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং প্রক্ষালন কেন্দ্রের ব্যবস্থা) উন্নয়ন করা জরুরি। এই স্থপতি বলেন, “পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথোরিটিকে (ডিটিসিএ) সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিতে হবে। এ ছাড়া বর্তমানে বাস মালিকদের কাছে জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেতে এই সংস্থাকে ডিজিটাল সুপারভিশন ও নিয়ন্ত্রণের একক কর্তৃত্ব দেওয়া উচিত।”

ইলেকট্রনিক বাস নামানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক চরচাকে বলেন,‍‍ “উদ্যোগগুলো হতে হবে সমন্বিত। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে মেট্রোরেল, মনোরেল ও বাসের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। পূর্ব ঢাকার বাসাবো-গোড়ান-মাদারটেকের মতো এলাকায় মেট্রোর বাইরে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিআরটি ও সাধারণ বাস সেবা সমানভাবে প্রয়োজন।”

যানজট নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকার সমালোচনা করে এই অধ্যাপক বলেন, “ঢাকার যানজট নিরসনে কখনো কার্যকর টেকসই কৌশল বিবেচনা করা হয়নি।”

বুয়েটের আরেক অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান বলেন, ‍“অতীতে বহু পরিবহন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার কারণ এই খাতের চরম বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা।”

সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্তিকে বিবেচনা না করে নীতি প্রণয়নই ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ না ফেরার পেছনে প্রধান অন্তরায়। বর্তমানে সড়কের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষের ব্যবহার করা ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার)। এর সাথে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত ব্যাটারিচালিত রিকশা। একটি শহর নিয়ে ন্যূনতম পরিকল্পনা থাকলে যখন-তখন সড়ক এভাবে দখল করে নিতে পারে ব্যাটারির রিকশা।

অথচ নীতিনির্ধারকরা সবাই জানেন, একটি বাস প্রায় ২০ থেকে ২২টি প্রাইভেট কারের জায়গা সাশ্রয় করতে পারে। অপরিকল্পিতভাবে পরিবহন নামানোর বদলে রাজধানীসহ সারাদেশের গণপরিহন উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সম্পর্কিত