চরচা ডেস্ক

কাঠের একটি বুকশেলফের সামনে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে স্থায়ী শান্তির জন্য সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেন তিনি। এরপর ক্যামেরার সামনে চুক্তিপত্রটি তুলে ধরেন শেহবাজ শরিফ। দিনটি ছিল ১৭ জুন।
কয়েক সপ্তাহের টানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি হয়েছিল। এটিতে ইসলামাবাদের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।
কিন্তু চার সপ্তাহও না পেরোতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত নিয়ে গত কয়েক দিনে দুইবার ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যস্থতায় হওয়া সেই চুক্তি এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা চালায়। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় ও আরব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, পাকিস্তান, কাতার ও ওমানসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মানছে না বলে মনে করছে ইরান, তাই তারা পাল্টা জবাব দেওয়া চালিয়ে যাবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, এখন পর্যন্ত এসব কূটনৈতিক চেষ্টা সংঘাত থামাতে পারেনি। তবুও পাকিস্তান আলোচনার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
রোববার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, এই সংকটের সমাধানে ‘আলোচনা ও কূটনীতিই একমাত্র কার্যকর পথ’।
শুক্রবার শেহবাজ শরিফ ফোনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অনেক কষ্টে অর্জিত শান্তি এখন ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে শনিবার ইসহাক দার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও কথা বলেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বা কাতারের মতো কোনো মধ্যস্থতাকারী দেশ কি আবারও দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারবে?
মধ্যস্থতাকারীদের ক্ষমতা আসলে কতটুকু?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এপ্রিল মাসে তারা নিজ দেশে আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা একই কক্ষে বসে আলোচনা করেন।
এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকবার তেহরান সফর করেন। মার্চের শেষ দিকে চীনের সমর্থনে একটি শান্তি উদ্যোগ গড়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইসলামাবাদ।
জুনে পাকিস্তানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি এমওইউ সই হয়। পরে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক সম্মেলনেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান চুক্তি করাতে সাহায্য করতে পারলেও তা বাস্তবায়ন করানোর মতো ক্ষমতা তাদের নেই।
তেহরানের সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পারস্য উপসাগর গবেষণা দলের পরিচালক জাভাদ হেইরান-নিয়া আল জাজিরাকে বলেন, এই সমঝোতা মূল বিরোধের সমাধানের জন্য করা হয়নি। তিনি মনে করেন, চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামানো এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল।
এই বিশ্লেষক বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে শুধু চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখে। এই সুবিধা ধরে রাখতে প্রয়োজন হলে যুদ্ধের ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত তেহরান।
হেইরান-নিয়ার মতে, শক্তির ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তন না এলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পক্ষে এই বিরোধের সমাধান করা কঠিন।
দোহার গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা সীমিত হয়ে গেছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় পাকিস্তান। কিন্তু এখন ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
দানিয়া থাফার বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান যতক্ষণ সংঘাত বাড়ানোর পথেই থাকবে, ততক্ষণ পাকিস্তানের পক্ষে পরিস্থিতি শান্ত করা খুব কঠিন। তবে দুই পক্ষ যখন মনে করবে যে আলোচনায় বসার সময় এসেছে, তখন আবার আলোচনা শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে ইসলামাবাদের সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান কামার চিমা মনে করেন, পাকিস্তান এতটা অসহায় নয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
চিমার ভাষ্য, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দুই পক্ষের আস্থা। তাই কোনো জটিলতা তৈরি হলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–উভয় দেশই পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কূটনৈতিক চেষ্টা বাড়লেও সুযোগ কমছে
পাকিস্তান একা এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে না। তবে বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ মেটানো আসলে পাকিস্তানের দায়িত্ব ছিল না। তিনি বলেন, ইরান আগেই এই বিষয়টি পাকিস্তানের মধ্যস্থতার বাইরে রেখেছিল। কারণ, এটি মূলত ইরান ও ওমানের মধ্যকার বিষয়।
তার মতে, ইরান চায়নি এই ইস্যু পাকিস্তানের নেতৃত্বে বড় কোনো আলোচনার অংশ হোক। এতে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নিতে পারত।
পরে ইরান ও ওমান সরাসরি আলোচনা শুরু করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও ওমানের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে সেই আলোচনা তেমন এগোতে পারেনি।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারে সাম্প্রতিক হামলা দেশটির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকেও দুর্বল করতে পারে। যদিও এখনো কাতার আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে ইরানের মনে রাখা উচিত, কাতারের ধৈর্যেরও সীমা আছে।
ইসলামাবাদের পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো এখন কঠিন অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে তারা ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতেও বাধা দিতে পারে না। কারণ তারা জানে, নিজেদের প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়।
এদিকে সমঝোতা স্মারকের অংশ না হলেও ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ইরানের দাবি, এটিও ওই চুক্তির লঙ্ঘন।

শনিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ লেবাননও গাজার মতো হয়ে যেতে পারে। এতে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কে আগে ছাড় দেবে?
আল জাজিরা বলছে, এক সপ্তাহ ধরে হামলা-পাল্টা হামলা চললেও মূল বিরোধ একই জায়গায় রয়ে গেছে। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো– হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং কী শর্তে চলাচল হবে।
ইরানের দাবি, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে নারাজ।
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ চালু করবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা অন্য দেশের জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে এর আগে সমাধানের একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
হেইরান-নিয়ার মতে, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব ছিল, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইরান ও উপসাগরীয় একটি আরব দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করবে। এতে দুই পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারত।
কিন্তু আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই তা থেমে যায়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন দুই পক্ষই আলোচনার বদলে সামরিক শক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
হেইরান-নিয়ার মতে, এখনকার পরিস্থিতি বলছে, হামলা আরও চলতে পারে। তবে এতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে পরিস্থিতি কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
অন্যদিকে দানিয়া থাফারের মতে, এত সংঘাতের পরও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারক থেকে সরে যায়নি। তিনি বলেন, ইরান এই সংঘাতকে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে দেখছে। তাই এখনো আলোচনার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তার মতে, চুক্তি ভাঙার জন্য দুই পক্ষই দায়ী। ইরান যেমন জাহাজে হামলা চালিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করেছে এবং সামরিক হামলাও চালিয়েছে। তবে এসবের পরও কাগজে-কলমে সমঝোতা স্মারকটি এখনো কার্যকর রয়েছে।
থাফারের মতে, এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ ছাড় দেয় তার ওপর। তিনি বলেন, ইরানের হাতে এখনো এমন সক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তারা চাইলে যেকোনো সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তার ভাষ্য, সামরিকভাবে ইরানের এই সক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করা খুব কঠিন। তাই শেষ পর্যন্ত কার অবস্থান শক্তিশালী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে কামার চিমার মতে, এই সংকট কীভাবে শেষ হবে, তা মূলত নির্ভর করবে ইরানের আচরণের ওপর, মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নয়। তিনি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। ফলে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতেও বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতার চেষ্টা চলতেই থাকবে।

কাঠের একটি বুকশেলফের সামনে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে স্থায়ী শান্তির জন্য সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেন তিনি। এরপর ক্যামেরার সামনে চুক্তিপত্রটি তুলে ধরেন শেহবাজ শরিফ। দিনটি ছিল ১৭ জুন।
কয়েক সপ্তাহের টানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি হয়েছিল। এটিতে ইসলামাবাদের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।
কিন্তু চার সপ্তাহও না পেরোতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত নিয়ে গত কয়েক দিনে দুইবার ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যস্থতায় হওয়া সেই চুক্তি এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা চালায়। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় ও আরব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, পাকিস্তান, কাতার ও ওমানসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মানছে না বলে মনে করছে ইরান, তাই তারা পাল্টা জবাব দেওয়া চালিয়ে যাবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, এখন পর্যন্ত এসব কূটনৈতিক চেষ্টা সংঘাত থামাতে পারেনি। তবুও পাকিস্তান আলোচনার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।
রোববার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, এই সংকটের সমাধানে ‘আলোচনা ও কূটনীতিই একমাত্র কার্যকর পথ’।
শুক্রবার শেহবাজ শরিফ ফোনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, অনেক কষ্টে অর্জিত শান্তি এখন ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে শনিবার ইসহাক দার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও কথা বলেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বা কাতারের মতো কোনো মধ্যস্থতাকারী দেশ কি আবারও দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারবে?
মধ্যস্থতাকারীদের ক্ষমতা আসলে কতটুকু?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এপ্রিল মাসে তারা নিজ দেশে আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা একই কক্ষে বসে আলোচনা করেন।
এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকবার তেহরান সফর করেন। মার্চের শেষ দিকে চীনের সমর্থনে একটি শান্তি উদ্যোগ গড়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইসলামাবাদ।
জুনে পাকিস্তানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি এমওইউ সই হয়। পরে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক সম্মেলনেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান চুক্তি করাতে সাহায্য করতে পারলেও তা বাস্তবায়ন করানোর মতো ক্ষমতা তাদের নেই।
তেহরানের সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পারস্য উপসাগর গবেষণা দলের পরিচালক জাভাদ হেইরান-নিয়া আল জাজিরাকে বলেন, এই সমঝোতা মূল বিরোধের সমাধানের জন্য করা হয়নি। তিনি মনে করেন, চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামানো এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল।
এই বিশ্লেষক বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে শুধু চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখে। এই সুবিধা ধরে রাখতে প্রয়োজন হলে যুদ্ধের ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত তেহরান।
হেইরান-নিয়ার মতে, শক্তির ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তন না এলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পক্ষে এই বিরোধের সমাধান করা কঠিন।
দোহার গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা সীমিত হয়ে গেছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় পাকিস্তান। কিন্তু এখন ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
দানিয়া থাফার বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান যতক্ষণ সংঘাত বাড়ানোর পথেই থাকবে, ততক্ষণ পাকিস্তানের পক্ষে পরিস্থিতি শান্ত করা খুব কঠিন। তবে দুই পক্ষ যখন মনে করবে যে আলোচনায় বসার সময় এসেছে, তখন আবার আলোচনা শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে ইসলামাবাদের সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান কামার চিমা মনে করেন, পাকিস্তান এতটা অসহায় নয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
চিমার ভাষ্য, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দুই পক্ষের আস্থা। তাই কোনো জটিলতা তৈরি হলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–উভয় দেশই পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কূটনৈতিক চেষ্টা বাড়লেও সুযোগ কমছে
পাকিস্তান একা এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে না। তবে বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ মেটানো আসলে পাকিস্তানের দায়িত্ব ছিল না। তিনি বলেন, ইরান আগেই এই বিষয়টি পাকিস্তানের মধ্যস্থতার বাইরে রেখেছিল। কারণ, এটি মূলত ইরান ও ওমানের মধ্যকার বিষয়।
তার মতে, ইরান চায়নি এই ইস্যু পাকিস্তানের নেতৃত্বে বড় কোনো আলোচনার অংশ হোক। এতে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নিতে পারত।
পরে ইরান ও ওমান সরাসরি আলোচনা শুরু করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও ওমানের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে সেই আলোচনা তেমন এগোতে পারেনি।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারে সাম্প্রতিক হামলা দেশটির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকেও দুর্বল করতে পারে। যদিও এখনো কাতার আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে ইরানের মনে রাখা উচিত, কাতারের ধৈর্যেরও সীমা আছে।
ইসলামাবাদের পাকিস্তান-চীন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা হায়দার সাইয়েদ বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো এখন কঠিন অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে তারা ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতেও বাধা দিতে পারে না। কারণ তারা জানে, নিজেদের প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়।
এদিকে সমঝোতা স্মারকের অংশ না হলেও ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ইরানের দাবি, এটিও ওই চুক্তির লঙ্ঘন।

শনিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ লেবাননও গাজার মতো হয়ে যেতে পারে। এতে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কে আগে ছাড় দেবে?
আল জাজিরা বলছে, এক সপ্তাহ ধরে হামলা-পাল্টা হামলা চললেও মূল বিরোধ একই জায়গায় রয়ে গেছে। বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো– হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং কী শর্তে চলাচল হবে।
ইরানের দাবি, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে নারাজ।
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ চালু করবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা অন্য দেশের জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে এর আগে সমাধানের একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
হেইরান-নিয়ার মতে, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব ছিল, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ইরান ও উপসাগরীয় একটি আরব দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করবে। এতে দুই পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারত।
কিন্তু আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই তা থেমে যায়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন দুই পক্ষই আলোচনার বদলে সামরিক শক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
হেইরান-নিয়ার মতে, এখনকার পরিস্থিতি বলছে, হামলা আরও চলতে পারে। তবে এতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে পরিস্থিতি কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
অন্যদিকে দানিয়া থাফারের মতে, এত সংঘাতের পরও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারক থেকে সরে যায়নি। তিনি বলেন, ইরান এই সংঘাতকে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে দেখছে। তাই এখনো আলোচনার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তার মতে, চুক্তি ভাঙার জন্য দুই পক্ষই দায়ী। ইরান যেমন জাহাজে হামলা চালিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করেছে এবং সামরিক হামলাও চালিয়েছে। তবে এসবের পরও কাগজে-কলমে সমঝোতা স্মারকটি এখনো কার্যকর রয়েছে।
থাফারের মতে, এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ ছাড় দেয় তার ওপর। তিনি বলেন, ইরানের হাতে এখনো এমন সক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তারা চাইলে যেকোনো সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তার ভাষ্য, সামরিকভাবে ইরানের এই সক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করা খুব কঠিন। তাই শেষ পর্যন্ত কার অবস্থান শক্তিশালী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে কামার চিমার মতে, এই সংকট কীভাবে শেষ হবে, তা মূলত নির্ভর করবে ইরানের আচরণের ওপর, মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নয়। তিনি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। ফলে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতেও বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতার চেষ্টা চলতেই থাকবে।

শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক"

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সাময়িকী দ্য ক্র্যাডল-এ প্রকাশিত প্রখ্যাত বিশ্লেষক মেহমেত আলি গুলারের একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ অনুসারে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ন্যাটো আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের ছয় দফার সংক্ষিপ্ত ঘোষণাটি বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর ফাটল ও তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। সাম