ads

ন্যাটো ৩.০: বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক নতুন সমীকরণ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ন্যাটো ৩.০: বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক নতুন সমীকরণ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সাময়িকী দ্য ক্র্যাডল-এ প্রকাশিত প্রখ্যাত বিশ্লেষক মেহমেত আলি গুলারের একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ অনুসারে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ন্যাটো আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের ছয় দফার সংক্ষিপ্ত ঘোষণাটি বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর ফাটল ও তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এই ঘোষণাটি অন্যতম সংক্ষিপ্ত, যা গত বছরের দ্য হেগ সম্মেলনের পাঁচ দফার ঘোষণার মতোই ছোট। অথচ এর আগে ২০২১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে ৭৯ দফা, ২০২২ সালে মাদ্রিদে ২২ দফা, ২০২৩ সালে ভিলনিয়াসে ৯০ দফা এবং ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন সম্মেলনে ৩৮ দফার দীর্ঘ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

ঘোষণার এই নাটকীয় সংক্ষিপ্তকরণ মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার চলমান গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত উত্তেজনাকে প্রতিফলিত করে। ক্ষেত্রবিশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে ঐকমত্যের পরিধি অত্যন্ত সীমিত হয়ে যাওয়ার কারণেই এই চূড়ান্ত ঘোষণা এতটা সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে। ন্যাটো কি আসলে একটি ‘কাগুজে বাঘ’–এই দীর্ঘদিনের বিতর্কটি কিন্তু সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বরং সাময়িকভাবে এটিকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে মাত্র। চূড়ান্ত ঘোষণায় এই জটিল ফাটলটিকে আড়াল করার জন্য ‘একটি শক্তিশালী ন্যাটোর অধীনে একটি শক্তিশালী ইউরোপ’ নামক একটি চটকদার স্লোগান ব্যবহার করে সাময়িকভাবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

Advertisement

ছয় দফার এই আঙ্কারা ঘোষণার প্রথম অনুচ্ছেদটি ওয়াশিংটন চুক্তির বিখ্যাত ‘আর্টিকেল ৫’ (যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি)-এর প্রতি ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং শেষ অনুচ্ছেদটিতে আয়োজক দেশ তুরস্ককে প্রথাগত ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। তবে বাকি চারটি অনুচ্ছেদের মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে রাশিয়া ও ইরান। এই অনুচ্ছেদগুলোতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য ৭০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল নতুন সহায়তা প্যাকেজের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয় সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ৫০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানকে সংক্ষিপ্তভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ওয়াশিংটন মূলত ন্যাটোকে এমন একটি নতুন কৌশলগত পর্যায়ে খাপ খাইয়ে নিতে চাইছে, যাকে ন্যাটোর তৃতীয় সংস্করণ বা ন্যাটো ৩.০ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে তথাকথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’। এই ডকট্রিনের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যকে সম্পূর্ণ সুসংহত করা, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের মিত্রদের ওপর নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন অংশীদারত্বের মাধ্যমে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ বা ঘেরাও করা।

বাস্তব ক্ষেত্রে এই মার্কিন কৌশলটি তিনটি সুনির্দিষ্ট রূপ ধারণ করছে। প্রথমত, ইউরোপকে তার নিজস্ব নিরাপত্তার প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে, যার মধ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করা অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের অধীনে একটি নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলা বা অর্ডার প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি ইসরায়েলের সাথে সিরিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল বাধা হলো ইরান। তাই ইরানকে আঞ্চলিকভাবে সম্পূর্ণ দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এই কৌশলের অন্যতম প্রধান অংশ। তৃতীয়ত, ন্যাটো তার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান চার অংশীদার অর্থাৎ ‘আইপি৪’ভুক্ত দেশ– জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায়। এই দেশগুলোকে ন্যাটোর সামরিক অস্ত্র সরবরাহ চেইনের সাথে একীভূত করা এবং পর্যায়ক্রমে ন্যাটোর কৌশলগত প্রভাব এশিয়ার গভীরে প্রসারিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

ওয়াশিংটন মূলত এই সামরিকীকরণকে ন্যাটো ৩.০-এর রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে, যার পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। প্রথমটি হলো ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে তাদের মোট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা। এবং দ্বিতীয়টি হলো একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সমন্বিত অস্ত্র উৎপাদন চেইন গড়ে তোলা। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটি গত বছর দ্য হেগ সম্মেলনে শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপটি আঙ্কারা সম্মেলনে এসে আরও গতিশীল হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটি বিশাল আর্থিক তহবিল বা পুলে পরিণত হবে। এই পুলে জাপানের মতো শক্তিশালী ন্যাটো অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর আকার এবং পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা একটি বিশাল বিশ্ববাজার তৈরি করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো এই বিশাল আর্থিক পুলটিকে এমনভাবে বন্টন ও নিয়ন্ত্রণ করা যাতে ন্যাটো ৩.০-এর কৌশলগত কাঠামোটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর পাশাপাশি একটি নতুন অস্ত্র সরবরাহ চেইন নির্মাণের জোরাল প্রচেষ্টা চলছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রের মূল ও সংবেদনশীল উপাদানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখবে, আর বাকি উপ-উপাদান বা সাবকম্পোনেন্টগুলোর উৎপাদন বিভিন্ন মিত্র দেশের মধ্যে বন্টন করে দেবে। এর ফলে মিত্ররা একে অপরের সাথে এবং চূড়ান্তভাবে ওয়াশিংটনের সাথে এক সুতোয় বাঁধা পড়বে। আঙ্কারা ঘোষণায় উল্লিখিত ৫০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিগুলো এই নতুন অর্থনৈতিক মডেলের প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ন্যাটো ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি, যা সিউলকে ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা সংগ্রহ বাজারে সরাসরি প্রবেশের অনুমতি দেয়।

তুরস্কের রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান সরকারের জন্য এই সম্প্রসারিত সামরিক বাজারের একটি বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এখন প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঙ্কারা এটিকে তাদের নিজস্ব দেশীয় প্রতিরক্ষা খাতের জন্য, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘আসেলসান’ এবং বেসরকারি ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাইকার’-এর জন্য একটি বিশাল বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। এই পরিবর্তনের ফলেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ন্যাটোর অফিশিয়াল বা মূল কর্মসূচির মধ্যে ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ন্যাটোর সম্মেলনের পাশাপাশি একটি ছোট সাইড ইভেন্ট হিসেবে অনুষ্ঠিত হতো। বিশ্ববাজারের এই বর্ধিত অংশ পাওয়ার জন্য দেশগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশল অনুযায়ী সেই অংশ বণ্টন করার নীতি এখন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। এমনকি ন্যাটোর একটি নিজস্ব ডিফেন্স ব্যাংক বা প্রতিরক্ষা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ধারণাও এখন আলোচনার টেবিলে রয়েছে, যার প্রাথমিক রূপরেখা আঙ্কারা সম্মেলনের সময়ই ৯টি দেশ মিলে তৈরি করেছে। এই ব্যাংকটি যদি বাস্তবে রূপান্তরিত হয়, তবে সামরিক-শিল্পের এই নতুন মডেলটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আর্থিক পুঁজির সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়বে।

তুরস্কের নিজস্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর এই ৩.০ সংস্করণটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করছে। ন্যাটোর প্রথম সংস্করণ বা ‘ন্যাটো ১.০’ ছিল মূলত জোটের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত সময়কাল। সেই সময়ে তুরস্ক সম্পূর্ণভাবে মার্কিন ভূরাজনৈতিক কৌশলের সাথে একীভূত ছিল, যা তুরস্কের নিজস্ব স্বাধীনতার মূল চেতনা এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল। এমনকি মার্কিন ‘গ্রিন বেল্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল এবং দেশের মানবসম্পদকে বিভিন্ন কমিউনিস্ট বিরোধী কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর ‘ন্যাটো ২.০’ পর্যায়টি বিস্তৃত ছিল ১৯৯১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এই বছরগুলোতে ন্যাটো রাশিয়ার সীমানার দিকে দ্রুত প্রসারিত হয়, যুগোস্লাভিয়াকে খণ্ডবিখণ্ড করে এবং সমগ্র পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সামরিক হস্তক্ষেপ চালায়। এই পর্বেও তুরস্কের ভূমিকা মার্কিন কৌশলের আলোকেই নির্ধারিত হয়েছিল, যা মূলত ‘উদারপন্থী ইসলামপন্থা’ ধারণার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আর বর্তমানের ‘ন্যাটো ৩.০ সংস্করণটি সংজ্ঞায়িত হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তা দায়িত্ব গ্রহণ, ইসরায়েলি আধিপত্যের অধীনে একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থার সাধনা এবং এশিয়া-প্যাসিফিকের দিকে কৌশলগত মোড় নেওয়ার মাধ্যমে।

এই নতুন বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে তুরস্ককে কার্যত ইউরোপের একজন সীমান্ত নিরাপত্তা প্রহরী বা এনফোর্সার হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। আঙ্কারাকে বোঝানো হচ্ছে যে আঞ্চলিক এই নতুন শৃঙ্খলায় নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করতে হলে তেল আবিব তথা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ছাড়া উপায় নেই এবং একই সাথে তাকে পরোক্ষভাবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন কৌশলের অংশ হতে প্ররোচিত করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, তুরস্ককে ন্যাটোর একদম ফ্রন্টলাইন বা যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রীয় সম্মুখভাগে স্থাপন করা হচ্ছে। বসফরাস প্রণালীতে নির্মাণাধীন ন্যাটোর নতুন নৌ কমান্ডটি সরাসরি রাশিয়ার দিকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে আদানা শহরে অবস্থিত ন্যাটোর নতুন কোর সদর দপ্তরটি মূলত পশ্চিম এশিয়া ও ইরানের দিকে কৌশলগতভাবে ওরিয়েন্টেড বা লক্ষ্যস্থিত করা হয়েছে।

ন্যাটোর নতুন সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে মূলত এই জোটে মার্কিন নেতৃত্বের প্রকৃত মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন এবং তার বক্তব্যগুলো ইউরোপের চেয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানকেই বেশি ফুটিয়ে তোলে। সম্মেলনের আগে ও পরে দেওয়া রুটের বক্তব্যগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য আসলে কী। রুটে যুক্তি দিয়েছেন যে, রাশিয়া বর্তমানে উত্তর কোরিয়া, চীন ও ইরানের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তাই ন্যাটো কোনোভাবেই এই বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে না। এবং জোটকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

এই বক্তব্যের মূল কথা হলো, ন্যাটো ৩.০-এর আসল লক্ষ্য হলো এই সামরিক জোটকে প্রথমে বেইজিংয়ের প্রধান অংশীদার–রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা এবং সময়ের ব্যবধানে সরাসরি চীনের নিজের বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা। ন্যাটোকে এশিয়ার দিকে পুনর্নির্দেশিত করার এই তীব্র মার্কিন প্রচেষ্টা মূলত সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। গত চার বছর ধরে নিয়মিতভাবে ‘আইপি৪’ ভুক্ত এশীয় দেশগুলোর নেতাদের ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। আঙ্কারা সম্মেলনেও এই রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলোচনা মূলত উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল।

ওয়াশিংটন মূলত এই এশীয় অংশীদারদের এমন একটি ঘনিষ্ঠ সামরিক সারিবদ্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা দেখতে অনেকটা একটি উপ-জোট বা ‘এশিয়ান ন্যাটো’র মতো মনে হয়। টোকিওতে একটি ন্যাটোর লিয়াজোঁ বা যোগাযোগ অফিস খোলার প্রস্তাবটি আটকে আছে ফ্রান্সের তীব্র বিরোধিতার কারণে। এটিও বৃহত্তর এশীয় কৌশলেরই একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এশিয়ার বুকে ন্যাটোর ভূমিকা আরও ব্যাপক করার জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। সেক্রেটারি জেনারেল রুটে যেমনটি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ইউরো-আটলান্টিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।” এই বক্তব্যটি মূলত ন্যাটোর মূল ভৌগোলিক সীমানার বাইরে গিয়ে এশিয়া অঞ্চলে জোটের ফোকাস বা মনোযোগ প্রসারিত করার মার্কিন প্রচেষ্টাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

ন্যাটো ৩.০ সংস্করণের এই সামগ্রিক রূপান্তর থেকে বিভিন্ন পক্ষের প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ন্যাটোকে তার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন বিরোধী কৌশলের সাথে সম্পূর্ণ সারিবদ্ধ করা। ইউরোপের প্রত্যাশা হলো, ইউক্রেন ও নিজেদের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব ইউরোপের নিজের ওপর স্থানান্তরিত হলেও ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপীয় নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সম্পৃক্ততা যেন বজায় থাকে। আর তুরস্কের মূল লক্ষ্য হলো এই ক্রমবর্ধমান বিশ্ব সামরিক বাজার থেকে নিজেদের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের একটি বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তবে এই সব কৌশলগত সমীকরণের বাইরে, গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে ন্যাটোকে আজ একটি প্রাচীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সামরিক জোট হিসেবেই দেখা হয়, যার মূল ঐতিহাসিক ভূমিকা ও কার্যকারিতা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে এবং যা এখন কেবলই মার্কিন বৈশ্বিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি আগ্রাসী হাতিয়ার মাত্র।

সম্পর্কিত