পৃথিবীতে গত কয়েক দশকে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন অনেক শাসক। এ তালিকায় এখন পর্যন্ত সর্বশেষ নাম বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী, দলীয় সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।
পরে অনেকে বিভিন্ন দেশে চলে যান। দেশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
এদিকে গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
হাসিনা বলেন, “আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক–যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছিল।”
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে চিঠি দিচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন। তিনি আরও বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
বিচারব্যবস্থায় বিশ্বাস আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, “বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারবে আদালতটি কতটা প্রহসনের। আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
অবশ্য তার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিয়ে কয়েক মাস ধরেই ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য আসছে। মূলত বিদেশি গণমাধ্যমেই এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ পেয়েছে।
তবে রয়টার্সকে দেওয়া তার সাক্ষাৎকার বাংলাদেশে শোরগোল তোলার পাশাপাশি নতুন করে জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মহলে চলছে নানা বিতর্ক ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।
তার বক্তব্য প্রকাশের পর জুলাই আন্দোলনের নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, “আজকে একটা ইন্টারভিউয়ে আমরা দেখেছি যে ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশ তো অলরেডি ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই দেশে ফিরবেন, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।”
অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, “শেখ হাসিনার বক্তব্যকে সরকার রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
জহির উদ্দিন স্বপনের মতে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের ক্ষেত্রে আইনের সীমারেখাই চূড়ান্ত বিবেচ্য হবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “ডিসেম্বরে আসবেন, জানুয়ারিতে আসবেন–এটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনাকে তো আমরা কালকেই চাই। অতএব কোনো স্ট্যান্টবাজি করবেন না। এখানে আর কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবেন না।”
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কৌশল, না কথার কথা
এখন প্রশ্ন উঠেছে এটা কি সত্যিই তার দেশে ফেরার বাস্তব প্রস্তুতি, নাকি আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে আবারও সক্রিয় করার একটি কৌশল? বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার দেশে ফেরা কতটা সম্ভব?
যদি তিনি ফেরেনও, তাহলে সেটি দেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
যদিও দেশত্যাগের পর বেশির ভাগ শাসকের পক্ষেই আর দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। হাতেগোনা কয়েকজন নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছিলেন।
আর মাত্র দুজন নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
ছবি: সংগৃহীতএখন দেখার দেখার বিষয় শেখ হাসিনা সেই দলে নাম লেখাতে পারেন কি না। তবে নির্বাসিতদের পরিবার থেকে রাজনীতিতে ফিরে আসার কিছু নজির আমরা দেখতে পাই।
এই নজিরের কারণে শেখ হাসিনার পরিবারের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন মাত্র দুজন
বিশ্ব ইতিহাসে যে দুজন নির্বাসিত নেতা দেশে ফিরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা হলেন আর্জেন্টিনার হুয়ান পেরন ও পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ।
হুয়ান পেরন নির্বাসিত হওয়ার পর দেশে ফিরে আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেরন বিজয়ী হয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর দেশত্যাগ করেন। প্রায় ১৮ বছর পর ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং ওই বছরের ১২ অক্টোবর তিনি আবার আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। অবশ্য মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পেরনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ইসাবেল প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানে নওয়াজ শরীফ তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তিনবারই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি।
পরে বিচারের মাধ্যমে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের মধ্যস্থতায় তিনি ছাড়া পেয়ে ২০০২ সালে স্বেচ্ছানির্বাসনে সৌদি আরব যান। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক ঐতিহাসিক চুক্তি তাকে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
নির্বাসন থেকে দেশে ফিরতে পেরেছেন যারা
মাত্র কয়েকজন শাসকই নির্বাসন থেকে দেশে ফিরতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বলিভিয়ার ইভো মোরালেস, চিলির অগাস্তো পিনোশে, পেরুর আলবার্তো ফুজিমোরি। এই তিনজনের কেউই রাজনীতি সক্রিয় হতে পারেননি।
এ ছাড়া ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তবে তাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয়নি। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়লেও পরে প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে ছিলেন তিনি।
বলিভিয়ার ইভো মোরালেস
প্রায় ১৪ বছর বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইভো মোরালেস। শুরুতে জননন্দিতও হয়েছিলেন। তার কিছু সংস্কার বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল।
কিন্তু যেনতেন উপায়ে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস তাকে একপর্যায়ে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে স্বৈরশাসক হিসেবে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়।
গণরোষের মুখে পদত্যাগ করে মেক্সিকো পালিয়ে যান তিনি। পরে দেশে ফিরলেও রাজনীতিতে আর সুবিধা করে উঠতে পারেননি তিনি।
চিলির অগাস্তো পিনোশে
চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হারানোর পর ব্রিটেনের লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১০ অক্টোবর স্প্যানিশ একটি আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতে লন্ডনের পুলিশ তাকে আটক করে।
পরে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠায় ব্রিটিশ সরকার। দেশে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট ঘটনায় মামলা করা হয়। ৯১ বছর বয়সে পিনোশে যখন মারা যান, তখনো তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ৩০০ ফৌজদারি অপরাধের মামলা চলছিল। তার পক্ষে রাজনীতিতে আর সক্রিয় হওয়া সম্ভব হয়নি।
পেরুর আলবার্তো ফুজিমোরি
জাপানি বংশোদ্ভূত আলবার্তো ফুজিমোরি ১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পেরুর শাসনক্ষমতায় ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ফুজিমোরি পেরু থেকে পালিয়ে জাপানে আশ্রয় নেন এবং পরে চিলিতে চলে যান।
সেখানে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়। ২০০৭ সালে চিলি সরকার তাকে পেরুতে প্রত্যর্পণ করে। এরপর তার বিরুদ্ধে একের পর এক বিচারকাজ চলতে থাকে।
বিচারে তার ২৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে ফুজিমোরিকে ক্ষমা করে দেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তার মৃত্যু হয়। তিনি রাজনীতিতে আর সক্রিয় হতে পারেননি।
শ্রীলঙ্কার গোতাবায়া রাজাপাকসে
শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব ছিল প্রায় সাত দশক ধরে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী তামিল টাইগারদের পরাজিত করে ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যায় রাজাপাকসে পরিবার। তাদেরকে বীরের আসনে বসিয়ে দেয় দেশটির জনগণ।
২০২২ সালে শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়ে পড়ার কিছুদিনের মধ্যেই জনরোষের মুখে পড়ে রাজাপাকসে পরিবার। প্রথমে মে মাসে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নেন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে।
জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশত্যাগ করে প্রথমে মালদ্বীপে, পরে সিঙ্গাপুরে হয়ে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি। এর প্রায় দেড় মাস পর ‘বিশেষ নিরাপত্তা’ নিয়ে তিনি ফেরত আসেন নিজ দেশে।
ওই বছর ২ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের পর গোতাবায়ার কলম্বোতে ফেরার খবর দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় রয়টার্স। তবে এখনো রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি গোতাবায়া রাজাপাকসে বা তার পরিবার।
ছবি: সংগৃহীতবাংলাদেশে এরশাদ
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার পর তাকে জেলে যেতে হয়। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা করা হয় এবং একটি মামলায় তিনি দণ্ডিত হন। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়লেও প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে ছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকার এরশাদকে সব মামলায় জামিন দিয়ে জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়। ২০০৫ সালে তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে মহা অংশীদার হন। ২০০৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতার বলয়ের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছেন।
পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে ফেরা
নির্বাসিত বা পতিত শাসকদের পরিবার থেকে পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে ফিরে আসার অনেক নজির দেখা যায়। তাদের মধ্যে অন্যতম ফিলিপাইনের স্বৈরশাসক মার্কোসের ছেলে ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস জুনিয়র, পেরুর আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে কেইকো ফুজিমোরি ও থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর মেয়ে সিতি হেদাইতি সুহার্তো ও জামাতা প্রাবোউ সুবিনাতো। সুহার্তো গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হলেও তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়নি। অবশ্য তিনি আটক ছিলেন।
এখন জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন পতিত স্বৈরশাসকের পরিবারের সদস্যরা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।
ফিলিপাইনে মার্কোসের পরিবার
ফিলিপাইনের স্বৈরাশাসক ফার্ডিন্যান্ড ই মার্কোস ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানে করে গুয়াম দ্বীপে আশ্রয় নেন। তিনি ২১ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান ফার্ডিনান্দ মার্কোস। এরপর সন্তানদের নিয়ে ফিলিপাইনে ফিরে আসেন তার স্ত্রী ইমেলদা। নব্বইয়ের দশকে শুরু করেন রাজনীতি। দেশটির ইলোকোস নর্তে অঞ্চল থেকে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হন ইমেলদা। রাজনীতি শুরু করেন তার দুই সন্তানও। মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত ও পালিয়ে যাওয়ার ৩৬ বছর পর ২০২২ সালে তার ছেলে ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস জুনিয়র ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হন।
থাইল্যান্ডে থাকসিনের পরিবার
২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছিল থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল। কিন্তু ২০০৬ সালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর থাকসিন ও তার রাজনৈতিক দলকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।
এরপর থাকসিন যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান। পরে তার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হন। ৩৭ বছর বয়সী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ছিলেন দেশটির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া থাকসিনের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা থাইল্যান্ডের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১১ সালে থাকসিন সমর্থিত একটি রাজনৈতিক দল ফিউ থাই পার্টি নির্বাচনে জয়লাভ করলে ইংলাক সিনওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হন।
পেরুতে ফুজিমোরির মেয়ে
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে প্রায় ১০ বছর শাসনক্ষমতায় ছিলেন আলবার্তো ফুজিমোরো। দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ২০০০ সালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২৬ বছর পর তার মেয়ে কেইকো ফুজিমোরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।
গত ৭ জুন পেরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভোট গ্রহণ হয়। মাসখানেক পর ৩ জুলাই দেশটির ইলেকটোরাল কোর্ট ন্যাশনাল জুরি অব ইলেকশনস (জেএনই) তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। ডানপন্থী ফুজিমোরি বামপন্থী প্রার্থী কংগ্রেস সদস্য রবার্তো সানচেজকে পরাজিত করেন।
কেইকো ফুজিমোরির জয়ে একদিকে যেমন লাতিন আমেরিকার ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা আরও সুসংহত হলো, তেমনি গত তিন দশকের মধ্যে পেরুর অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের প্রত্যাবর্তনও নিশ্চিত হলো।
ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর পরিবার
১৯৯৮ সালে দেশজুড়ে উত্তাল বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মুখে পদত্যাগ করেছিলেন ৩১ বছর ধরে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট সুহার্তো। তার ক্ষমতাচ্যুতির ১৬ বছর পর ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার মেয়ে সিতি হেদাইতি সুহার্তো (তিতেক সুহার্তো নামেও পরিচিত) নির্বাচনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করেন।
দুই বছর পর ২০১৬ সালে সুহার্তোর ছেলে টমি সুহার্তো একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। টমির দলেও সিতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তার স্বামী প্রাবোউ সুবিনাতোর গেরিন্দ্র পার্টিতে যোগ দেন। তাকে দলটির উপদেষ্টা বানানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার স্বামী প্রাবোউ সুবিনাতো জয়লাভ করেন।
সুবিনাতোর বিরুদ্ধে সুহার্তো ক্ষমতায় থাকাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। তখন তিনি স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। সুহার্তোর পতনের পর সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় সুবিনাতোকে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সুবিনাতোকে আমেরিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
লিবিয়ায় গাদ্দাফির ছেলে
লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন। তার তিন ছেলের মধ্যে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি বেঁচে গেলেও মুত্তাসিম যুদ্ধ করে মারা যান। আরেক ছেলে সাদি নাইজারে পালিয়ে যান। পরে তাকে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং কারাভোগের পর ২০২১ সালে মুক্তি পান। পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
সাইফ আল ইসলামকে গাদ্দাফির উত্তরাধিকারী মনে করা হতো। তিনি বিদ্রোহীদের হাতে প্রায় ৬ বছর আটক ছিলেন। ২০১৭ সালে মুক্ত হন। পরে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি নিহত হন।
মিশরে হোসনি মোবারকের ছেলে
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। তাকে আটক করা হয়। দুই ছেলে আলা মোবারক ও গামাল মোবারককেও গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে গামাল মোবারক কারাগার থেকে ছাড়া পান।
২০২৩ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে গামাল মোবারকের পক্ষে অনলাইন প্রচার শুরু করেছিলেন অনেক মিশরীয়। এসব প্রচারের মাধ্যমে তারা মিশরের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গামাল মোবারককে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান বলে জানিয়েছিলেন।
অনেক মিশরীয় তাদের ফেসবুক এবং টুইটারে লিখেছিলেন, মিশরের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর জন্য গামাল মোবারক একমাত্র সমাধান। শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক