ads

সিএমবিইসি করিডোর বাংলাদেশের জন্য ফাঁদ নাকি সুযোগ?

সিএমবিইসি করিডোর বাংলাদেশের জন্য ফাঁদ নাকি সুযোগ?
ছবি: এআই

দক্ষিণ চীন সাগর নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দাবাখেলা এখন ঘরের পাশেই। থ্রিলার মুভি যাদের পছন্দ, তারা একটু নড়েচড়ে বসতে পারেন। আর ভূরাজনীতি নিয়ে আগ্রহ থাকলে তো কথাই নেই।

বাড়ির পাশের এই আরশিনগরে এখন সব পড়শির চোখ। অবশ্য অনেক আগে থেকেই। আর সেই আরশিনগরটি আর কিছু নয়, বঙ্গোপসাগর।

Advertisement

নতুন করে বিষয়টি সামনে এল মূলত চীন, মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর ইস্যুতে, যার কেতাবি নাম সিএমবিইসি বা চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর।

এই করিডোর নিয়ে আলোচনা চলছে ব্যাপকভাবে। কেউ বলছেন এটি বাংলাদেশের সামনে বড় অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে আসছে। কিন্তু আরেক পক্ষ একে দেখছেন সন্দেহের চোখে। মোটাদাগে বিষয়টি ঘিরে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে–

এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য ফাঁদ নাকি সুযোগ?

এই করিডোর বাস্তবায়ন হলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে?

এই করিডোর ধরে শুধু কি দ্রুতগতিতে পণ্য আসা-যাওয়া করবে, নাকি শরণার্থী ও অস্ত্রও?

এর মধ্য দিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের বলি হতে পারে কি বাংলাদেশ?

চলুন একে একে উত্তর খোঁজা যাক। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। হরমুজের দিকে সবার নজর। সেখানে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। এবার এটা ছায়া কিংবা স্নায়ুযুদ্ধ–যাই হোক। আছে জ্বালানি সরবরাহসহ নানা বিষয়াদি।

সবাই যখন এসব সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশের উপকূলে উড়তে শুরু করেছে সতর্ক সংকেত। না প্রাকৃতিক কোনো ঘূর্ণিঝড় নয়। তবে ঘূর্ণিঝড়ই। আর সেটা ভূরাজনৈতিক।

আর তার কেন্দ্রে চলে আসছে সেই প্রথমে বলা সিএমবিইসি করিডোর। এই করিডোরটি বুঝতে হলে আমাদের মানচিত্রের দিকে তাকাতে হবে। এর শুরু চীনের স্থলবেষ্টিত ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। সেখান থেকে এটি দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে।

মান্দালয় থেকে এই করিডোরটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি শাখা চলে গেছে দক্ষিণে, ইয়াঙ্গুনের দিকে।

আর অন্য শাখাটি পশ্চিমে এগিয়ে রাখাইন রাজ্যের কিয়াকফিউতে এসে ঘাঁটি গেড়েছে। গড়ে তুলেছে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আশঙ্কা–চীন সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনার আড়ালে সামরিক স্থাপনাও গড়েছে।

এতদিন কিয়াকফিউ পর্যন্ত এসে চীন নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাশ টানতে বাধ্য হয়েছে। আর এগোতে পারেনি। অনেক চেষ্টা হয়েছে।

কিন্তু ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণে এক পা এগিয়ে দু পা পেছাতে হয়েছে চীনকে। শত চেষ্টাতেও মিসিং লিংক জুড়তে পারেনি তারা।

এমনকি সীমান্ত বিবাদ থাকা প্রতিবেশী ভারতকে সাথে নিয়েও চেষ্টা চালিয়েছিল বেইজিং। এবার সেই মিসিং লিংকের একটা সুরাহা সম্ভবত পেল সি চিনপিংয়ের প্রশাসন। আর তা বাংলাদেশ।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশটি হলো বাংলাদেশের সাথে এর প্রস্তাবিত সংযোগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল সরাসরি যুক্ত হবে কক্সবাজারের টেকনাফের সাথে, এবং সেখান থেকে চট্টগ্রাম ও মোংলার বন্দরের সঙ্গে।

মালাক্কা প্রণালি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
মালাক্কা প্রণালি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

মহাসড়ক, ভারী রেললাইন এবং গভীর সমুদ্রবন্দর–সব মিলিয়ে তৈরি হবে একটি নিরবচ্ছিন্ন স্থল-সামুদ্রিক সেতু। আর এই তিন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকার কারণেই একে বলা হচ্ছে মাল্টিমোডাল।

চীনের কেন এটি প্রয়োজন?

চীন কেন এই রুটটি নিয়ে এত তৎপর? এর উত্তর খুঁজতে হলে বোঝা দরকার চীনের ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বিষয়টি।

মালাক্কা প্রণালি চীনের ঐতিহাসিক দুর্বলতা। বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিপক্ষগুলো বরাবরই চীনকে এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভুগিয়েছে। ঠিক যেমনটা তাইওয়ান নিয়ে। সেটা অন্য আলাপ।

যা হোক, চীনের একিলিস হিল হলো মালাক্কা প্রণালি। একেই বলা হয় মালাক্কা ডিলেমা। একটু বুঝে নেওয়া যাক।

বর্তমানে চীনের সিংহভাগ জ্বালানি আমদানি এবং বাণিজ্যিক পণ্য এই সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। সেটা কী পরিমাণ? চীনের মোট আমদানি করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ ও পণ্য বাণিজ্যের ২৫ শতাংশের বেশি এই মালাক্কা প্রণালি দিয়েই হয়।

আর এই মালাক্কা প্রণালির সবচেয়ে সরু যে এলাকা, তা আড়াই কিলোমিটারেরও কম চওড়া এবং মাত্র ২৩ মিটার গভীর। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণের দাবিদার আবার তিন দেশ: ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর।

এই দেশগুলো আবার বিভিন্ন সময় এই প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। এই অঞ্চলে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো শক্তিগুলোর সামরিক উপস্থিতি প্রায়ই দেখা যায়। আর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর–তিন দেশেই আছে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব। অদূরে থাকা ফিলিপাইনে আছে ওয়াশিংটনের জোর সামরিক উপস্থিতি।

এটা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেই ঢিল, যা দিয়ে সে দুই পাখি মারতে চায়। দুটিই অবশ্য চীনের। ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একদিকে তাইওয়ান, অন্যদিকে মালাক্কা ইস্যুতে চীনকে চাপে রাখে।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষ সহজেই এই সরু পথটি ব্লক করে দিতে পারে, যা চীনের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ অচল করে দেবে।

মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি সরাসরি করিডোর তৈরি করে চীন মূলত ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বিশাল ‘ব্যাক ডোর’ বা পেছনের দরজা নিশ্চিত করতে চায়, যা বাজে পরিস্থিতিতে তাকে একটি বিকল্প দিতে পারে।

আবার ইউনানের মতো স্থলবেষ্টিত প্রদেশকেও সমুদ্রে প্রবেশাধিকার দিতে চায় চীন।

চীন এই সিএমবিইসি করিডোরের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেকগুলো লক্ষ্য অর্জন করতে চায়–

১। মালাক্কা ডিলেমার একটা মীমাংসা

২। ইউনানকে সমুদ্রে প্রবেশাধিকার দেওয়া এবং

৩। উচ্চাভিলাষী বিআরআই প্রকল্পের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বাণিজ্য বলয় বৃদ্ধি

এর আগে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে করিডোর করতে চেয়েছিল চীন। সেটি ছিল বিসিআইএম করিডোর। কিন্তু সীমান্ত দ্বন্দ্ব থাকায় ভারত চীনের সঙ্গে এমন করিডোরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভুগেছে।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা কোয়াড জোটের অংশ হওয়ায় ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণও কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু থেকে শত্রু বা শত্রুভাবাপন্নের কাতারে যেতে চায়নি নয়াদিল্লি। ফলে সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।

চীনও বসে ছিল না। মিয়ানমারে প্রভাব বাড়িয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে। আর এসব তৎপরতার ফলই হলো কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন।

বাংলাদেশ প্রস্তুত হয়ে আছে আগে থেকেই। শুধু ভুরাজনৈতিক ছকে বসে সংশয় কাটছিল না। এবার দ্বিধা ঝেড়ে সেদিকে পা বাড়িয়েই দিল। আর পা বাড়ানোতে অনেক ধরনের ঝুঁকি ও শঙ্কা চোখ রাঙানো শুরু করেছে।

কারণ, বেইজিংয়ের জন্য যা অর্থনৈতিক জ্যাকপট, অন্যদের জন্য তা চরম ভূ-রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ। এই অন্যদের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।

নয়াদিল্লি এই করিডোরকে তীব্র সন্দেহের চোখে দেখছে। ভারতের ঠিক পূর্ব প্রান্তে এই করিডোরের উপস্থিতি মানে বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাবের এক বিশাল বিস্তার, যাকে বিশ্লেষকেরা চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা মুক্তার মালা কৌশল বলে আখ্যা দেন।

ভারত চীনের এই উদ্যোগে প্রমাদ গুণছে। কারণ, নয়াদিল্লিও চায়–তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার। চীনের সঙ্গে এই মৈত্রী তাকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও নয়াদিল্লি ঢাকাকে সন্দেহের চোখেই দেখবে।

ভারত বাংলাদেশকে বলা যায় ভৌগোলিকভাবে ঘিরে রেখেছে। ফলে ঢাকার জন্য এই করিডোর এক কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একদিকে, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, ঢাকাকে তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা নিরপেক্ষতা রক্ষার চ্যালঞ্জ নিতে হবে।

ভারতের সঙ্গে চলমান শীতল সম্পর্ককে এই করিডোর আরও শীতল করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদ আগেই পেতে রেখেছে। ফলে ওয়াশিংটনও এই মাখামাখিকে ঠিক ভালো চোখে দেখবে না।

সঙ্গে আছে রাখাইনের সংকট। সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠী, রোহিঙ্গা সংকট ইত্যাদি অবধারিতভাবেই বাংলাদেশের জন্য একটি চোক পয়েন্ট তৈরি করবে, যা এই মৈত্রীর আড়ালে একটি দর কষাকষির উপকরণ হিসেবে থেকে যাবে বরাবর। একবার এই করিডোর করে অন্যদিকে হেলতে নিলেই সামনে আসবে এই সংকটগুলো।

আবার সংকট মীমাংসার প্রতিশ্রুতিও বারবার কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হতে পারে।

একটু বুঝিয়ে বলা যাক–

এই বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা নিরাপত্তা। কারণ কী? কুনমিং থেকে চট্টগ্রামকে যুক্ত করতে হলে ফিজিক্যাল রোড এবং রেললাইনকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়েই আসতে হবে।

কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এই অঞ্চলের বিশাল অংশের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এর বিপরীতে আরাকান আর্মির মতো একটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এই অঞ্চলের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে মংডুর আশপাশের এলাকাও রয়েছে।

এর মানে হলো, এই করিডোরকে বাস্তবে রূপ দিতে চীনকে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনা করলেই চলবে না। চীন সেটা জানে। জানে বলেই বেইজিং এখন জান্তা সরকার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী–উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখে একটি আন্তঃদেশীয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হচ্ছে, যাতে তাদের বিপুল বিনিয়োগ ধ্বংস না হয়ে যায়।

আর বাংলাদেশের জন্য এই পুরো প্রকল্পের সাথে একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত জুড়ে রয়েছে: রোহিঙ্গা সংকট। ঢাকা আশা করে, বেইজিং মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মি উভয়ের ওপর তাদের বিশাল প্রভাব খাটিয়ে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করবে। কারণ, রাখাইনে স্থিতিশীলতা না থাকলে এখানে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব নয়।

কাগজে-কলমে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ অত্যন্ত চমৎকার একটি পরিকল্পনা, যা মাত্র ২৪ ঘণ্টার ট্রানজিটের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্যকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি এখনো একটি উচ্চ-ঝুঁকিসম্পন্ন ব্লুপ্রিন্ট। এটি কি শেষ পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য ইঞ্জিন হবে, নাকি আঞ্চলিক সংঘাতের বেড়াজালে আটকে পড়া একটি ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবে রয়ে যাবে–তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ঢাকা কীভাবে এই কূটনৈতিক চাপ সামলায়, বেইজিং কীভাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাখাইন উপকূলে আদৌ শান্তি ফিরে আসে কি না, তার ওপর।

ফজলুল কবির: বার্তা সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত