রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা যেন কোনোভাবেই দূর হওয়ার নয়। প্রতি বছরের মতো এবারও সামান্য টানা বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে পুরো নগরী। অথচ এই জলাবদ্ধতা নিয়ে মাত্র দুই বছর আগেও সফলতার ‘গল্প’ শুনিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে বাস্তবতার মুখে এখন করপোরেশনের কর্মকর্তারাই মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জলাবদ্ধতা একেবারে দূর করা সম্ভব নয়, কেবল কিছুটা কমানো সম্ভব। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতেও, দীর্ঘমেয়াদী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবের কারণে এই জলাবদ্ধতা সহসা ঢাকার বুক থেকে যাচ্ছে না।
আজ রোববার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কালশী ও উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার প্রধান প্রধান সড়কে পানি জমে যায়। এ ছাড়া নিউমার্কেট, মিরপুর, সায়েন্সল্যাব, রামপুরা ও মতিঝিলসহ বহু এলাকা দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা ও ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকা থেকে পানি দ্রুত নামতে পারেনি, যা নগরবাসীর দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ রোববার সারা দিন রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
সিটি করপোরেশন যা অতীতে বলেছিল
এর আগেও জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘সফলতার গল্প’ শুনিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। তখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দাবি করেছিলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই ধরনের দাবি করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নিউমার্কেট ও পিলখানা এলাকায় জলাবদ্ধতা শতভাগ নিরসনের দাবি করেছিলেন।
জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দুই বছর আগেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। ডিএসসিসি এ খাতে মোট ২০০ কোটি টাকার মধ্যে সরাসরি ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এছাড়া খাল, জলাশয় ও নর্দমা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ৩০ কোটি টাকা, খাল-পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধারে ২ কোটি টাকা এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প ক্রয় ও স্থাপনে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএনসিসি জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প হাউসের যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও ক্রয়ের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। খালের উন্নয়ন, সীমানা নির্ধারণ ও বৃক্ষরোপণে বরাদ্দ রাখা হয় ৩৮ কোটি টাকা। এছাড়া নর্দমা পরিষ্কারে ১১ কোটি, খাল পরিষ্কারে ৫ কোটি, খাল-কালভার্ট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১০ কোটি, পাম্প হাউস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৮ কোটি এবং লেক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
ছবি: রয়টার্স
তবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই সিটি করপোরেশনই জানিয়েছে, কার্যকর সেবা প্রদানের জন্য তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই।
ভুগছে নগরবাসী
শনিবার গভীর রাতের ভারী বৃষ্টির পর রোববার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। বেলা ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কে যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। অলিগলিতে পানি জমে যাওয়ায় রিকশা চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় বিকেল পর্যন্ত পানি না নামায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাতিরঝিল, মিরপুর, কলাবাগান, উত্তরা, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মতিঝিল, ধানমন্ডি ২৭, মালিবাগ, কাকরাইল ও রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ের কিছু সড়ক পুরোপুরি প্লাবিত হয়। প্রধান সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলিতেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ফলে সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
শেওড়াপাড়ায় প্রধান সড়কের পাশাপাশি আশপাশের গলিগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যায়। ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকার পেছনের সড়ক এবং মোহাম্মদপুরের কয়েকটি আবাসিক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে। এছাড়া গ্রিন রোড, পান্থপথ ও কলাবাগানের অভ্যন্তরীণ সড়কেও কয়েক ঘণ্টা ধরে পানি আটকে থাকে।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ভোগান্তিতে পড়েন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শারমিন ইসলাম শান্তা। তিনি বলেন, “পানি জমে থাকায় সিএনজি অটোরিকশা পাচ্ছিলাম না। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে পানি থাকায় অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। সিএনজি না পেয়ে রিকশা খুঁজেছি, কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও রিকশা পাইনি।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি ধীর হয়ে পড়ে এবং একাধিক সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ফুটপাত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে প্রধান সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হয়।
মিরপুরের কাজীপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, “অনেক জায়গায় হাঁটুর ওপরে পানি উঠে গেছে। ফলে সকালে কাজে যেতে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেকেই কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরু গলি থেকে প্রধান সড়কে বের হওয়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এলাকার ব্যবসায়ী শরিফ উদ্দিন বলেন, “এখানে কয়েকটি গলিতে বৃষ্টি হলেই পানি জমে। অথচ এ সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন কী করছে, আমরা জানি না। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।”
যা করছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া (ইমার্জেন্সি রেসপন্স) টিম মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির দাবি, টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলজট দ্রুত নিরসনে কমলাপুরের দুটি এবং ধোলাইখালের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
করপোরেশন আরও জানায়, রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নীলক্ষেতসংলগ্ন আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীতে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
প্রশাসক বলেন, ‘‘টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা ভোর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছেন। জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’’
তিনি নাগরিকদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সবসময় নাগরিকদের পাশে রয়েছে।’’
এদিকে ডিএসসিসি নাগরিকদের ওয়াসা, ডিপিডিসি ও তিতাসের চলমান রাস্তা খননের ফলে সৃষ্টি হওয়া গর্ত এবং বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
লোকবলের অভাব দক্ষিণ সিটিতে
জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল সংকটকে দায়ী করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।
তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আমাদের আলাদা কোনো জনবল নেই। পরিবেশ সার্কেলের কর্মীদের দিয়েই এই কাজ চালানো হচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এখনও এই সার্কেলের জন্য কোনো জনবল মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাইনি। বলতে গেলে জোড়াতালি দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’’
জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমান বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখন কার্যত কোনো বাজেট নেই। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু বাস্তবে মনে হয় ৫ কোটি টাকাও পাইনি। অর্থের সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা।’’
নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ৫৮টি সুইস গেট রয়েছে, যেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে আমাদের তিনটি সাকার মেশিন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘স্বাভাবিক সময়ে পানি নেমে যায়। কিন্তু গত ৩৬ ঘণ্টায় ১৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে যেসব আউটফল দিয়ে পানি বের হওয়ার কথা, সেখানে মান্ডা খালের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে।’’
উল্লেখ্য, মান্ডা খাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও নিষ্কাশন পথ।
পানি নিষ্কাশনের আউটলেট বাড়ানোর পরিকল্পনা
ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিরসনে কী পরিকল্পনা রয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, "আমরা একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করছি। এতে মূল ড্রেনের সঙ্গে আরও সাত থেকে আটটি নতুন আউটলেট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।"
ধানমন্ডি। ছবি: রয়টার্স
তিনি বলেন, ‘‘অনেক ড্রেনের সঙ্গে মূল ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সংযোগ নেই। সেগুলোর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও জরুরি।’’
তিনি স্বীকার করেন, ‘‘এ বছর বর্ষা শুরুর আগে যেভাবে ড্রেন পরিষ্কার করার কথা ছিল, তা পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি।’’
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেন হয়নি?
জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেন হচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘১৯৯০ সাল থেকে প্রায় ৩০ বছর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল ওয়াসার। ২০২০ সাল থেকে গত ছয় বছর ধরে এ দায়িত্ব সিটি করপোরেশন পালন করছে। আমরা মূলত দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার উত্তরাধিকার পেয়েছি।’’
যা করছে ঢাকা উত্তর সিটি
টানা বৃষ্টির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি রোববার সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। এ সময় গুলশান, বনানী, মহাখালী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার সড়ক এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন তিনি। তার সঙ্গে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে প্রশাসক গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকায় জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং ভবিষ্যতে যাতে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
তবে মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণের মতো উত্তর সিটির অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে মিরপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই এখনও অনেক সড়কে পানি জমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা নেমে না।
এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির ড্রেনেজ সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রথমে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি।
তবে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুব আলম চরচাকে বলেন, ‘‘আমাদের ক্যাচপিট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাতে দ্রুত পানি নেমে যেতে পারে, সে জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত রেসপন্স টিম ভোর থেকেই মাঠে কাজ করছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোথাও প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বাসাবাড়ি থেকে বের হওয়া পানি ড্রেন হয়ে খালে এবং সেখান থেকে নদীতে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেকোনো স্থানে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পানি আটকে যায়।’’
খন্দকার মাহবুব আলম আরও বলেন, ‘‘রাজধানীতে ড্রেনের স্বল্পতা রয়েছে। আবার যেখানে ড্রেন আছে, সেখানেও অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, খালগুলোর পানি ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। দখল ও ভরাটের কারণে পানি দ্রুত নদীতে যেতে পারছে না।’’
পুরোপুরি সমাধানে সময় লাগবে
খন্দকার মাহবুব আলমের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন করতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের নানা ত্রুটি রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের দুর্বল পরিকল্পনাও এ সংকটের অন্যতম কারণ।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ঢাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। তবে নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিটি করপোরেশন কাজ করছে।’’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান হালনাগাদ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে কাজ করা হবে।’’
পরিকল্পনার অভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা মূলত অপরিকল্পিত ও স্বেচ্ছাচারী নগরায়ণের ফল।
তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবতা হলো, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের এখনো কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ওয়াসার সময় একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা সমন্বিত বা পৃথকভাবে কোনো কার্যকর ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন করেনি।’’
তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছর পরিকল্পনাহীনভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ শহরে কতটুকু সবুজ এলাকা প্রয়োজন, কোথায় কতটুকু জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে বা কোন এলাকায় কতটুকু বৃষ্টির চাপ সামাল দিতে হবে—এসব বিষয়ে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই।’’
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘‘ড্রেন ও কৃত্রিম নালা নির্মাণ করা হলেও সেগুলো কঠিন বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের অনেক শহরে বৃষ্টিপাত, পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে আধুনিক সফটওয়্যারভিত্তিক ড্রেনেজ মডেলিং করা হয়। কোথায় কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে এবং কীভাবে তা নিষ্কাশন করা হবে, সেটি আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব। কিন্তু আমরা এখনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে তাৎক্ষণিক বা অ্যাডহক ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজছি।’’
স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, জলাবদ্ধতার কোনো কার্যকর স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই।
তিনি বলেন, ‘‘সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না নেবে, ততদিন জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকেই যাবে। এ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া বিকল্প নেই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘খাল ও নদীর যে অংশ এখনো টিকে আছে, তা দিয়ে অতি ভারী বৃষ্টির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। নগরায়ণের বিস্তার এতটাই বেড়েছে যে নাগরিকদের কিছুটা দুর্ভোগ সহ্য করতেই হবে।’’
ছবি: রয়টার্স
তবে তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তার ভাষায়, ‘‘সরকারকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে জলাশয় ও জলাধার পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে উচ্ছেদ এবং ভবিষ্যতে নতুন করে জলাশয় দখল রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে।’’
রাজধানীর সড়কে জলাবদ্ধতা। ছবি: রয়টার্স
রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা যেন কোনোভাবেই দূর হওয়ার নয়। প্রতি বছরের মতো এবারও সামান্য টানা বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে পুরো নগরী। অথচ এই জলাবদ্ধতা নিয়ে মাত্র দুই বছর আগেও সফলতার ‘গল্প’ শুনিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবে বাস্তবতার মুখে এখন করপোরেশনের কর্মকর্তারাই মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জলাবদ্ধতা একেবারে দূর করা সম্ভব নয়, কেবল কিছুটা কমানো সম্ভব। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতেও, দীর্ঘমেয়াদী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবের কারণে এই জলাবদ্ধতা সহসা ঢাকার বুক থেকে যাচ্ছে না।
আজ রোববার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কালশী ও উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার প্রধান প্রধান সড়কে পানি জমে যায়। এ ছাড়া নিউমার্কেট, মিরপুর, সায়েন্সল্যাব, রামপুরা ও মতিঝিলসহ বহু এলাকা দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা ও ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকা থেকে পানি দ্রুত নামতে পারেনি, যা নগরবাসীর দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ রোববার সারা দিন রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
সিটি করপোরেশন যা অতীতে বলেছিল
এর আগেও জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘সফলতার গল্প’ শুনিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। তখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দাবি করেছিলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই ধরনের দাবি করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নিউমার্কেট ও পিলখানা এলাকায় জলাবদ্ধতা শতভাগ নিরসনের দাবি করেছিলেন।
জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দুই বছর আগেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। ডিএসসিসি এ খাতে মোট ২০০ কোটি টাকার মধ্যে সরাসরি ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এছাড়া খাল, জলাশয় ও নর্দমা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ৩০ কোটি টাকা, খাল-পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধারে ২ কোটি টাকা এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প ক্রয় ও স্থাপনে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএনসিসি জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প হাউসের যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও ক্রয়ের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। খালের উন্নয়ন, সীমানা নির্ধারণ ও বৃক্ষরোপণে বরাদ্দ রাখা হয় ৩৮ কোটি টাকা। এছাড়া নর্দমা পরিষ্কারে ১১ কোটি, খাল পরিষ্কারে ৫ কোটি, খাল-কালভার্ট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১০ কোটি, পাম্প হাউস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৮ কোটি এবং লেক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
ছবি: রয়টার্স
তবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই সিটি করপোরেশনই জানিয়েছে, কার্যকর সেবা প্রদানের জন্য তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই।
ভুগছে নগরবাসী
শনিবার গভীর রাতের ভারী বৃষ্টির পর রোববার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পানির নিচে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। বেলা ১১টা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কে যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। অলিগলিতে পানি জমে যাওয়ায় রিকশা চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় বিকেল পর্যন্ত পানি না নামায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাতিরঝিল, মিরপুর, কলাবাগান, উত্তরা, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মতিঝিল, ধানমন্ডি ২৭, মালিবাগ, কাকরাইল ও রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ের কিছু সড়ক পুরোপুরি প্লাবিত হয়। প্রধান সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অলিগলিতেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ফলে সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
শেওড়াপাড়ায় প্রধান সড়কের পাশাপাশি আশপাশের গলিগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যায়। ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকার পেছনের সড়ক এবং মোহাম্মদপুরের কয়েকটি আবাসিক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে। এছাড়া গ্রিন রোড, পান্থপথ ও কলাবাগানের অভ্যন্তরীণ সড়কেও কয়েক ঘণ্টা ধরে পানি আটকে থাকে।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ভোগান্তিতে পড়েন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শারমিন ইসলাম শান্তা। তিনি বলেন, “পানি জমে থাকায় সিএনজি অটোরিকশা পাচ্ছিলাম না। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে পানি থাকায় অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। সিএনজি না পেয়ে রিকশা খুঁজেছি, কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও রিকশা পাইনি।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি ধীর হয়ে পড়ে এবং একাধিক সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ফুটপাত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে প্রধান সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হয়।
মিরপুরের কাজীপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, “অনেক জায়গায় হাঁটুর ওপরে পানি উঠে গেছে। ফলে সকালে কাজে যেতে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেকেই কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। সরু গলি থেকে প্রধান সড়কে বের হওয়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এলাকার ব্যবসায়ী শরিফ উদ্দিন বলেন, “এখানে কয়েকটি গলিতে বৃষ্টি হলেই পানি জমে। অথচ এ সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন কী করছে, আমরা জানি না। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।”
যা করছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া (ইমার্জেন্সি রেসপন্স) টিম মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির দাবি, টানা ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলজট দ্রুত নিরসনে কমলাপুরের দুটি এবং ধোলাইখালের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
করপোরেশন আরও জানায়, রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নীলক্ষেতসংলগ্ন আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের ২ নম্বর গেটের বিপরীতে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
প্রশাসক বলেন, ‘‘টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা ভোর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছেন। জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’’
তিনি নাগরিকদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সবসময় নাগরিকদের পাশে রয়েছে।’’
এদিকে ডিএসসিসি নাগরিকদের ওয়াসা, ডিপিডিসি ও তিতাসের চলমান রাস্তা খননের ফলে সৃষ্টি হওয়া গর্ত এবং বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
লোকবলের অভাব দক্ষিণ সিটিতে
জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল সংকটকে দায়ী করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।
তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আমাদের আলাদা কোনো জনবল নেই। পরিবেশ সার্কেলের কর্মীদের দিয়েই এই কাজ চালানো হচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এখনও এই সার্কেলের জন্য কোনো জনবল মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাইনি। বলতে গেলে জোড়াতালি দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’’
জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমান বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখন কার্যত কোনো বাজেট নেই। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু বাস্তবে মনে হয় ৫ কোটি টাকাও পাইনি। অর্থের সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা।’’
নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ৫৮টি সুইস গেট রয়েছে, যেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে আমাদের তিনটি সাকার মেশিন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘স্বাভাবিক সময়ে পানি নেমে যায়। কিন্তু গত ৩৬ ঘণ্টায় ১৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে যেসব আউটফল দিয়ে পানি বের হওয়ার কথা, সেখানে মান্ডা খালের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে।’’
উল্লেখ্য, মান্ডা খাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ও নিষ্কাশন পথ।
পানি নিষ্কাশনের আউটলেট বাড়ানোর পরিকল্পনা
ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিরসনে কী পরিকল্পনা রয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, "আমরা একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করছি। এতে মূল ড্রেনের সঙ্গে আরও সাত থেকে আটটি নতুন আউটলেট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।"
ধানমন্ডি। ছবি: রয়টার্স
তিনি বলেন, ‘‘অনেক ড্রেনের সঙ্গে মূল ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সংযোগ নেই। সেগুলোর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও জরুরি।’’
তিনি স্বীকার করেন, ‘‘এ বছর বর্ষা শুরুর আগে যেভাবে ড্রেন পরিষ্কার করার কথা ছিল, তা পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি।’’
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেন হয়নি?
জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেন হচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘১৯৯০ সাল থেকে প্রায় ৩০ বছর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল ওয়াসার। ২০২০ সাল থেকে গত ছয় বছর ধরে এ দায়িত্ব সিটি করপোরেশন পালন করছে। আমরা মূলত দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার উত্তরাধিকার পেয়েছি।’’
যা করছে ঢাকা উত্তর সিটি
টানা বৃষ্টির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি রোববার সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। এ সময় গুলশান, বনানী, মহাখালী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার সড়ক এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন তিনি। তার সঙ্গে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে প্রশাসক গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকায় জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং ভবিষ্যতে যাতে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
তবে মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণের মতো উত্তর সিটির অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে মিরপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই এখনও অনেক সড়কে পানি জমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা নেমে না।
এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির ড্রেনেজ সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রথমে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি।
তবে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুব আলম চরচাকে বলেন, ‘‘আমাদের ক্যাচপিট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাতে দ্রুত পানি নেমে যেতে পারে, সে জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত রেসপন্স টিম ভোর থেকেই মাঠে কাজ করছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোথাও প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বাসাবাড়ি থেকে বের হওয়া পানি ড্রেন হয়ে খালে এবং সেখান থেকে নদীতে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেকোনো স্থানে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পানি আটকে যায়।’’
খন্দকার মাহবুব আলম আরও বলেন, ‘‘রাজধানীতে ড্রেনের স্বল্পতা রয়েছে। আবার যেখানে ড্রেন আছে, সেখানেও অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, খালগুলোর পানি ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। দখল ও ভরাটের কারণে পানি দ্রুত নদীতে যেতে পারছে না।’’
পুরোপুরি সমাধানে সময় লাগবে
খন্দকার মাহবুব আলমের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন করতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের নানা ত্রুটি রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের দুর্বল পরিকল্পনাও এ সংকটের অন্যতম কারণ।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ঢাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। তবে নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিটি করপোরেশন কাজ করছে।’’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান হালনাগাদ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে কাজ করা হবে।’’
পরিকল্পনার অভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা মূলত অপরিকল্পিত ও স্বেচ্ছাচারী নগরায়ণের ফল।
তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবতা হলো, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের এখনো কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ওয়াসার সময় একটি পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা সমন্বিত বা পৃথকভাবে কোনো কার্যকর ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন করেনি।’’
তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছর পরিকল্পনাহীনভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ শহরে কতটুকু সবুজ এলাকা প্রয়োজন, কোথায় কতটুকু জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে বা কোন এলাকায় কতটুকু বৃষ্টির চাপ সামাল দিতে হবে—এসব বিষয়ে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই।’’
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘‘ড্রেন ও কৃত্রিম নালা নির্মাণ করা হলেও সেগুলো কঠিন বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের অনেক শহরে বৃষ্টিপাত, পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে আধুনিক সফটওয়্যারভিত্তিক ড্রেনেজ মডেলিং করা হয়। কোথায় কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে এবং কীভাবে তা নিষ্কাশন করা হবে, সেটি আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব। কিন্তু আমরা এখনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে তাৎক্ষণিক বা অ্যাডহক ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজছি।’’
স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, জলাবদ্ধতার কোনো কার্যকর স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই।
তিনি বলেন, ‘‘সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না নেবে, ততদিন জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকেই যাবে। এ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া বিকল্প নেই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘খাল ও নদীর যে অংশ এখনো টিকে আছে, তা দিয়ে অতি ভারী বৃষ্টির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। নগরায়ণের বিস্তার এতটাই বেড়েছে যে নাগরিকদের কিছুটা দুর্ভোগ সহ্য করতেই হবে।’’
ছবি: রয়টার্স
তবে তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তার ভাষায়, ‘‘সরকারকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে জলাশয় ও জলাধার পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে উচ্ছেদ এবং ভবিষ্যতে নতুন করে জলাশয় দখল রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে।’’