সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেছে আর্জেন্টিনা। নরওয়েকে হারিয়ে ইংল্যান্ড। ওদিকে স্পেন আর ফ্রান্স যখন এক সেমিফাইনালে লড়বে, সেখানে যত আলোচনা এমবাপ্পে বনাম ইয়ামাল আর দুই দলের ফুটবল কৌশল নিয়ে। কিন্তু এইদিকে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল নিশ্চিত হতেই বারবার ফিরে ফিরে আসছে ছিয়াশি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।
ওই যে, আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ আর বিস্ময়মাখা মুগ্ধতায় হতবাক করে দেওয়ার মতো ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র সেই ম্যাচ!
কিন্তু আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড যখন মুখোমুখি, বিতর্ক তো শুধু এই একটিই নয়! আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের ‘মারামারি’ শুরু তো ম্যারাডোনার স্মৃতিধন্য সেই ম্যাচেরও ২০ বছর আগে – ১৯৬৬ বিশ্বকাপে।
ইংল্যান্ডের মাটিতে, ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড হয়ে থাকা সেই বিশ্বকাপেও দুই দলের দেখা হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুই দলের পাঁচ সাক্ষাতের দ্বিতীয়টি সেটি। ’৬৬ থেকে শুরু করে পরের চার ম্যাচ যদি ‘যুদ্ধংদেহী যুবক’ হয়ে থাকে, ১৯৬২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎকে বরং মায়ের হাতে এক পাশে সিঁথি করে চুল আঁচড়ানো ‘নিষ্পাপ শিশু’ বলতে হবে।
এর চার বছর পর ১৯৬৬ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে কী হয়েছিল, যেখান থেকে দুই দলের শত্রুতার শুরু? ম্যাচটা ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জেতে - আর্জেন্টিনা আজ পর্যন্ত যে ফল নিয়ে দাবি করে যে, তাদের সঙ্গে ডাকাতি হয়েছে। কেননা, তাদের হিসাবে, ইংল্যান্ডের গোলটার সময় জিওফ হার্স্ট অফসাইড ছিলেন।
কিন্তু সেটাকেও ‘মারামারি’র আগের কথা কাটাকাটি ধরে নিতে পারেন। এরপরে যা ঘটেছে, তা দুই দলের দ্বৈরথে মসলা জোগানোর পাশাপাশি ফুটবলে হলুদ কার্ড আর লাল কার্ডের প্রচলনের ক্ষেত্রও তৈরি করে দিয়েছিল।
মূল বিতর্কের মুহূর্তটা আসে ৩৩তম মিনিটে। তিন মিনিটের মধ্যে দুই বিধিবহির্ভূত আচরণের কারণে রেফারি মাঠ থেকে বের করে দেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক ও নাম্বার টেন আন্তোনিও রাত্তিনকে। প্রথম বিধিবহির্ভূত আচরণ – ববি চার্লটনকে ফাউল করা। দ্বিতীয়টি – জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি।
সে সময় হলুদ আর লাল কার্ড ছিল না। রেফারি মুখে মুখেই সতর্ক করতেন, কিংবা মাঠ থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু ওই ম্যাচে জার্মান রেফারির নির্দেশ মানতে রাজি ছিলেন না রাত্তিন। তিনি গোঁ ধরলেন, মাঠ ছেড়ে যাবেন না! ব্যস, আট মিনিট ম্যাচ বন্ধ থাকল।
রাত্তিনের দাবি, রেফারি কী বলেছিলেন, সেটি তিনি বুঝতে পারেননি। এই ভুল বোঝাবুঝি থেকেই কথা কাটাকাটি, আর কথা কাটাকাটির কারণেই তাকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন রেফারি। কিন্তু ক্ষুব্ধ রাত্তিন শেষ পর্যন্ত মিনিট আটেক পর মাঠ ছাড়লেও, তার আগে মাঠের বাইরে ব্রিটিশ রানী কুইন এলিজাবেথ টু-র জন্য নির্ধারিত লাল গালিচায় গিয়ে বসে পড়েন। কর্নার ফ্ল্যাগে থাকা ব্রিটিশ পতাকা ধরে মুচড়ে দেন। ক্ষুব্ধ দর্শক রাত্তিনের দিকে বোতল নিক্ষেপ করে।
এ ঘটনার জেরেই পরে ভাষাগত এই জটিলতা কাটাতে ফিফা সার্বজনীন ইঙ্গিত হিসেবে হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের প্রচলন করে বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭০ থেকেই বিশ্বকাপ লাল ও হলুদ কার্ডের ব্যবহার দেখেছে।
যা-ই হোক, ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে জয় তুলে নেয়। কিন্তু বিতর্কের ওখানেই শেষ নয়। ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামসে তার খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেন, ‘জানোয়ার’ আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে যাতে কেউ জার্সি না বদলায়! ম্যাচের পর প্রেস কনফারেন্সে এ নিয়ে রামসে বলেন, ‘ট্যাকলিং করা নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু ওরা যে গায়ে জ্বালা ধরানো কাজগুলো করেছে – থুথু দেওয়া, ঘাড়ের দিকের ছোট চুল ধরে টান দেওয়া, কান টানা…। ওরা ভয় ধরাতে চাইছিল। সমস্যাটা হচ্ছে, ওরা যখন বুঝতে পারল যে ওদের ইচ্ছামতো সবকিছু হবে না, ওরা আমার এ পর্যন্ত সবচেয়ে জঘন্য সব কাণ্ড করা শুরু করে দিল।’
ওই ম্যাচের কারণে বিতর্কিত আর্জেন্টাইন অধিনায়ক রাত্তিন আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১৯৫৯ থেকে দশ বছর খেলেছেন, ১৯৬২ ও ১৯৬৬ দুই বিশ্বকাপেই ছিলেন। গত পরশু– শনিবার– ৮৯ বছর বয়সে মারা যান রাত্তিন, যে কারণে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বাহুতে সুইজারল্যান্ড ম্যাচে কালো বন্ধনী দেখা গেছে। রাত্তিনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরই নিশ্চিত হয়, তার আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে খেলবে, যেখানে অপেক্ষায় সেই ইংল্যান্ড।