ads

আমির খানের বিয়ে, কেন আলোচনায় লাভ জিহাদ?

আমির খানের বিয়ে, কেন আলোচনায় লাভ জিহাদ?
প্রতীকী ছবি

বলিউড তারকা আমির খান আবার বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন তিনি। বিয়ে তিনি করতেই পারেন। সে আলাপে গিয়ে আমাদের কাজ নেই। আমরা কথা বলতে চাই লাভ জিহাদ নিয়ে। প্রেমিকা গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করার পরপরই আমির খানের বিরুদ্ধে ‘লাভ জিহাদের’ অভিযোগ তুলেছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বজরং দল’। তাদের অভিযোগ, বারবার হিন্দু নারীদের বিয়ের মাধ্যমে আমির আসলে হিন্দু সংস্কৃতিকে নষ্ট করছেন।

গত ৫ জুলাই আমির খান মুম্বাইয়ের নিজ বাসভবনে এক ছোট ও সাদামাটা আয়োজনে গৌরি স্প্র্যাটকে বিয়ে করেছেন। দুজনের মধ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ে কিন্তু কোনো ধর্মীয় রীতিতে হয়নি। হয়েছে ‘স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট’-এ। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা নাখোশ। নাখোশ অবশ্য সেই প্রথম বিয়ে থেকেই। মুসলিম হয়ে তিনি কেন হিন্দু নারী বিয়ে করবেন!

ভারতে বর মুসলিম, আর কনে হিন্দু হলেই লাভ জিহাদের অভিযোগ ওঠে। কী এই ‘লাভ জিহাদ’? অনেকের মতে, এটি একটি ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বা ‘কন্সপিরেসি থিওরি’। প্রধানত মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস, মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে। বিয়ের পর জোর করে তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে নেয়। এই প্রক্রিয়াটিকে একটি সংগঠিত জনসংখ্যাগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখে ডানপন্থী হিন্দুরা।

১৯২১-২২ সালের দিকে কেরালার মালাবার অঞ্চলে একটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। বিদ্রোহটি ইতিহাসে ‘মালাবার বিদ্রোহ’ হিসেবে পরিচিত। এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিল প্রধানত মুসলিম কৃষকরা। তাদের লড়াইটা মূলত ছিল হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে। তখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের নির্যাতন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং হিন্দু নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। এই সংঘাতের জেরে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের আরো অবনতি হয়। ১৯২৮ সালে আর. দায়ালু নামে একজন একটি কবিতা লিখে ফেললেন। পরে কবিতাটি নিষিদ্ধও হয়েছিল। সেই কবিতায় কবি ভারতে নারীদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মাধ্যমে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথিত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন।

২০১৩ সালে মুজাফফরনগর দাঙ্গা লাভ জিহাদের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এক মুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী হিন্দু জাট সম্প্রদায়ের এক তরুণীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। পরে ঘটনাটিতে লাভ জিহাদের রং মাখা হয়। দাবি করা হয়, হিন্দু নারীদের লক্ষ্য করে মুসলিম পুরুষরা বিশেষ অভিযানে নেমেছে। যদিও তদন্ত করে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সবশেষে, ২০২৩ সালের ৫ মে মুক্তি পায় সুদীপ্ত সেন পরিচালিত সিনেমা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’। সিনেমায় দেখানো হয়, মুসলিম পুরুষরা কীভাবে হিন্দু ও খ্রিস্টান নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। ছবিতে আরও দাবি করা হয়, কেরালার ৩২ হাজার নারী মুসলিম পুরুষদের ফাঁদে পড়ে নিখোঁজ এবং পরে আইএস-এর মতাদর্শে দীক্ষিত হয়। বিজেপিসহ রাজনৈতিক নেতারা ছবিটির প্রতি সমর্থন জানান। ১৫-২০ কোটি রুপি বাজেটের এই সিনেমা বড় কোনো তারকা ছাড়াই ৫৬ কোটি রুপির বেশি আয় করে। যদিও ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ‘আল্ট নিউজ’ ৩২ হাজার নারী নিখোঁজ হওয়ার দাবির পেছনে কোনো সত্যতা পায়নি।

‘লাভ জিহাদ’ সত্য হোক বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব–তাতে কিছুই যায় আসে না। যা হওয়ার, তা হচ্ছেই। এর মাধ্যমে জাতিবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষকে চাঙা করা যায়। আর ভারতের রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ায় তা ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হরহামেশাই নেওয়া যাচ্ছে, ফলে সমাজ সবসময় বিপদের ঝুঁকিতে থাকছে। শুধু তাই নয়, তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ থেকে সুরক্ষার নামে হিন্দু নারীদের স্বাধীনতা হরণ ও নিয়ন্ত্রণ করার পথও খোলা রাখা হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন। ২০১২ সালে উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে একটি খাপ পঞ্চায়েত নারীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ, গ্রামের নীতিনির্ধারকরা মনে করতেন, মুসলিম মালিকানাধীন মোবাইল ফোনের দোকানগুলো হিন্দু নারী ও মুসলিম পুরুষদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে দিচ্ছে।

‘লাভ জিহাদ’ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘হেইট ক্রাইম’কে বারবার উসকে দিচ্ছে। ২০১৭ সালে রাজস্থানের আফরাজুল খান হত্যাকাণ্ড তারই উদাহরণ। তাকে কুপিয়ে হত্যার পর তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়েও দেওয়া হয়েছিল। সেই ভিডিওতেই দাবি করা হয়েছিল, লাভ জিহাদ ঠেকাতে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

প্রাপ্তবয়স্ক যে কারো স্বাধীনভাবে নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার ও স্বাধীনতা আছে। ভারতের আইনও তা মঞ্জুর করে। কোনো বিয়েকে লাভ জিহাদের তকমা দেওয়া বা লাভ জিহাদের জিকির তুলে সহিংসতা করাকে কোনো দেশের আইন বৈধতা দেয় না। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে সংবিধান আছে, আদালত আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, তারা দেখবে। আইনের বাইরের যে কোনো কিছুই সমাজকে ভারসাম্যহীন করে তুলতে বাধ্য। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের প্রতি সম্মান এবং নাগরিক সচেতনতাই পারে যেকোনো উগ্রবাদকে রুখে দিতে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, ৭ ডিসেম্বর ২০১৭

gnet-research.org, ২১ জুন ২০২৩

hauterrfly.com, ১২ জুলাই ২০২৬

সম্পর্কিত