ads

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

ড্রোন তৈরিতে তাক লাগাচ্ছে জার্মানির ছোট্ট স্টার্টআপ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ড্রোন তৈরিতে তাক লাগাচ্ছে জার্মানির ছোট্ট স্টার্টআপ
জার্মানির ছোট কোম্পানি হেলসিং ক্ষিপ্র গতির ড্রোন বানাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময় জুড়ে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদী ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল সব সামরিক প্রকল্প। লকহিড মার্টিন কিংবা নর্থরোপ গ্রুম্যানের মতো বিশালাকার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান কিংবা সাবমেরিন কিনতে পশ্চিমা সরকারগুলোকে শত শত কোটি ডলার খরচ করতে হতো এবং একেকটি সামরিক সরঞ্জাম হাতে পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো।

উদাহরণস্বরূপ, একটি সাধারণ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পেছনেই কোটি কোটি ডলারের বাজেট বরাদ্দ করতে হয়। তবে বর্তমান সময়ে এসে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা অর্থনীতিতে এক আমূল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সস্তা, চটপটে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত হয়ে উঠছে, যার মূল কৃতিত্ব কোনো সরকারি গবেষণাগারের নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে গড়ে ওঠা সিলিকন ভ্যালি ঘরানার স্টার্ট-আপ কোম্পানিগুলোর।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এআই গভর্নেন্স বিষয়ক সিনিয়র গবেষক আলেকজান্ডার ব্লানচার্ডের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা অর্থনীতিতে এখন এক বিশাল রূপান্তর ঘটছে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ও বাস্তব উদাহরণ হলো জার্মানির মিউনিখ-ভিত্তিক স্টার্ট-আপ কোম্পানি ‘হেলসিং এসই’, যা বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে মূল্যবান এআই প্রতিরক্ষা স্টার্ট-আপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই কোম্পানিটি কীভাবে নামমাত্র মূল্যে নিখুঁত এআই চালিত যুদ্ধযন্ত্র তৈরি করে আধুনিক যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়কে নতুন রূপ দিচ্ছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রতিরক্ষা ব্যয়ের এই নতুন ধারাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশাল সামরিক বাজেট বরাদ্দ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পেন্টাগনের আগামী বছরের জন্য প্রস্তাবিত দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেটের মধ্যে প্রায় পঞ্চান্ন বিলিয়ন ডলারই রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ চালকহীন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত একটি নতুন অস্ত্রাগার বা আর্সেনাল তৈরির জন্য। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও খুব বড় আকারে না হলেও প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ইউরোর একটি পাইলট প্রোগ্রাম চালু করেছে যার একমাত্র লক্ষ্য হলো এআই প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন করা। এই বাজেটগুলো আগামী দিনে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এর ফলেই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতটি বর্তমানে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

হেলসিং-এর মতো ছোট কিন্তু অত্যন্ত ক্ষিপ্র প্রতিরক্ষা স্টার্ট-আপগুলো প্রচলিত অনমনীয় ও ধীরগতির সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে। তারা সিলিকন ভ্যালির মতো দ্রুত ও অচিন্তনীয় উদ্ভাবনী কৌশল ব্যবহার করছে। বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন প্যালানটির, টেসলা, অ্যাপল এবং মেটা থেকে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিবিদদের নিজেদের সংস্থায় নিয়ে আসছে এবং শত শত কোটি ডলারের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পুঁজি সংগ্রহ করছে।

তাদের মূল লক্ষ্য হলো মাত্র সাড়ে সতেরো হাজার ইউরোর মধ্যে এমন সব আধুনিক যুদ্ধযন্ত্র বা ড্রোন গণহারে উৎপাদন করা, যা পরিচালনা করতে ন্যূনতম সামরিক লোকবল লাগবে এবং মাত্র এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই সৈন্যরা তা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ড্রোনগুলো কেবল পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউক্রেনের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি শত্রুর গোলার আগুনের মধ্যে এগুলো সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।

পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা মিউনিখ-ভিত্তিক এই স্টার্ট-আপ কোম্পানিটি কীভাবে সামরিক বাহিনীর অর্থ ব্যয়ের ধরন বদলে দিচ্ছে, তা তাদের জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলের একটি গোপন কারখানার অভ্যন্তরীণ চিত্র থেকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়।

জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি শান্ত ও নিরিবিলি শহরতলির শিল্পাঞ্চলের ভেতরে হেলসিং-এর এই গোপন ড্রোন কারখানাটি অত্যন্ত কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কারখানাটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কঠোর যে এর মূল গেটে বা দেওয়ালে হেলসিং কোম্পানির কোনো নাম বা লোগো ব্যবহার করা হয়নি, এমনকি ওই শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য ভাড়াটিয়ারাও জানে না যে তাদের ঠিক পাশেই একটি আধুনিক অস্ত্রের কারখানা রয়েছে।

কোম্পানিটির কর্মকর্তাদের ভয় যে, এই কারখানাটি যেকোনো মুহূর্তে রাশিয়ার হামলার মূল লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। কারণ এখান থেকে তৈরি হওয়া হাজার হাজার ড্রোন ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের মাটিতে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি মোতায়েন করা হয়েছে। এই কারখানাটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা ও নমনীয়তা। কোনো ধরনের বড় হুমকি বা হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে মাত্র এক দিনের নোটিশে পুরো কারখানাটি সম্পূর্ণ ভেঙে অন্য কোথাও স্থানান্তরিত করা সম্ভব।

এই কারখানায় বর্তমানে প্রায় একশ শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ সম্প্রতি জার্মানির ধুঁকতে থাকা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাকরি হারিয়ে এখানে যোগ দিয়েছেন। এই শ্রমিকদের প্রত্যেককে নিয়োগ দেওয়ার আগে অত্যন্ত কঠোর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরাপত্তা স্ক্রিনিং বা ভেটিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং তারা সবাই কোম্পানির গোপনীয়তা রক্ষার কঠোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। কারখানার একটি দেওয়ালে তাদের মোটিভেশনাল স্লোগান হিসেবে পেইন্ট করে লেখা রয়েছে ‘গণতন্ত্রকে রক্ষা করা’।

গত বছর হেলসিং-এর তৈরি ইউরোপা কমব্যাট জেট। ছবি: রয়টার্স
গত বছর হেলসিং-এর তৈরি ইউরোপা কমব্যাট জেট। ছবি: রয়টার্স

২০২১ সালে যখন স্পোটিফাই-এর প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল এক-এর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের প্রাথমিক অর্থায়নে হেলসিং-এর তিন প্রতিষ্ঠাতা এই যাত্রা শুরু করেন। তখন তাদের একটাই মাত্র লক্ষ্য ছিল। আর তা হলো রাশিয়ার তরফ থেকে আসা যেকোনো সামরিক হুমকি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রতিহত করা।

কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সহ-প্রধান নির্বাহী ড. গুন্ডবার্ট শেরইফ, যিনি এর আগে জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং ম্যাককিনসের পার্টনার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান যে, রাশিয়ার হুমকির জরুরি বিষয়টি তাদের কাছে শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের প্রতিরক্ষাকে আরও শক্তিশালী ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। তবে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেন আক্রমণের তখনও এক বছর বাকি থাকায় প্রাথমিক দিনগুলোতে ইউরোপের বিনিয়োগকারীরা প্রতিরক্ষা খাতে টাকা ঢালতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক ছিলেন এবং সে সময় এই খাতে পুঁজি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ ছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল ও আমূল পরিবর্তন ঘটে, যার পেছনে কেবল ইউক্রেন যুদ্ধই নয়, বরং মার্কিন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও বড় ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইউরোপকে তাদের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করার জন্য ক্রমাগত চাপ এবং গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো বারবার দেওয়া হুমকি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেটকে অনেক উপরে তুলতে সাহায্য করেছে। এর পরপরই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির স্টার্ট-আপগুলোতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের জোয়ার আসে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা হেলসিং-এর সাম্প্রতিকতম ফান্ডিং রাউন্ডে অংশ নেওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন, যার পরিমাণ প্রাথমিকভাবে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে এবং এর ফলে বর্তমানে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারে। লাইটস্পিডের মতো বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা ইতিমধ্যে হেলসিং-এ ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, তাদের মতে এই বাজারের সুযোগ ও সম্ভাবনা বিপুল এবং কোনো একটি একক কোম্পানির পক্ষে এই পুরো বাজার দখল করা সম্ভব নয়।

বিনিয়োগকারীদের জন্য হেলসিং-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এবং কৌশলগত সুবিধাটি আসছে ইউক্রেনের মাটিতে চলমান অত্যন্ত কঠিন ও নির্মম যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। ২০২৪ সালের শেষের দিক থেকে হেলসিং ইউক্রেনে হাজার হাজার ড্রোন মোতায়েন করেছে, যা কোম্পানিটিকে যুদ্ধের বাস্তব ও অমূল্য তথ্যের এক বিশাল ডেটা সোর্স এনে দিচ্ছে। ইউক্রেনীয় সৈন্যরা তাদের প্রতিটি ড্রোন হামলার ভিডিও রেকর্ড করে তা মিশনের সাফল্য ও ব্যর্থতা বিশ্লেষণের জন্য হেলসিং-এর কাছে পাঠায়, যার ওপর ভিত্তি করে কোম্পানির প্রকৌশলীরা প্রতিনিয়ত তাদের এআই সফটওয়্যার আপডেট করতে পারছেন।

এই প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এখানে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটোই অনেক বেশি। ইউক্রেন থেকে আসা যুদ্ধের ভিডিওগুলোতে এক ধরণের ইঁদুর-বেড়াল খেলা বা তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। হেলসিং-এর তৈরি এইচএক্স-২ নামক কামিকাজে বা লয়টারিং মুনিশন ড্রোনটি যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চক্কর কাটতে পারে। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রাশিয়ার অত্যন্ত ক্ষুদ্র লক্ষ্যবস্তু, যেমন ব্যাটারি সিস্টেম বা সাঁজোয়া যানগুলোকে নিখুঁতভাবে চিনে নিতে পারে। এরপর বহু মাইল দূরে নিরাপদ বাঙ্কারে বসে থাকা ইউক্রেনীয় সৈন্যরা যখন সংকেত দেয়, তখন ড্রোনটি তীব্র গতিতে নিচে নেমে এসে শত্রুর সেই হুমকিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

হেলসিং-এর তৈরি ড্রোন। ছবি: সংগৃহীত
হেলসিং-এর তৈরি ড্রোন। ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হেলসিং-এর এই ড্রোনের মিশন সাফল্যের হার প্রায় ৭০ শতাংশ, যা আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গৌরবজনক একটি বিষয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সিগন্যাল ব্লক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও হেলসিং-এর এআই সফটওয়্যার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা জ্যামিংয়ের মুখেও ড্রোনটিকে সচল রাখে। যদি রাশিয়ার জ্যামাররা ড্রোনের জিপিএস বা যোগাযোগ ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবুও ড্রোনের ভেতরে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে নিয়ে সেখানে আঘাত করতে পারে।

লন্ডনের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম প্লুরাল-এর পার্টনার এবং অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী খালেদ হ্যালোউই অকপটে স্বীকার করেছেন যে, হেলসিং-এর মতো এমন নিখুঁত নিজস্ব ক্ষমতা সম্পন্ন এআই প্রযুক্তি আর কোনো পশ্চিমা কোম্পানির কাছে নেই। তবে হেলসিং কেবল এই ছোট ড্রোনের মধ্যেই তাদের উদ্ভাবন সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং তাদের পরবর্তী বড় চমক তৈরি হচ্ছে মিউনিখ থেকে গাড়িতে প্রায় ৯০ মিনিটের দূরত্বের একটি বিমানঘাঁটিতে। সেখানে কোম্পানির বিমান প্রকৌশলীরা তৈরি করছেন তাদের প্রথম চালকহীন ফাইটার জেট, যার নাম দেওয়া হয়েছে সিএ-১ ইউরোপা। হালকা ও শক্তিশালী কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি এই অত্যাধুনিক চালকহীন জেট বিমানটি ২০২৯ সালের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত হবে এবং এটি রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সীমান্তের অনেক গভীরে গিয়ে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।

সিএ-১ ইউরোপা জেটের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত সরল কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী। একটি সাধারণ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, তাত্ত্বিকভাবে সেই একই খরচের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ দিয়ে হেলসিং শত শত ইউরোপা জেট বিমান তৈরি করতে পারবে। যুদ্ধের সময় তারা একটি চালকহীন জেট বিমানকে প্রথমে পাঠাতে পারে শত্রুর ইলেকট্রনিক জ্যামিং নেটওয়ার্ক ধ্বংস বা জ্যাম করার জন্য, এবং তার ঠিক পরপরই পাঠাতে পারে আরও বেশ কয়েকটি অ্যাটাক জেট বিমান। এই চালকহীন বিমানগুলো এফ-৩৫ জেটের মতোই নিখুঁত ও নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্রে সজ্জিত থাকবে।

হেলসিং-এর এয়ার প্রোগ্রামের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিফানি লিংগেম্যানের মতে, যখন একটি যুদ্ধবিমানে কোনো মানব পাইলট থাকে না, তখন সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মিশন পরিচালনা করতে পারে। কারণ সেখানে কোনো মানুষের জীবন বাঁচানোর বা হারানোর ভয় থাকে না। এই কৌশলগত সমীকরণটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতিনির্ধারকদের কাছেও অত্যন্ত পরিষ্কার। মার্কিন নেভাল ইনস্টিটিউটে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এই মাসেই মন্তব্য করেছেন যে, ড্রোন ও স্বায়ত্তশাসিত সামরিক ব্যবস্থা হলো বর্তমান প্রজন্মের যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী উদ্ভাবন।

তবে এই খাতের এই অতি-দ্রুত উত্থান এবং বিপুল সংখ্যক প্রতিরক্ষা স্টার্ট-আপের আগমন বাজারে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত কোলাহলের সৃষ্টি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত বা নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে গুন্ডবার্ট শেরইফ মনে করেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, অতিরিক্ত নতুন কোম্পানির আগমনের ফলে সরকার ও সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত কার্যকরী প্রযুক্তি চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও, সামরিক বিশেষজ্ঞদের সিংহভাগই বিশ্বাস করেন যে মানববিহীন ও এআই চালিত যুদ্ধের এই চাহিদা নিকট ভবিষ্যতে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

হেলসিং-এর ড্রোন কারখানার বিশাল স্টোরেজ রুমে তাকালে ইউরোপের আগামী দিনের সম্ভাব্য বড় সংঘাতের রূপরেখা পরিষ্কার দেখা যায়। সেখানে স্তূপ করে রাখা ড্রোনের বাক্সগুলো কেবল ইউক্রেনে পাঠানোর জন্য নয়। তার একটি বড় অংশ প্রস্তুত করা হচ্ছে বেলারুশ সীমান্তের কাছে লিথুয়ানিয়ায় মোতায়েন করা যুদ্ধ-প্রস্তুত জার্মান ব্রিগেডের জন্য।

এমনকি জার্মানির পার্লামেন্টও এই সপ্তাহেই হেলসিং-এর সাথে ২২০ মিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল সামরিক চুক্তি অনুমোদন করেছে। যার আওতায় কোম্পানিটি জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য বিস্তৃত পরিসরের এআই সিস্টেম তৈরি করবে। প্রতিরক্ষা খাতে এই ধরণের বেলুনের মতো ফুলে ওঠা সামরিক ব্যয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সুসংবাদ ও বিপুল মুনাফা বয়ে আনলেও, এটি সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন ও অন্ধকার সময়ের সংকেত দিচ্ছে। গবেষক আলেকজান্ডার ব্লানচার্ডের চূড়ান্ত মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই বিপুল সামরিক প্রস্তুতির মূল কারণ হলো ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা ধরে নিয়েছেন যে তারা খুব শিগগিরই ইউরোপের মাটিতে একটি বড় ধরণের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন; কারণ কোনো দেশই আগামী দিনে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিময় ভবিষ্যতের আশা করে নিজেদের অস্ত্র শিল্পের এত বিশাল ও অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি ঘটায় না।

সম্পর্কিত