ads

ফরেন পলিসির নিবন্ধ

চীনের নতুন যুদ্ধবিমান নিয়ে বিশ্ব জানে বেশি, যুক্তরাষ্ট্রেরটা কেন এখনো রহস্য?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চীনের নতুন যুদ্ধবিমান নিয়ে বিশ্ব জানে বেশি, যুক্তরাষ্ট্রেরটা কেন এখনো রহস্য?
ছবি: এআই

সাবমেরিন থেকে চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। তবে গত ৬ জুলাই হওয়া এই পরীক্ষাটি আসলে কীসের ইঙ্গিত, তা নিয়ে বিভ্রান্তির মাঝেই একটি আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি কি জেএল-২ ছিল নাকি জেএল-৩?

ওপেন-সোর্স নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরা যে এই প্রশ্নটি তুলতে পারছেন, তা থেকেই স্পষ্ট হয় যে, চীনের সেনাবাহিনী সম্পর্কে কত নিখুঁত প্রযুক্তিগত তথ্য এখন গবেষকদের হাতে রয়েছে। মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, আজকের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সাথে প্রায়ই পুরনো কোল্ড ওয়ারের তুলনা করা হয়। তবে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল সামরিক বাহিনীর ওপর নজর রাখা বর্তমান চীনের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও অস্পষ্ট ছিল। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পুরনো পদ্ধতিগুলো কিন্তু এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর বিপজ্জনক নজরদারি চালানো ইউ-২ স্পাই প্লেনের আধুনিক সংস্করণগুলো এখনো মার্কিন বিমান বাহিনী ব্যবহার করছে। তবে কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য এই পুরনো পদ্ধতিগুলোর পাশাপাশি, ইন্টারনেটে সহজে পাওয়া যায় এমন তথ্য এখন অনেক বেশি সাহায্য করছে।

গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণের কাজ একসময় কেবল সরকার এবং বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোই করত। কিন্তু তথ্য বিপ্লবের ফলে এখন ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা উন্মুক্ত তথ্যের দারুণ বিকাশ ঘটেছে এবং বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের একটি বড় কমিউনিটি তৈরি হয়েছে। তাদের এই সূক্ষ্ম অনুসন্ধান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেকোনো দেশের সবচেয়ে বড় সামরিক আধুনিকীকরণ সম্পর্কে আমাদের চেনা ধারণা বদলে দিচ্ছে। 

চীন সবসময়ই তাদের সামরিক শক্তি দেখাতে পছন্দ করে। বেশ ধুমধাম করেই নতুন সব প্রযুক্তি সবার সামনে নিয়ে আসে। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পূর্তির সামরিক প্যারেড বিশ্লেষকদের জন্য তথ্যের এক বিশাল খনি ছিল।

কখনো কখনো এই সরকারি ভিডিওগুলো থেকে ধারণার চেয়েও বেশি তথ্য পাওয়া যায়। চীনের সেনাবাহিনীর প্রকাশ করা ভিডিওগুলোর একদম ছোটখাটো বিষয়ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়। এমনকি ভিডিওর পেছনের অংশের সামান্য দৃশ্য থেকেও অনেক কিছু জানা সম্ভব। এর মাধ্যমে ভিডিওটি ঠিক কোন জায়গার তা দ্রুত বের করে ফেলা যায়, যা থেকে বোঝা যায় যে নতুন সামরিক সরঞ্জামগুলো কোথায় রাখা হয়েছে।

চীনের কড়া ইন্টারনেট সেন্সরশিপ বা গ্রেট ফায়ারওয়াল থাকা সত্ত্বেও, বিভিন্ন সাধারণ মানুষের মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ইন্টারনেটে চলে আসে। যেমন, ওপর দিয়ে যাওয়া যাত্রীবাহী বিমানের যাত্রীরা প্রায়ই সাংহাইয়ের নৌঘাঁটির ছবি তোলেন। এই ছবিগুলো থেকে চীনের নতুন যুদ্ধজাহাজের নকশা কেমন হবে, তা জানা যায়।

তেমনই একটি ছবিতে দেখা গেছে, চীনের পরবর্তী বিমানবাহী জাহাজটি সম্ভবত পরমাণু শক্তিতে চলবে। কারণ জাহাজের ভেতরে দুটি চারকোনা ফাঁকা অংশ রয়েছে, যা দেখতে হুবহু পারমাণবিক চুল্লির পাত্রের মতো।

ইউ ২ স্পাই প্লেন। ছবি: রয়টার্স
ইউ ২ স্পাই প্লেন। ছবি: রয়টার্স

আবার কিছুদিন আগে একটি বিমানঘাঁটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক গাড়ি চালকের ড্যাশক্যামের ভিডিওতে অত্যন্ত গোপনীয় নতুন যুদ্ধবিমানের ল্যান্ডিংয়ের দৃশ্য ধরা পড়ে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান সম্পর্কে আমরা বেশি তথ্য জানি। কারণ চীনের তৈরি দুটি পরীক্ষামূলক যুদ্ধবিমানের প্রচুর ছবি ইন্টারনেটে চলে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৪৭ যুদ্ধবিমানটি এখনো পুরোপুরি রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে।

এই ছবিগুলো ইন্টারনেটে পোস্ট হওয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, চীনের ফায়ারওয়াল বা ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। তবে এমনো হতে পারে যে এর পেছনে কর্তৃপক্ষের কিছু গোপন সম্মতিও থাকতে পারে।

চীনা প্রশাসন হয়তো ইচ্ছে করেই এই অনানুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশের বিষয়টিকে এড়িয়ে যায়, কারণ তারা এর মূল্য বোঝে। সর্বোপরি, যারা এই ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়, সেই ইনফ্লুয়েন্সাররা মূলত জাতীয়তাবাদ এবং দেশের অগ্রগতি দেখানোর ইচ্ছা থেকেই এটি করে থাকে।

অবশ্য এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামরিক বাহিনী নিয়ে অতি উৎসাহীরা নিজে থেকেই সতর্কতা বা সেন্সরশিপ মেনে চলেন। তারা ছবি পোস্ট করার সময় বিমানের সিরিয়াল নম্বর এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য ঝাপসা করে দেন।

প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রগুলো থেকে সামরিক বাহিনীর কাজে লাগার মতো নতুন নতুন বিষয় জানা যাচ্ছে। তবে ওপেন-সোর্স তথ্যের আরেকটি বড় উৎস হলো স্যাটেলাইটের ছবি।

এখন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চালানো অনেক সস্তা হয়ে গেছে এবং এগুলোর ছবির মানও অনেক ভালো। ফলে এই ধরনের স্যাটেলাইট তথ্য এখন আর শুধু সরকারের একার নিয়ন্ত্রণে নেই।

টাকা খরচ করতে পারলে প্ল্যানেটল্যাবস, ভ্যান্টর ও ব্ল্যাকস্কাইয়ের মতো কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট জায়গার স্যাটেলাইট ছবি এনে দেয়।

অন্যদিকে, ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের আর্থএক্সপ্লোরার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সেবা দেয়, যা নাসার মাধ্যমে নিয়মিত আপডেট করা হয়। এই উন্মুক্ত স্যাটেলাইট ছবির কারণে সাধারণ গবেষকেরাও চীনের যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি থেকে শুরু করে বেইজিংয়ের বাইরে চীনের বিশাল নতুন সামরিক সদর দপ্তর তৈরির মতো সব বড় বড় নির্মাণকাজের ওপর অনায়াসে নজর রাখতে পারছেন।

শুধু চীনই যে নিজেদের মতো করে তথ্য ছড়াতে বা লুকাতে চায়, তা নয়। ওপেন-সোর্সের এই সুবিধা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা স্বাধীন বিশ্লেষকেরা যখন চীনের কোনো অজানা সামরিক ঘাঁটি বা অস্ত্রের স্যাটেলাইট ছবি সবার সামনে নিয়ে আসে, তখন একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। তা হলো- হয়তো মার্কিন সরকারই তাদের একটু ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ঠিক কোথায় খুঁজলে এই ছবি পাওয়া যাবে।

চীনের সেনাবাহিনী সম্পর্কে ওপেন-সোর্স তথ্যের সহজলভ্যতার ফলে এখন অনেক নতুন নতুন সংস্থা ও সাধারণ মানুষও এটি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন র‍্যান্ড করপোরেশন, চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউট, জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজ এবং চায়না মেরিটাইম স্টাডিজ ইনস্টিটিউট-এর বিশেষজ্ঞরা এই ক্ষেত্রে দারুণ কিছু কাজ করছেন।

এর পাশাপাশি রিক জো, আন্দ্রেয়াস রুপ্রেখ্ট এবং অ্যালেক্স লাকের মতো স্বাধীন বিশ্লেষকেরাও চীনের নৌঘাঁটি ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট ছবি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সেসবের খুঁটিনাটি বের করে আনছেন।

ডিজিটাল যুগে জ্ঞান এবং দক্ষতা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি তারই একটি চমৎকার উদাহরণ। ইন্টারনেটের কারণে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটছে, আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের ফলে তথ্য বিপ্লবকে এখন অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন।

তবে চীনের সামরিক বাহিনীর ওপর নজর রাখার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট মূলত তার শুরুর দিকের রূপেই কাজ করছে, যেমনটা এর আবিষ্কারকেরা চেয়েছিলেন। এটি ঠিক যে এখানেও ভুল তথ্য আর প্রচারণার ছড়াছড়ি রয়েছে, তবে এটি তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিচ্ছে।

ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পদবী না থাকলেও সাধারণ বিশেষজ্ঞদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং তথ্যের ওপর গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের একক আধিপত্য কমে আসছে।

চীনের সামরিক বাহিনী (পিপল’স লিবারেশন আর্মি) নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা এখন যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তির এমন সব তথ্য পাচ্ছেন যা দেখে স্নায়ুযুদ্ধর সময়ের সোভিয়েত গবেষকেরা হিংসা করতেন। কিন্তু সামরিক রণকৌশল, নীতি বা রসদ সরবরাহের মতো ভেতরের বিষয়গুলো জানার সুযোগ এখনো অনেক সীমিত।

মার্কিন সামরিক চিন্তাভাবনা বোঝার জন্য গবেষকদের কাছে প্রচুর জার্নাল ও ম্যাগাজিন রয়েছে, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রকাশনা খুবই কম। এটি চীনের সামরিক বাহিনী নিয়ে গবেষণার একটি বড় দুর্বলতা বা ব্লাইন্ড স্পট।

এই কারণেই চীনের ওপেন-সোর্স বিশ্লেষকদের বেশির ভাগ অগ্রগতি তাদের সামরিক সক্ষমতা বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু তাদের আসল নিয়ত কী, তা বোঝা কঠিন। এখানে আমরা সমস্যাকে দুই ভাগে ভাগ করতে পারি- ধাঁধা ও রহস্য।

ধাঁধার একটি নির্দিষ্ট উত্তর থাকে যা নতুন তথ্য দিয়ে সমাধান করা যায়, যেমন-চীনের কাছে কয়টি বোমারু বিমান আছে? অন্যদিকে রহস্যের কোনো নিশ্চিত উত্তর থাকে না এবং নতুন তথ্য পেলেও তা পরিষ্কার হয় না; যেমন– চীন এই বিমানগুলো দিয়ে কী করার পরিকল্পনা করছে?

পিপল'স লিবারেশন আর্মি। ছবি: রয়টার্স
পিপল'স লিবারেশন আর্মি। ছবি: রয়টার্স

আবার ইউক্রেন ও রাশিয়ার কথাই ধরা যাক।

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ এটি প্রমাণ করে যে, শত্রুর ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলেই সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

মার্কিন গোয়েন্দাদের স্পষ্ট প্রমাণ ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও, অনেক ইউক্রেনীয় এবং ইউরোপের বড় একটি অংশ বিশ্বাসই করতে চায়নি যে রাশিয়া সত্যিই আক্রমণ করবে। যার ফলে, মস্কো ঠিকই আকস্মিক হামলার সুবিধা পেয়ে যায়।

এশিয়ার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। তাইওয়ান আক্রমণ করার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা ঠিক কতটুকু, তা আমাদের বেশ ভালো করেই জানা আছে।

বেইজিং তাদের স্বল্পপাল্লার রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি কোনোভাবেই লুকিয়ে রাখতে পারছে না, এবং তারা যে আক্রমণে বেসামরিক ফেরি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে, তারও স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এমনকি গত বছর একটি ভ্রাম্যমাণ বার্জ বহরের ছবিও দেখা গেছে, যা দিয়ে চীন সমুদ্রসৈকত পার করে বিপুল সংখ্যক ভারী যানবাহন তীরে নামাতে পারবে।

তাছাড়া, তাইওয়ানে আক্রমণ করতে গেলে মাসের পর মাস প্রস্তুতি এবং বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম আগে থেকেই মোতায়েন করার প্রয়োজন হবে। আজকের এই উন্মুক্ত তথ্যের যুগে চীনের পক্ষে এসব লুকিয়ে রাখা অসম্ভব।

তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ যেমনটা দেখিয়েছে আর কি, প্রস্তুতি দেখতে পাওয়ার মানেই কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়।

চীনের ক্ষমতা বা সক্ষমতা যাচাই করার চেয়ে তাদের উদ্দেশ্য বোঝাটা যেমন বেশি কঠিন, তেমনই এটি বেশি জরুরিও বটে।

যেকোনো দেশের সামরিক সক্ষমতা গড়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে, তাই সেটি সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, একটি দেশের আসল উদ্দেশ্য যেকোনো মুহূর্তে হুট করে বদলে যেতে পারে।

একটি দেশ তাদের সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে ঠিক কী করতে চায়, তা বোঝার জন্য সরঞ্জামগুলোর কার্যক্ষমতা জানা দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনের সেনাবাহিনী এখন তাইওয়ানের দিকে বেশি মনোযোগ দিলেও, তারা এমন সব যুদ্ধজাহাজ ও বিমান তৈরি করছে যা ঘরের কাছের লড়াইয়ের চেয়ে দূরের এলাকায় শক্তি প্রদর্শনের জন্য বেশি উপযোগী।

এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী, ক্রুজার, বড় আকারের রসদবাহী ও উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং দূরপাল্লার বোমারু বিমান। এগুলো তাইওয়ান সংকটে ব্যবহার করা গেলেও, অনেক দূরের কোনো অভিযানে এগুলো আরও বেশি কার্যকর।

চীন অনেক আগেই মাও সেতুংয়ের মতো বিদেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব ছড়ানোর চিন্তা বাদ দিয়েছে। কিন্তু তাদের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা দেখলে বোঝা যায়, তাদের উদ্দেশ্য শুধু নিজেদের রক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

এক্ষেত্রে যেকোনো বিদেশি শক্তির সামরিক উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করার সময় প্রখ্যাত স্থপতি ওয়াল্টার গ্রোপিয়াসের ‘ফর্ম ফলোস ফাংশন’ সূত্র মেনে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তায় চীনের সামরিক আধুনিকীকরণের প্রভাব নিয়ে ফরেন পলিসি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা দেখিয়েছে, দূরপাল্লার হামলায় চীন কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তবে এই শক্তি দিয়ে চীন ঠিক কী করতে চায়- সে বিষয়ে তারা ‘ইচ্ছে করেই’ কোনো কথা বলেনি।

তা সত্ত্বেও, ওই রিপোর্ট দেখে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চটেছে। গ্লোবাল টাইমসের খবর অনুযায়ী চীন দাবি করেছে, “একটি বড় দেশ মানেই সে অন্য দেশের ওপর খবরদারি করতে চাইবে-এমন একটি পুরনো ও চেনা ছকে এই রিপোর্টে চীনকে বিচার করা হয়েছে।” তারা একে একটি ‘মস্ত বড় ভুল ধারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইচ্ছে করেই হোক আর ভুল করেই হোক, চীন এখানে আসলে সক্ষমতা আর উদ্দেশ্য-এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছে বলে দাবি করেছে ফরেন পলিসি।

ওই রিপোর্টে শুধু দেখানো হয়েছে চীন কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তারা কেন এমনটা করবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। তবে চীনকে নিয়ে কারো ভাবনা যেমনই হোক না কেন, এই ধরনের বিশ্লেষণমূলক কাজ কিন্তু খুবই জরুরি।

কারণ যেকোনো ভালো পরিকল্পনা সবসময় সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়। যারা চীনের সামরিক শক্তিকে খুব কাছ থেকে দেখছেন তা গবেষক, বিশ্লেষক বা সামরিক অনুরাগী যে-ই হোন না কেন, তারা সবাই এই কাজের গুরুত্ব বোঝেন। তবে তারা এটাও জানেন যে, বেইজিং এই নতুন শক্তি দিয়ে আসলে কী করার পরিকল্পনা করছে, তা শুধু এই ধরনের তথ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত