ads

ঢাকা ডুবে গেলে একজন নাগরিকের কেন কান্না পায়?

ঢাকা ডুবে গেলে একজন নাগরিকের কেন কান্না পায়?
টানা বৃষ্টিতে ডুবেছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়ক। ছবি: চরচা

‘আপনি তো আমাকে নামায় দিলেন, ভাড়াও নিলেন। কিন্তু আমার তো যাইতেই হবে। সেটা যাব কেমনে?’

মালিবাগ রেলগেটে রোববার দুপুরে এক ব্যাটারি রিকশার চালককে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছিলেন জরুরি কাজে বের হওয়া একজন নারী। ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের অবশ্য উত্তর এলো না। উল্টো চালক সরিয়ে দিলেন প্লাস্টিকের চাদর। ওই নারী তখন ভাড়া মিটিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বৃষ্টিবিঘ্নিত রাজধানীর রাস্তায় ‘যুদ্ধ’ করার!

ওই চালক আর যাবেন না। কেন? কারণ হলো, সামনে উন্মুক্ত জলরাশি। তাতে ঢেউও খেলছে বেশ। ওতে ওনার রিকশার ব্যাটারিচালিত ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর একবার সেসব নষ্ট হলে গচ্চা যাবে অনেকগুলো টাকা। দিন আনি দিন খাইয়ের জীবনে কে এত ঝুঁকি নিতে চায়?

তবে যাদের রাস্তায় না নেমে কোনো উপায়ই নেই, তাদের আর বাছবিচার করা চলে না। এই ঢাকা শহরে চাকরির জীবন কাটায় অসংখ্য মানুষ। একটি বিশালসংখ্যক মানুষকে তো প্রতিদিনের আয় সেদিনই করতে হয়। তাদের তাই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় নামার উদ্যোগ নিতে হয়। কিছু করার তো থাকে না আসলে। তাই বৃষ্টি তাদের কাছে বিলাসের কোনো বস্তু নয়। বরং ঢাকা শহরে হওয়া ঝুম বৃষ্টি বরং তাদের পেটে লাথি মারে সজোরে!

দুই-তিনদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো জোরেশোরে– বৃষ্টি চলছেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরও আশার কথা শোনাচ্ছে না খুব একটা। বরং ভারী, মাঝারি বা হালকা– বৃষ্টি থাকছেই ‘কমন’ হিসেবে। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত থেকে রাজধানীতে শুরু হয় বৃষ্টি। আজ রোববার সকালে ধানমন্ডি, মিরপুর, মৌচাক, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার, মতিঝিল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক পানিতে ডুবে থাকতে দেখা গেছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অফিসগামীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষেরা।

বিপাকে বলা হলো ঠিকই, কিন্তু চিত্র আসলে আরও করুণ। চরম অসহায় অবস্থায় অনেকটা কেঁদে ফেলার মতোই। রাস্তা আর দেখা যাচ্ছে না পানির প্রাবল্যে। রিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি বা পাবলিক বাস– সবই আটকাচ্ছে রাস্তায়। কোনো কোনো মানুষ উপায় না থাকাতেই হাঁটছে। কারণ যানবাহন ভাড়া করা একটা কঠিনতম কাজে পরিণত হয়েছে।

মালিবাগ রেলগেটে রোববার দুপুরে এক ব্যাটারি রিকশার চালককে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছিলেন জরুরি কাজে বের হওয়া একজন নারী। ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের অবশ্য উত্তর এলো না। উল্টো চালক সরিয়ে দিলেন প্লাস্টিকের চাদর। ওই নারী তখন ভাড়া মিটিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বৃষ্টিবিঘ্নিত রাজধানীর রাস্তায় ‘যুদ্ধ’ করার! ছবি: রয়টার্স
মালিবাগ রেলগেটে রোববার দুপুরে এক ব্যাটারি রিকশার চালককে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছিলেন জরুরি কাজে বের হওয়া একজন নারী। ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের অবশ্য উত্তর এলো না। উল্টো চালক সরিয়ে দিলেন প্লাস্টিকের চাদর। ওই নারী তখন ভাড়া মিটিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বৃষ্টিবিঘ্নিত রাজধানীর রাস্তায় ‘যুদ্ধ’ করার! ছবি: রয়টার্স

রোববার সকালের দেখা একটা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা যাক। একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। তিনি যাবেন মগবাজারের একটি হাসপাতালে। কিন্তু কোনো রিকশা তাকে নিচ্ছে না। যারা নিতে নিমরাজি, তারাও চাইছে আকাশছোঁয়া ভাড়া। যেমন: ৫০ টাকার রিকশাভাড়া চাওয়া হচ্ছে ১৫০ টাকা! ২০০ টাকার সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া হাঁকা হচ্ছে ৫০০!

তো, মানুষটা একটা পর্যায়ে সব ধরনের যানবাহন ভাড়া করার চেষ্টা চালিয়ে একেবারেই ভেঙে পড়লেন যেন। কেউ যেতেই চায় না, আবার কেউ এমন হতাশাময় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আরে, আমি হাসপাতাল যাব রে ভাই…।’ যদিও তার এই আকুতিতে কেউ সেভাবে সাড়া দিল না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন রাস্তার একপাশে, একা।

হ্যাঁ, ঢাকা ডুবে গেলে নাগরিকেরা অসহায় হয়ে এমন একাই হয়ে পড়ে একেবারে। মনে হয়, এই দুনিয়া যেন শ্বাপদসংকুল কেবল। মানুষই ঘোরে চারপাশে, কিন্তু মনে হয়, তারা যেন কারও পকেটের দিকে চেয়ে আছে, কাটার অপেক্ষায়। এমনিতেই বৃষ্টির দিনে চলাচলের ভাড়া বাড়ে, বেশি রোদেও বাড়ে। সেসব দিতেও হয় যাত্রীদের। কিন্তু আজ যেন কেউ মানে না মানা! যেমন, আজ রোববার, ঢাকা ডুবে যাওয়ার দিনটিতে, ব্যাটারি রিকশার রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে বলে তুমুল দর হাঁকাচ্ছে পায়ে টানা রিকশা। এই অভাগার কাছ থেকে ৬০ টাকার ভাড়া ১৫০ নেওয়া রিকশাচালকের বক্তব্য হলো– ‘একটা দিন আজকে। কিছুই চলে না। আজকে আমরা ভাড়া বেশিই নিমু। একটা দিনই তো!’

দিন একটাই। কথা হয়তো ঠিক। কিন্তু এই একদিনেই যে ঢাকা শহরের নাগরিকেরা কতটা অসহায় ও অপমানিত বোধ করেন, তা হয়তো কেউ বুঝতে যায় না। ন্যূনতম নাগরিক অধিকারের কবর রচনার দিনে যখন দুর্ভোগ মাথা পেতে নিতে নাগরিকদের বাধ্য করা হয়, তখন সেই নতমাথায় অন্তত কোনো সম্মান অবশিষ্ট থাকে না। অবশ্যই এত কথা যানবাহন নিয়ে যেহেতু হলো, তাই হয়তো মনে হতেই পারে যে, এসবের চালকেরাই ভিলেন। কিন্তু আসলে তারাও একটি দুষ্টচক্রের মধ্যেই আটকা। তাদেরও যান নষ্ট হয়, রাস্তায় আটকে থাকে, অযথা বিপদ হয় এমন তুমুল দুর্যোগে। কারণ কোনো রাজধানী শহর যে এভাবে পানিতে ডুবে পদ্মা, যমুনা হয়ে যেতে পারে, এবং তেমনটা হলে আসলে কি করণীয়– সেটি সম্পর্কে কারোরই কোনো ধারণা নেই।

শনিবার রাত থেকে রাজধানীতে শুরু হয় বৃষ্টি। ছবি: রয়টার্স
শনিবার রাত থেকে রাজধানীতে শুরু হয় বৃষ্টি। ছবি: রয়টার্স

ধারণা কে দেবে? অবশ্যই সরকার দেবে। দুটো সিটি করপোরেশনও আছে। কিন্তু কোনো সমাধান কখনো দেখা যায় না। আগেও সমাধান হয়নি, এখনও হয় না। ভবিষ্যত নিয়েও আশা করার অবকাশ কম। কারণ এতদিনেও যেহেতু হয়নি, কে হওয়ার আশা করবে? কার এত বুকের পাটা?

অথচ কত কত সরকার গেল এই দেশটায়। কত কত নেতারা ঢাকা শহরের মেয়র হলেন। বিএনপি–আওয়ামী লীগ, নির্বাচিত–অনির্বাচিত—সব ধরনের সরকারই এই ঢাকার নাগরিকেরা দেখে ফেলল। নানা বদলের অঙ্গীকার শুনল। কেউ ডিজিটাল সরকার গড়ল, কেউ ম্যানুয়াল। কিন্তু রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের, বর্জ্য অপসারণের বেহাল অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। তাই রাজধানীবাসীর অসহায় বোধ করারও কোনো শেষ নাই।

যদিও সংকটগুলো একই থেকে গেছে। সেই কবে থেকে শোনা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা হয় খালের অভাবে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ নির্মাণ ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন অবকাঠামোর কারণে। অন্তত মোটাদাগে এগুলোই। কিন্তু বছরের পর বছর নাগরিকেরা শুধু আশ্বাস শুনেই যায়। কোনো কিছুরই সমাধান হয় না। সমস্যার মূলে কেন যেন কোনো কর্তৃপক্ষই যেতে চায় না। ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং রাজউকসহ একাধিক সংস্থা ঢাকার পানি নিষ্কাশনের দায়িত্বে থাকলেও, তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকে না। ফলে ঢাকা নিয়মিত বিরতিতে কেবলই ডোবে, সাথে মানুষদেরও ডোবায়। এই রাজধানী শহরের নাগরিকেরা তাই এখনও ভালো নেই, আগেও কখনো ভালো ছিল না। ভালো থাকা নিয়ে রাজনীতি করতে চাইলে অবশ্য নানা কিছুই বলা যায় ফেসবুক, ইনস্টায়। কিন্তু ভার্চুয়াল মন্তব্য দিয়ে তো আর রাস্তার পানি কমে না।

বৃষ্টির পরিমাণ কমলে ঢাকা নিশ্চয়ই একসময় ভেসে উঠবে। কর্তাব্যক্তিরা এমন দুর্ভোগের কথা আবার অবলীলায় ভুলেও যাবেন। সেই সাথে প্রতিশ্রুতির ভাণ্ডারও নিশ্চয়ই ভ্যানিশ হয়ে যাবে। তবে হারিয়ে যাবে না কেবল একটি অনুভূতি। সেটি হলো অপমানের, অসহায়ত্বের যূথবদ্ধ নাগরিক অনুভব। সেই অনুভূতির মধ্যে থাকে তুমুল দুর্যোগে রাস্তায় নামার ভয়, বাধ্যতামূলকভাবে ভয়কে জয় করে অবশেষে রাস্তায় নামা, নামার পর অসহায়ত্ব ও অপমানের ‘জুতার মালা’ বাধ্যতামূলকভাবে গলায় জাপটে নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

অবশ্য প্রকৃতি তার সন্তানদের এতটা নিচুও হতে দিতে চায় না। তাই পালানোর পথ রাখার চেষ্টা করে। হয়তো সে কারণেই অঝোরে ঝরে বৃষ্টি। ওতে যে কান্নাও আর আলাদা করা যায় না!

ঢাকার নাগরিকদের জন্য সেটিই হয়তো একমাত্র স্বস্তি।

অর্ণব সান্যাল: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত