ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না পেরে ভিন্ন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের
ফারহাদ পাশাভান্দ
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৯: ১৭
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল তৈরি করছে। ওয়াশিংটন মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক ফ্রন্টসমূহ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর জোট গঠনকে একটি একক কৌশলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। সম্প্রতি তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উপস্থিতি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো রুটিন কূটনৈতিক বৈঠক ছিল না। এর গভীরে রয়েছে ইরান এবং তার সমর্থিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসেব-নিকেশের একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পেরেছে যে, সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সরাসরি চাপ ইরানের আচরণ বা ক্ষমতার কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে সরাসরি সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র একটি বহুমুখী, সংকর বা হাইব্রিড মডেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি, দেশটির সীমান্ত অঞ্চলের পরিবেশ পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক জোট গঠন এবং আঞ্চলিক সংকটগুলোর পুনর্গঠনকে একটি সুসংহত কৌশলে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন এই নতুন কৌশলের মূল ভিত্তি হলো ইরানকে কোনো একটি একক বড় আঘাতের মাধ্যমে কাবু না করে, বরং বিভিন্ন স্তরে একসাথে একাধিক সংকটের সৃষ্টি করে একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতির মুখোমুখি করা। এর মূল উদ্দেশ্য কেবল ইরানের বাহ্যিক ক্ষতি বৃদ্ধি করা নয়, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা তাদের বেশির ভাগ শক্তি ও মনোযোগ অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, সীমান্ত সমস্যা এবং আঞ্চলিক চাপ সামাল দিতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। অভ্যন্তরীণ স্তরে এই কৌশলটি ইরানের সামাজিক চাপকে তীব্র করা এবং জনগণের সহনশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার ওপর নির্ভর করছে।
মার্কিন এই পরিকল্পনার লক্ষ্য কেবল সাময়িক অসন্তোষ বা তীব্র সংকট তৈরি করা নয়, বরং জ্বালানি, পানি, পরিবহন এবং অন্যান্য সংবেদনশীল সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে দেশটির শাসনব্যবস্থার ব্যয় ও সংকট বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই অভ্যন্তরীণ সংকট যখন সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত হবে, তখন তেহরানের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিদিনের সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে মোড় নিতে বাধ্য হবে।
এই অভ্যন্তরীণ চাপকে পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে ইরানের চারপাশের সীমান্ত ও আঞ্চলিক পরিবেশের রূপান্তর ঘটানো জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আঞ্চলিক পরিস্থিতি এমনভাবে পুনর্গঠন করতে চায় যা একই সাথে কয়েকটি ফ্রন্টে তেহরানকে ব্যস্ত রাখবে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ব্যাপক সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা অভিযান সত্ত্বেও হিজবুল্লাহকে আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ থেকে মুছে ফেলা যায়নি। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুতি আন্দোলন) তাদের আঞ্চলিক অবস্থান ত্যাগ করেনি। ইরাকে প্রতিরোধের সাথে যুক্ত শক্তিগুলোকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়নি।
এই ব্যর্থতাগুলো ওয়াশিংটনকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে যে, ইরানের চারপাশের পরিবেশকে পুনর্গঠন না করে তেহরানকে দুর্বল করা অসম্ভব। এই কাঠামোর মধ্যে তিনটি পরিপূরক পথ চিহ্নিত করা হয়েছে: প্রথমত, ইরানের পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অস্থিতিশীলতার পকেটগুলো সক্রিয় করে সীমান্ত বলয়ের মধ্যে ইরানকে ব্যস্ত রাখা। দ্বিতীয়ত, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ তীব্র করা। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে এমন একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করা যা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে পিছিয়ে দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এই যুক্তির আলোকেই ইরানের সংবেদনশীল অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নোডগুলোতে সীমিত বা সুনির্দিষ্ট অপারেশনগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর কৌশলগত নকশার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
তুরস্কের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ফোরাম ছিল না। বরং এটি ছিল ইরানের ফাইলটিকে পশ্চিমা নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর সাথে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক বিরোধের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এটিকে পশ্চিমা জোটের একটি সম্মিলিত উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করতে চাইছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটো কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং এটি ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও আদর্শগতভাবে একত্রিত করার একটি হাতিয়ার।
আঙ্কারার সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি মূলত চারটি আন্তঃসংযুক্ত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছে। প্রথম উদ্দেশ্য হলো ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোট গঠনকে সুসংহত করা, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বাণিজ্য রুটগুলোর স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলোকে সম্পূর্ণ এক করা সম্ভব হয়। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ও পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় যে প্রভাব ফেলে, তা ওয়াশিংটনকে ইউরোপীয় উদ্বেগগুলোর সাথে ইরান-বিরোধী অগ্রাধিকারের যোগসূত্র স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। তবে কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অবস্থান ইঙ্গিত করে যে এই ঐকমত্য এখনও অপূর্ণ এবং ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখার এই মার্কিন অভিযানে ইউরোপকে পুরোপুরি অংশীদার করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সামনে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্পের উপস্থিতির দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি বৈধতা তৈরি করা। ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে যে ইরানের বিরুদ্ধে একক পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি, তাই তারা এই আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে যেকোনো পরবর্তী পদক্ষেপকে একটি যৌথ এবং প্রতিরক্ষামূলক বর্ণনার মধ্যে রাখতে চায়।
তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো তুরস্কের সাথে সমন্বয় সাধন এবং এর সীমান্ত ও আঞ্চলিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো। আঙ্কারাকে দেওয়া যেকোনো মার্কিন ছাড় মূলত ইরানকে ঘিরে থাকা পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জাতিগত ও নিরাপত্তা গতিশীলতাকে মার্কিন আঞ্চলিক নকশায় সক্রিয় করার প্রচেষ্টার অংশ।
চতুর্থ উদ্দেশ্যটি হলো লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ বাড়াতে সিরিয়ার ভূখণ্ড ও ক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্কের ফাইলগুলোকে একটি একক সুসংহত কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করে, তবে এই চারটি উদ্দেশ্যকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো মূলত ইরান এবং প্রতিরোধের অক্ষের ওপর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চাপ বাড়ানোর একটি একক শৃঙ্খলের অংশ।
এই মূল ক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি আঞ্চলিক সংকটকে এই একই কৌশলগত নকশার অধীনে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলি সরকার এখন হামাসের রাজনৈতিক প্রশাসনের সংঘাতের চেয়েও এগিয়ে গিয়ে কাজ করছে। তথাকথিত নিরাপত্তা বাফার জোন বা হলুদ অঞ্চলের বাইরে পুনর্গঠনের বিরোধিতা করে ইসরায়েল এখন সেখানে একটি নতুন জনসংখ্যাগত এবং আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করতে চাইছে, যাতে গাজাকে একটি ক্লান্ত, সীমিত ও অবরুদ্ধ পরিবেশে রূপান্তর করে তারা তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ পশ্চিম তীরের দিকে সরাতে পারে। পশ্চিম তীরে তাদের লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা আনা, প্রতিরোধকে দমন করা এবং একে সংঘাতের একটি টেকসই কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে না দেওয়া।
একইভাবে ইয়েমেনে আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের নতুন ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ প্রায় আট মাস আগে একটি ‘ইয়েমেন ডেস্ক’ গঠন করেছিল যা তাদের গোয়েন্দা ও কার্যক্ষমতার হিসেব-নিকেশে এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রমাণ করে। অদূর ভবিষ্যতে ইয়েমেনে মার্কিন ও ইসরায়েলিদের লক্ষ্যভিত্তিক যৌথ বিমান হামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে এই ফ্রন্টটিকেও ইরানের বিরুদ্ধে বহুমুখী চাপের একটি প্রধান কেন্দ্র করে তোলা হতে পারে। ইরাকেও প্রতিরোধের সাথে যুক্ত বাহিনীকে দুর্বল করার মার্কিন এজেন্ডা আগের মতোই বহাল রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে পুনর্গঠন করার একটি বহুমাত্রিক নকশাকে নির্দেশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন ও জটিল কৌশলটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। বিগত বছরগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মার্কিন ও ইসরায়েলিদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক সমর্থন এবং জটিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি, স্থানীয় কন্ডিশন এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গভীর সংকল্পের কারণে তাদের পূর্ববর্তী বহু নকশাই ব্যর্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
উপরন্তু, ইরান ও ইরাকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিম এশিয়ায় একটি প্রকৃত ও টেকসই শৃঙ্খলা বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কোনো বাহ্যিক আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃত্রিম নকশার মাধ্যমে তৈরি হয় না। বরং তা গড়ে ওঠে এই অঞ্চলের জাতিসমূহের সামাজিক ইচ্ছা, প্রতিরোধের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং যেকোনো ধরনের আধিপত্যবাদের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া গভীর বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে।
অতএব, ওয়াশিংটন যদিও ইরান ও প্রতিরোধের অক্ষের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য আরও জটিল ও বহুমুখী নকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবুও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নির্দেশ করে যে এই প্রকল্পটি তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা, ক্লান্তি ও চূড়ান্ত পরাজয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, পশ্চিম এশিয়ায় উদীয়মান নতুন শৃঙ্খলা কখনোই মার্কিন ইচ্ছার ফসল হতে পারে না। বরং এটি হবে বাহ্যিক চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন প্রকল্পের বিপরীতে এই অঞ্চলের জনগণের নিজস্ব ও গভীরভাবে প্রোথিত একটি স্বাধীন ব্যবস্থার উত্থান।
ফারহাদ পাশাভান্দ:আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
(এই লেখাটি আলজাজিরার সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল তৈরি করছে। ওয়াশিংটন মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক ফ্রন্টসমূহ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর জোট গঠনকে একটি একক কৌশলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। সম্প্রতি তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উপস্থিতি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো রুটিন কূটনৈতিক বৈঠক ছিল না। এর গভীরে রয়েছে ইরান এবং তার সমর্থিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসেব-নিকেশের একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পেরেছে যে, সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সরাসরি চাপ ইরানের আচরণ বা ক্ষমতার কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। ফলে সরাসরি সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র একটি বহুমুখী, সংকর বা হাইব্রিড মডেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি, দেশটির সীমান্ত অঞ্চলের পরিবেশ পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক জোট গঠন এবং আঞ্চলিক সংকটগুলোর পুনর্গঠনকে একটি সুসংহত কৌশলে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন এই নতুন কৌশলের মূল ভিত্তি হলো ইরানকে কোনো একটি একক বড় আঘাতের মাধ্যমে কাবু না করে, বরং বিভিন্ন স্তরে একসাথে একাধিক সংকটের সৃষ্টি করে একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতির মুখোমুখি করা। এর মূল উদ্দেশ্য কেবল ইরানের বাহ্যিক ক্ষতি বৃদ্ধি করা নয়, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা তাদের বেশির ভাগ শক্তি ও মনোযোগ অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, সীমান্ত সমস্যা এবং আঞ্চলিক চাপ সামাল দিতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। অভ্যন্তরীণ স্তরে এই কৌশলটি ইরানের সামাজিক চাপকে তীব্র করা এবং জনগণের সহনশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার ওপর নির্ভর করছে।
মার্কিন এই পরিকল্পনার লক্ষ্য কেবল সাময়িক অসন্তোষ বা তীব্র সংকট তৈরি করা নয়, বরং জ্বালানি, পানি, পরিবহন এবং অন্যান্য সংবেদনশীল সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে দেশটির শাসনব্যবস্থার ব্যয় ও সংকট বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই অভ্যন্তরীণ সংকট যখন সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত হবে, তখন তেহরানের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিদিনের সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে মোড় নিতে বাধ্য হবে।
এই অভ্যন্তরীণ চাপকে পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে ইরানের চারপাশের সীমান্ত ও আঞ্চলিক পরিবেশের রূপান্তর ঘটানো জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আঞ্চলিক পরিস্থিতি এমনভাবে পুনর্গঠন করতে চায় যা একই সাথে কয়েকটি ফ্রন্টে তেহরানকে ব্যস্ত রাখবে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ব্যাপক সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা অভিযান সত্ত্বেও হিজবুল্লাহকে আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ থেকে মুছে ফেলা যায়নি। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুতি আন্দোলন) তাদের আঞ্চলিক অবস্থান ত্যাগ করেনি। ইরাকে প্রতিরোধের সাথে যুক্ত শক্তিগুলোকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়নি।
এই ব্যর্থতাগুলো ওয়াশিংটনকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে যে, ইরানের চারপাশের পরিবেশকে পুনর্গঠন না করে তেহরানকে দুর্বল করা অসম্ভব। এই কাঠামোর মধ্যে তিনটি পরিপূরক পথ চিহ্নিত করা হয়েছে: প্রথমত, ইরানের পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অস্থিতিশীলতার পকেটগুলো সক্রিয় করে সীমান্ত বলয়ের মধ্যে ইরানকে ব্যস্ত রাখা। দ্বিতীয়ত, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ তীব্র করা। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে এমন একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করা যা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে পিছিয়ে দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এই যুক্তির আলোকেই ইরানের সংবেদনশীল অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নোডগুলোতে সীমিত বা সুনির্দিষ্ট অপারেশনগুলোকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর কৌশলগত নকশার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
তুরস্কের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ফোরাম ছিল না। বরং এটি ছিল ইরানের ফাইলটিকে পশ্চিমা নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর সাথে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক বিরোধের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এটিকে পশ্চিমা জোটের একটি সম্মিলিত উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করতে চাইছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটো কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং এটি ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও আদর্শগতভাবে একত্রিত করার একটি হাতিয়ার।
আঙ্কারার সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি মূলত চারটি আন্তঃসংযুক্ত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছে। প্রথম উদ্দেশ্য হলো ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোট গঠনকে সুসংহত করা, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বাণিজ্য রুটগুলোর স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে ইউরোপের দেশগুলোকে সম্পূর্ণ এক করা সম্ভব হয়। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ও পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় যে প্রভাব ফেলে, তা ওয়াশিংটনকে ইউরোপীয় উদ্বেগগুলোর সাথে ইরান-বিরোধী অগ্রাধিকারের যোগসূত্র স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। তবে কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অবস্থান ইঙ্গিত করে যে এই ঐকমত্য এখনও অপূর্ণ এবং ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখার এই মার্কিন অভিযানে ইউরোপকে পুরোপুরি অংশীদার করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সামনে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
ট্রাম্পের উপস্থিতির দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি বৈধতা তৈরি করা। ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে যে ইরানের বিরুদ্ধে একক পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি, তাই তারা এই আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে যেকোনো পরবর্তী পদক্ষেপকে একটি যৌথ এবং প্রতিরক্ষামূলক বর্ণনার মধ্যে রাখতে চায়।
তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো তুরস্কের সাথে সমন্বয় সাধন এবং এর সীমান্ত ও আঞ্চলিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো। আঙ্কারাকে দেওয়া যেকোনো মার্কিন ছাড় মূলত ইরানকে ঘিরে থাকা পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জাতিগত ও নিরাপত্তা গতিশীলতাকে মার্কিন আঞ্চলিক নকশায় সক্রিয় করার প্রচেষ্টার অংশ।
চতুর্থ উদ্দেশ্যটি হলো লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ বাড়াতে সিরিয়ার ভূখণ্ড ও ক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্কের ফাইলগুলোকে একটি একক সুসংহত কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করে, তবে এই চারটি উদ্দেশ্যকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো মূলত ইরান এবং প্রতিরোধের অক্ষের ওপর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চাপ বাড়ানোর একটি একক শৃঙ্খলের অংশ।
এই মূল ক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি আঞ্চলিক সংকটকে এই একই কৌশলগত নকশার অধীনে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলি সরকার এখন হামাসের রাজনৈতিক প্রশাসনের সংঘাতের চেয়েও এগিয়ে গিয়ে কাজ করছে। তথাকথিত নিরাপত্তা বাফার জোন বা হলুদ অঞ্চলের বাইরে পুনর্গঠনের বিরোধিতা করে ইসরায়েল এখন সেখানে একটি নতুন জনসংখ্যাগত এবং আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করতে চাইছে, যাতে গাজাকে একটি ক্লান্ত, সীমিত ও অবরুদ্ধ পরিবেশে রূপান্তর করে তারা তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ পশ্চিম তীরের দিকে সরাতে পারে। পশ্চিম তীরে তাদের লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা আনা, প্রতিরোধকে দমন করা এবং একে সংঘাতের একটি টেকসই কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে না দেওয়া।
একইভাবে ইয়েমেনে আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের নতুন ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ প্রায় আট মাস আগে একটি ‘ইয়েমেন ডেস্ক’ গঠন করেছিল যা তাদের গোয়েন্দা ও কার্যক্ষমতার হিসেব-নিকেশে এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রমাণ করে। অদূর ভবিষ্যতে ইয়েমেনে মার্কিন ও ইসরায়েলিদের লক্ষ্যভিত্তিক যৌথ বিমান হামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে এই ফ্রন্টটিকেও ইরানের বিরুদ্ধে বহুমুখী চাপের একটি প্রধান কেন্দ্র করে তোলা হতে পারে। ইরাকেও প্রতিরোধের সাথে যুক্ত বাহিনীকে দুর্বল করার মার্কিন এজেন্ডা আগের মতোই বহাল রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে পুনর্গঠন করার একটি বহুমাত্রিক নকশাকে নির্দেশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন ও জটিল কৌশলটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। বিগত বছরগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মার্কিন ও ইসরায়েলিদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক সমর্থন এবং জটিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি, স্থানীয় কন্ডিশন এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গভীর সংকল্পের কারণে তাদের পূর্ববর্তী বহু নকশাই ব্যর্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
উপরন্তু, ইরান ও ইরাকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিম এশিয়ায় একটি প্রকৃত ও টেকসই শৃঙ্খলা বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কোনো বাহ্যিক আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃত্রিম নকশার মাধ্যমে তৈরি হয় না। বরং তা গড়ে ওঠে এই অঞ্চলের জাতিসমূহের সামাজিক ইচ্ছা, প্রতিরোধের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং যেকোনো ধরনের আধিপত্যবাদের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া গভীর বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে।
অতএব, ওয়াশিংটন যদিও ইরান ও প্রতিরোধের অক্ষের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য আরও জটিল ও বহুমুখী নকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবুও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নির্দেশ করে যে এই প্রকল্পটি তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা, ক্লান্তি ও চূড়ান্ত পরাজয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, পশ্চিম এশিয়ায় উদীয়মান নতুন শৃঙ্খলা কখনোই মার্কিন ইচ্ছার ফসল হতে পারে না। বরং এটি হবে বাহ্যিক চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন প্রকল্পের বিপরীতে এই অঞ্চলের জনগণের নিজস্ব ও গভীরভাবে প্রোথিত একটি স্বাধীন ব্যবস্থার উত্থান।