ads

ইরান সংকট ভারতের মুখোশ উন্মোচন করেছে

জুনায়েদ এস আহমদ
জুনায়েদ এস আহমদ
ইরান সংকট ভারতের মুখোশ উন্মোচন করেছে
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্র সাধারণত কোনো একটি আকস্মিক বা নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে আত্মহত্যা করে না। তারা মূলত বিষের প্রতি এক ধরনের স্বাদ বা আসক্তি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে সেটিকে নিজেদের ‘নীতি’ বলে আখ্যা দিয়ে এটি করে। তারা নৈতিক বর্বরতাকে ‘বাস্তববাদ’, বিচ্ছিন্নতাকে ‘স্বায়ত্তশাসন’ এবং ধার করা নৃশংসতাকে ‘শক্তি’ হিসেবে নতুন নামকরণ করে।

ইসরায়েল অত্যন্ত স্পষ্ট ও নগ্নভাবে এই অবক্ষয়টি প্রদর্শন করেছে। আর নরেন্দ্র মোদির ভারত এখন কেবল এর একজন সমালোচক নয়, বরং একজন শিক্ষানবিস বা অনুসারী হিসেবে হাজির হচ্ছে।

ট্র্যাজেডি বা দুঃখের বিষয় এটি নয় যে ভারতের নিজস্ব স্বার্থ আছে। সব গম্ভীর ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রেরই স্বার্থ থাকে। ট্র্যাজেডি হলো ভারত এখন তার স্বার্থকে একটি ভেঙে পড়া নৈতিক ব্যবস্থার সামনে হাঁটু গেড়ে বসার সমার্থক মনে করছে। একসময় ভারত বান্দুং সম্মেলন, উপনিবেশবাদ বিরোধী আন্দোলন, জোটনিরপেক্ষ নীতি, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং গ্লোবাল সাউথের মর্যাদার ভাষায় কথা বলত। সেই অতীত হয়তো একদম নিষ্কলঙ্ক ছিল না। তবে তার একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা ছিল।

ভারত বুঝতে পারত যে, নৈতিকতাহীন ক্ষমতা আসলে পতাকা হাতে এক ধরনের বর্বরতা মাত্র। আজ সেই ঐতিহ্যকে ড্রোন, স্পাইওয়্যার, কাউন্টার-টেরর স্লোগান এবং এমন একটি রাষ্ট্রের আলিঙ্গনে বন্ধক রাখা হচ্ছে, যার আঞ্চলিক নীতি অত্যন্ত সরল: প্রতিবেশীদের ওপর বোমা ফেলো, আর সেই ধোঁয়াকে নিরাপত্তা বলে চালিয়ে দাও।

ইসরায়েলের এই জাতীয় আত্মহত্যা কোনো গোপন বিষয় নয়। এটি নিজেকে স্বীকৃতি খোঁজা একটি রাষ্ট্র থেকে স্থায়ী যুদ্ধের উপাসনাকারী এক সেনাছাউনিতে পরিণত করেছে। গাজা উপত্যকা ইসরায়েলকে নিরাপদ করেনি, বরং একে নৈতিকভাবে অস্পৃশ্য করে তুলেছে। কোনো দেশ একটি অঞ্চলকে সন্ত্রস্ত করে, বন্দি জনগণকে ক্ষুধার্ত রেখে এবং শহরগুলোকে গুঁড়ো করে দিয়ে তার কূটনৈতিক পরিধিকে অস্ত্র ব্যবসায়ী, ধর্মান্ধ এবং ওয়াশিংটনের ক্লান্ত ভেটো ক্ষমতার মধ্যে সংকুচিত হতে দেখে অবাক হতে পারে না। ইসরায়েল যুদ্ধে সেভাবেই জয়ী হয়, যেভাবে একজন মানুষ ঘর পুড়িয়ে কোনো তর্কে জয়লাভ করে।

ভারতের এই অনুকরণ আরও কুৎসিত। কারণ ভারতের অন্য একটি গন্তব্য ছিল। এর আকার, স্মৃতি, সংস্কৃতি, জনসংখ্যা এবং গ্ল্যামার ছিল এবং ছিল সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক ঠিকাদার না হয়েও এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাথে কথা বলার উত্তর-ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব। তার বদলে নয়াদিল্লি স্বাধীন নেতৃত্বের কঠিন মহত্ত্বের চেয়ে তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের কাছাকাছি থাকার সস্তা রোমাঞ্চকে বেছে নিয়েছে। এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং এটি কৌশলগত বয়ঃসন্ধিকাল–একটি অন্ধকার ঘরে রোদচশমা পরে থাকার মতো পররাষ্ট্রনীতি।

ইরান সংকট ভারতের এই মুখোশটি উন্মোচন করে দিয়েছে। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম সংজ্ঞায়িত মুহূর্তে ভারতের কণ্ঠস্বরকে কোনো সভ্যতার শক্তির মতো নয়, বরং একটি ভীতু প্রেস বিজ্ঞপ্তির মতো শুনিয়েছে। যখন ওই অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে, তখন তারা ‘সংযম’, ‘সংলাপ’ ও ‘উত্তেজনা প্রশমন’-এর মতো কূটনৈতিক চেতনানাশক সরবরাহ করেছে। ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা যখন পদক্ষেপ নিয়েছে, ইরান যখন স্পষ্ট অবস্থান দাবি করেছে এবং পশ্চিমারা যখন তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে, তখন ভারত কেবল তার নতুন বিশেষত্ব প্রদর্শন করেছে: গণনায় থাকার মতো দৃশ্যমানতা, কিন্তু অবহেলিত হওয়ার মতো কাপুরুষতা।

এরপর এলো ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সাথে সংঘর্ষ: একটি সংক্ষিপ্ত ও কোলাহলপূর্ণ নাটক যেখানে অহংকার পদার্থবিজ্ঞানের মুখোমুখি হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক মহড়াগুলোতে যেভাবে হয়ে থাকে, এর বিবরণগুলো বিতর্কিতই রয়ে গেছে, তবে রাজনৈতিক ফলাফলটি ছিল দ্ব্যর্থহীন। অনায়াসে আধিপত্য বজায় রাখার যে আবহ ভারতের ছিল, তা পাংচার হয়ে গেছে। যে সরকার পেশিশক্তি বিক্রি করে, তারা আবিষ্কার করেছে যে টেলিভিশনের বাইসেপ বা পেশি কৌশলগত দক্ষতার সমতুল্য নয়। জাতীয়তাবাদ হয়তো স্টুডিওগুলো পূর্ণ করতে পারে, কিন্তু যখন যুদ্ধবিমান, বিমান প্রতিরক্ষা এবং উত্তেজনার সিঁড়িগুলো বাস্তবসম্মত প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন তা আর কার্যকর থাকে না।

একই সাথে ভারতের সফট পাওয়ার ভেতর থেকে ধ্বংস করা হচ্ছে। বলিউড একসময় এমন সব কক্ষে প্রবেশ করতে পারত যেখানে কূটনীতিকরাও পারতেন না। এটি আকাঙ্ক্ষা, রোমান্স, সংগীত এবং বৈশ্বিক স্বাচ্ছন্দ্য রপ্তানি করত। এখন তার বেশির ভাগই আদর্শিক দাসত্বের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে, যেখানে ঐতিহাসিক কল্পনা, সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষোভ এবং কোরিওগ্রাফ করা দেশপ্রেম শিল্পের ভান করছে। পুরোনো ভারত গান রপ্তানি করত; নতুন ভারত সাউন্ডট্র্যাকসহ স্লোগান রপ্তানি করে। এমনকি যোগব্যায়াম, যা শরীর, শ্বাস এবং মনের এক গভীর সাধনা, তাকেও আজ সভ্যতার পণ্য হিসেবে সংকুচিত করা হয়েছে– মুক্তিকে ব্র্যান্ডিং হিসেবে নতুন মোড়কে বিক্রি করা হচ্ছে।

সবচেয়ে গভীর পচনটি ধরেছে দেশের অভ্যন্তরে। একটি প্রজাতন্ত্র বিদেশে বহুত্ববাদের প্রচার করতে পারে না যখন সে নিজ দেশে দলবদ্ধ সহিংসতা, ধর্মান্ধতা এবং মুসলমানদের স্থায়ীভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে গণ্য করার মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়। গান্ধীর লড়াকু অহিংসা, নেহেরুর ত্রুটিপূর্ণ আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং ভারতের বহুত্ববাদী সভ্যতা কোনো জাদুঘরের ধ্বংসাবশেষ নয়। এগুলো ছিল কৌশলগত পুঁজি। এদের বিকৃত করা কেবল অন্যায়ই নয়, চরম বোকামিও বটে। ঠিক এই জায়গাতেই ভারত সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে ইসরায়েলকে অনুকরণ করছে।

ইসরায়েল মনে করে সহিংসতা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মুছে দিতে পারে। মোদির ভারত ক্রমশ ভাবছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য জাতীয় সংহতির বিকল্প হতে পারে। উভয়ই আসলে আধিপত্যবাদী কল্পনা। উভয়ই নিরাপত্তার চেয়ে দ্রুত শত্রু তৈরি করে। উভয়ই ভয়কে সম্মান মনে করে ভুল করছে। কিন্তু ভয় কখনো সম্মান নয়, এটি আসলে জমা রাখা বা স্থগিত ঘৃণা মাত্র।

এখানে পরিহাসটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ভারত এমন একটি রাষ্ট্রকে আলিঙ্গন করে মর্যাদা খুঁজছে যার নিজস্ব প্রকল্প তাকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, নৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু এবং সাম্রাজ্যবাদী সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। এটি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, এটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে এক ধরনের অভিনয় মাত্র। একটি মহান জাতি একটি বাঙ্কারের অনুকরণ করে মহান হতে পারে না। ভারতের ট্র্যাজেডি হলো এর কাছে এখনও মহত্ত্বের কাঁচামাল রয়েছে–মেধা, সংস্কৃতি, বিশালতা, কূটনীতি ও নৈতিক স্মৃতি। কিন্তু মহত্ত্বের জন্য প্রয়োজন আত্মসম্মান। আর আত্মসম্মানের জন্য প্রয়োজন আধুনিক বর্বরতা থেকে আলাদা থাকার সাহস।

ইসরায়েল বিশ্বকে দেখাচ্ছে কীভাবে একটি রাষ্ট্র বস্তুগতভাবে টিকে থেকেও রাজনৈতিকভাবে মারা যেতে পারে। ভারতের এই শিক্ষাটি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়া উচিত– কোনো নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল হিসেবে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে।

লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক

(এই লেখাটি মিডিল ইস্ট মনিটরের সৌজন্যে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত