ইতিহাস কখনো কখনো এত দ্রুত বাঁক নেয় যে, পুরনো মানচিত্র দিয়ে নতুন পথ চেনা যায় না। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা স্রেফ একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না, ছিল একটি দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্ব থেকে মুক্তির ঘোষণা।
সেই মুক্তির ঢেউ এখন আছড়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির পাথুরে উপকূলে। আর সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলও।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ যখন বললেন, “বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন এখন স্পষ্টতই শেষ”, তখন এটি কেবল একজন প্রাক্তন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে পড়লে ভুল হবে।
এটি আসলে এমন একটি পর্যবেক্ষণ, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বাস্তবতার অন্দরমহলে যারা উঁকি দিয়েছেন, তাদের কাছে অজানা ছিল না। কিন্তু এতদিন এই সত্য উচ্চারণের সাহস বা সুযোগ কারও ছিল না।
আধিপত্যের ভূগোল এবং তার ফাটল
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কটি সবসময়ই একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে বাস করেছে। একদিকে ১৯৭১ সালের রক্তের ঋণ, মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি, তিন দিক থেকে ঘেরা ভূগোলের বাস্তবতা, এই সব মিলিয়ে সম্পর্কটি ছিল অনিবার্য।
কিন্তু অনিবার্যতা এবং সমতা এক জিনিস নয়। বিগত দেড় দশকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের যে চরিত্র ছিল, তাকে সহযোগিতা বলার চেয়ে নির্ভরতা বলাই সঠিক। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ছিল একতরফা আনুগত্যের কাছাকাছি।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা নিয়ে এখন আর মুখ ঢেকে কথা বলার সময় নেই।
ট্রানজিট, নদীর পানি, বাণিজ্য ঘাটতি প্রতিটি ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান ছিল রক্ষণাত্মক, কখনো কখনো আত্মসমর্পণমূলক। এই পটভূমিতে আগস্ট ২০২৪ শুধু একটি সরকার বদলায়নি, বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মেরুদণ্ডের ভাষা।
এখন সেই হাসিনা ভারতে আশ্রিত। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়াদিল্লি আশ্রয় দিয়ে চলেছে।
ছবি: সংগৃহীতএটি কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় আইনি জটিলতা নয়, এটি দুই দেশের জনমানসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করেছে। ড্যানিলোভিচ ঠিকই বলেছেন, ইতিহাস ও ভূগোল দুই দেশকে বেঁধে রাখবেই। কিন্তু সেই বন্ধনের প্রকৃতি এখন আর আগের মতো থাকতে পারে না, থাকা উচিতও নয়।
বিএনপি সরকারের ‘ধীরে কিন্তু সুনির্দিষ্ট’ নীতি এই পরিপ্রেক্ষিতে আসলে একটি পরিপক্ব কৌশলগত বার্তা। এটি বিদ্বেষের রাজনীতি নয়, এটি সমতার দাবি এবং এই দাবিটি এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চেও স্বীকৃতি পাচ্ছে, যা নিজেই একটি বড় পরিবর্তন।
চীনের করিডোর, যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ এবং ঢাকার দাবার চাল
ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ এতদিন ছিল একটি নিষ্ক্রিয় ঘুঁটি। এখন সে হয়ে উঠতে চাইছে একটি সক্রিয় খেলোয়াড়। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব এই নতুন ভূমিকারই একটি প্রকাশ।
এই প্রস্তাবকে কেউ কেউ চীনের ফাঁদ হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন সুযোগ হিসেবে। কিন্তু প্রশ্নটা আসলে সেখানে নয়।
প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এমন একটি কূটনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেছে, যেখানে সে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখবে, আবার ওয়াশিংটনের সাথেও কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখবে?
ড্যানিলোভিচের বক্তব্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, এটি সম্ভব, যদি ঢাকা ‘চতুর ও দক্ষ কূটনীতি’ করতে পারে।
কিন্তু এই ‘চাতুর্য’-এর মধ্যে একটি বিপদও লুকিয়ে আছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখার খেলা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একটু এদিক-ওদিক হলেই স্বাধীন কূটনীতি পরিণত হয় নির্ভরযোগ্যতাহীন দোদুল্যমানতায়।
বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু সুযোগ নেই, আছে একটি গভীর দায়িত্বও। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
এটি সত্য। চীন সেই বিনিয়োগের একটি বড় উৎস, এটিও সত্য। কিন্তু শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সিপেক এই অঞ্চলেই আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিক করিডোর কীভাবে ধীরে ধীরে কৌশলগত নির্ভরতায় পরিণত হয়। ঢাকাকে তাই চোখ খোলা রেখেই এই পথে হাঁটতে হবে।
ছবি: এআইরোহিঙ্গা সংকট: মানবিকতার আড়ালে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা
রাখাইন করিডোর প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান আসলে দুটি বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার, যা বহন করা একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে আসছে, স্থানীয় সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো একটি অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো বিপর্যস্ত।
অন্যদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। এখনো অস্থির জান্তা এবং আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে। এই অস্থিরতার মাঝে রাখাইনে একটি মানবিক করিডোর স্থাপন করা মানে সরাসরি একটি সক্রিয় সংঘাত অঞ্চলে পা রাখা।
ড্যানিলোভিচ বলছেন, এই করিডোরের বিরুদ্ধে সমালোচনার অনেকটাই ‘ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’–এটি আংশিক সত্য হলেও পুরো সত্য নয়। কৌশলগত ঝুঁকিগুলো বাস্তব এবং সেগুলোকে উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
তবে এটিও সত্য যে, নিষ্ক্রিয়তাও একটি নীতি এবং সেটিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে বাংলাদেশ চিরকাল একটি মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটের বোঝা বহন করতে থাকবে।
তাই সঠিক প্রশ্ন হলো কীভাবে এই করিডোর বা যেকোনো উদ্যোগকে এমনভাবে কাঠামোবদ্ধ করা যায়, যাতে মানবিক লক্ষ্য অর্জিত হয়, কিন্তু কৌশলগত সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে?
অ্যাক্ট ইস্ট: সার্কের কবর এবং নতুন দিগন্তের সন্ধান
সার্ক এখন কার্যত একটি কাগুজে সংস্থা। ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব এই আঞ্চলিক জোটকে পঙ্গু করে রেখেছে বছরের পর বছর। এই স্থবিরতার মধ্যে বাংলাদেশের আসিয়ানমুখী হওয়ার প্রবণতা আসলে একটি যৌক্তিক বিবর্তন।
আসিয়ানের সদস্যপদ বা অংশীদারত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু বাণিজ্যিক সুবিধার প্রশ্ন নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নও।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই গতিশীল অর্থনৈতিক জোটে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ নিজেকে কেবল ভারতের প্রতিবেশী হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া একটি প্রতীকী কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি প্রমাণ করে, সঠিক নীতি এবং সক্রিয় কূটনীতি থাকলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের উচ্চতা নির্ধারণ করতে পারে।
ওয়াশিংটন-ঢাকা: নতুন সম্পর্কের স্থপতি কে?
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি বা কৌশলগত অংশীদারত্বের আলোচনা এখন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা আগে ছিল না।
ড্যানিলোভিচের আশাবাদ নিছক সৌজন্যমূলক নয়। ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে, দক্ষিণ এশিয়ায় একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বার্থের জন্য অনুকূল।
কিন্তু এখানে একটি সতর্কতার জায়গা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রহ’ সবসময় নিঃস্বার্থ হয় না। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করার একটি প্রবণতাও ওয়াশিংটনের আছে।
তাই ঢাকার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাগত জানানো, যেমনটা নিজের শর্তে করেছে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়া।
নতুন ভোরের দায়িত্ব
ড্যানিলোভিচের পর্যবেক্ষণ একটি বাস্তবতার স্বীকৃতি–ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের যুগ শেষ হচ্ছে। কিন্তু শূন্যস্থান কখনো শূন্য থাকে না।
সেই জায়গায় কে আসবে? চীন, আমেরিকা, নাকি বাংলাদেশ নিজেই, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সামনে একটি বিরল ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। পুরনো নির্ভরতার শৃঙ্খল ভেঙে, নতুন কোনো শৃঙ্খলে না জড়িয়ে, একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও বহুমাত্রিক কূটনীতি গড়ে তোলার সুযোগ।
এই পথ সহজ নয় ভুলের মাশুল দিতে হতে পারে। কিন্তু এই পথেই আছে একটি সার্বভৌম জাতির মর্যাদা।
ইতিহাস সুযোগ দেয় একবার। বাংলাদেশ কি এবার সেই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে? উত্তরটা ঢাকার টেবিলেই আছে, অপেক্ষা শুধু সঠিক সিদ্ধান্তের।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট