সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে সভরেন বা সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর চিন্তা করছে। অবশ্য এটি প্রথমবার নয়। এর আগেও একবার এমন চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। কিন্তু এবার বেশ জোরেশোরেই এ চিন্তা করা হচ্ছে। মূলত অভ্যন্তরীণ ঋণ কমানোর লক্ষ্যেই এ চিন্তা করছে সরকার। কিন্তু অর্থনীতিকে সঠিক পথে আনার লক্ষ্যে এ ধরনের উদ্যোগ বুমেরাং হবে না তো? নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করবে না তো?
এর আগে ২০১২ সালে প্রথম সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ঝুঁকি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সে পথ থেকে সরে আসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এবার বেশ জোরেশোরেই এ আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে। ফলে এ পথে এগোবার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফাইল ছবিএ ক্ষেত্রে নানা মুনী নানা মত দিচ্ছেন। কেউ বলছেন এটা ভালোই হবে। কেউ বলছেন এটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু আসলে কী?
সে আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রথমেই দেখা দরকার যে, সার্বভৌম বন্ড আসলে কী? সোজা বাংলায় কোনো দেশ তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে, বা বড় অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট সুদহারে বাজার থেকে টাকা আহরণ করার উপায় হিসেবে এই বন্ড বাজারে ছাড়ে। এ ক্ষেত্রে দেশটির সরকার নিজেই গ্যারান্টর হিসেবে থাকে। সরকারে যে বা যারাই আসুক বন্ডে বিনিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার টাকা বুঝে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।
সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে একটি দেশ দেশের ভেতর থেকে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও টাকা সংগ্রহ করতে পারে। এটি দুভাবেই হতে পারে, দেশটির নিজস্ব মুদ্রায় কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিবেচনা করলে এই বন্ড যেমন টাকায় হতে পারে, তেমনি হতে পারে ডলার বা ইউরোতে।
বাংলাদেশ সরকার এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। এ সম্পর্কিত প্রথম বৈঠকে এ নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে সরকার কম ঋণ করতে চাইছে। এটা নিশ্চিতভাবেই ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু ঋণ কি করবে না? করবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে।
প্রশ্ন হলো–এত দিন তো এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বা বিভিন্ন দাতা দেশ থেকে সরাসরি ঋণ নিত সরকার। এবার সেই বিকল্প রেখে কেন সার্বভৌম বন্ডের দিকে ঝুঁকছে সরকার? কারণ আর কিছুই নয়, উন্নয়ন সহযোগীদের তরফ থেকে সেভাবে সাড়া মিলছে না। এমনকি আইএমএফ তার প্রতিশ্রুত ঋণ ছাড় করছে না। ফলে এই পথে হাঁটার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
শুরুতে ২০২৯ সাল নাগাদ সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা থাকলেও চলতি অর্থবছরেই তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে মুডিস, ফিচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থার রেটিংকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক উল্লেখ করে এ সময়কেই মোক্ষম বলতে চাইছেন সার্বভৌম বন্ডের পক্ষাবলম্বনকারী অংশ। আরেকটি অংশ বলছেন, এটি বাড়তি ঝুঁকি তেরি করতে পারে। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখে নেওয়া যাক ঋণমান সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশকে কোন পর্যায়ে রেটিং দেওয়া হয়েছে।
ফিচ রেটিংস বাংলাদেশকে বি+ ক্যাটাগরিতে রেখেছে। বিশেষত লংটার্ম ফরেইন কারেন্সি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং বা আইডিআর-এর ক্ষেত্রে এই গ্রেড দেওয়া হয়েছে। আর দেশের সার্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’। বি+ ক্যাটাগরিতে পড়ার অর্থ হচ্ছে–বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সক্ষম হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ নাজুক, যা বাইরের চাপে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বাইরের চাপ কী? এটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, করোনা মহামারি, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার মতো যেকোনো বিষয়, যা পণ্য উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানিকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রায় কাছাকাছি রেটিং দিয়েছে মুডিস। তারা বাংলাদেশকে বি২ ক্যাটাগরিতে ফেলেছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অপ্রতুলতা, কাঠামোগত দুর্বলতা–এই সবকিছুকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ, ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানাচ্ছে মুডিস।
দুটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বন্ড কম আকর্ষণীয় হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বন্ড ছেড়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করতে হলে উচ্চ সুদহার দিতে হতে পারে। আর এই উচ্চসুদহার পরে বোঝা হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

বলে রাখা ভালো যে, সার্বভৌম বন্ডে কোনো বিনিয়োগকারী মূলত রাষ্ট্রের তরফ থেকে নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও সুদহার বিবেচনাতে বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আর যাই হোক যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। ফলে মার্কিন সার্বভৌম বন্ডে মানুষ বিনিয়োগে যে আগ্রহ পাবে, তেমনটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাবে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত হবে টাকার বদলে ডলার বা এমন কোনো বৈদেশিক মুদ্রায় বন্ড ছাড়া। অর্থাৎ সরকার গ্যারান্টর হয়ে বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ডলার সংগ্রহ করবেন। এর প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সুদহার কেমন নির্ধারণ করা হবে–তা অনেক কিছুই ঠিক করে দেবে।
আমাদের সামনে আছে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ। ২০২২ সালে করোনা মহামারির সময় দেশটি রীতিমতো দেউলিয়া হয়েছিল। এর পেছনে কিন্তু এই সার্বভৌম বন্ডের একটি গল্প আছে। সেটা ভুলে যাওয়া একদমই ঠিক হবে না। শ্রীলঙ্কা চেয়েছিল আইএমএফের নাওয়ে চড়ে সে ঝড় পার হতে। কিন্তু তা হয়নি। বরং পুরো তরি নিয়ে ডুবতে বসেছিল দেশটি।
বাংলাদেশের সামনে কি এমন কিছু অপেক্ষা করছে? সেটা বুঝতে হলে, দেশের ব্যাংক খাতের দিকে তাকাতে হবে। সরকার ব্যাংক খাত থেকে কম ঋণ করতে চাইছে। এটা বেশ ভালো। কিন্তু এই কম ঋণ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে উচ্চ সুদহারে ঋণ সংগ্রহ করলে দেশের বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ভুগবেন না তো? এই প্রশ্নটি আসছে কারণ, সাধারণত সার্বভৌম বন্ডের সুদহার ব্যাংক খাতের ঋণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষত বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে বসে। আর এতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির গত কয়েক বছরে ধ্রুব হয়ে ওঠা অন্যতম সংকটের একটি তারল্য এবং অন্যটি বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ যেমন, তেমনি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগেও ঘাটতি চলছে। গত তিন বছরে তিনটি সরকার দেখা বাংলাদেশের প্রশাসনগুলো বারবার নানাভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চেয়েছে, নানা আয়োজন করেছে, কিন্তু প্রতিশ্রুতি ছাড়া এখন পর্যন্ত তেমন কিছু মেলেনি।
দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও খুব একটা আগ্রহী হচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত বাঁচাতে সার্বভৌম বন্ডের পদক্ষেপ আসলে কতটা কাজে দিতে পারে? সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের মতো সংস্থাগুলো এ ক্ষেত্রে পরামর্শ দিচ্ছে–ডলার বা এমন কোনো মুদ্রায় বন্ড ছাড়ার এবং বিশেষত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই বন্ডে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে। পাশাপাশি সংস্থাটি প্রথম ধাপে অল্প টাকার বন্ড ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
কিন্তু চীনের পান্ডা বন্ডের অংশ হওয়ার কথা বাংলাদেশ বিবেচনা করছে বলে এক ধরনের আলোচনা রয়েছে। হ্যাঁ, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কিছু দেশ পান্ডা বন্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এদের কারও যুক্ত হওয়া ভূরাজনৈতিক কারণে, কারওটা শুধু চান্স হিসেবে। দ্বিতীয়টি নিয়ে প্রশ্ন জাগল কি? উত্তর আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত পরীক্ষিত মার্কিন মিত্র হয়েও চীনের এই বৈশ্বিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করার পেছনে ভূরাজনীতি যতটা, তারচেয়ে বেশি চান্স নেওয়াই কাজ করেছে। ইউএইর সেই সামর্থ্য আছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারা এতটাই পরীক্ষিত মিত্র যে, শুধু পান্ডা বন্ডে বিনিয়োগের কারণেই ওয়াশিংটন তাকে পরিত্যাগ করবে না। কারণ, ইউএই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কৌশলের একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো বিষয়টি তা নয়।
বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু খেলোয়াড় নয়। আর চীনের এই প্রকল্প ইউয়ানকে বৈশ্বিক মুদ্রায় রূপান্তরের একটি কৌশল। ফলে এতে বিনিয়োগ অনেকটাই ভূরাজনৈতিক দাবাখেলায় বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে বিআরআই, এনডিবির মতো প্রকল্পে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। ফলে মুদ্রা রাজনীতির এই বৈশ্বিক মাঠে ঢুকে বাংলাদেশ নিজ সামর্থ্যে টিক থাকতে পারবে, তেমনটা ভাবাটা একটু দূর কল্পনা হয়ে যেতে পারে।
সার্বভৌম বন্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে বিবেচনা, তা হলো–বিনিয়োগের ক্ষেত্রটা কী হবে? অর্থাৎ, সরকার বন্ড ছেড়ে যে টাকা নিল, তা কোথায় বিনিয়োগ করা হবে। এটা কি অবকাঠামো প্রকল্পে যাবে, গেলে তা কোন ধরনের অবকাঠামো? এটা কি শুধু সরকারি ব্যয় মেটাতে কাজে লাগানো হবে? এটা কী ধরনের কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত হবে? মনে রাখা দরকার ক্ষেত্রটি যাই হোক, বাংলাদেশ কিন্তু লুটপাটের দেশ। ফলে বিনিয়োগের কত টাকা লুট হবে, তাও বিবেচনার বিষয়। এই সব বিবেচনায় নিয়েই এই বন্ড বাজারে ছাড়া এবং তার নানা মাপকাঠি ঠিক করা উচিত।
শেষ কথা–শ্রীলঙ্কা বন্ড ছেড়ে বিনিয়োগ করেছিল পর্যটনে। কিন্তু কোভিড মহামারি পর্যটন ধসিয়ে দিল, ধসে গেল শ্রীলঙ্কাও। উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে সব ধরনের অর্থনৈতিক সূচকেই ধাক্কা খেয়েছিল দেশটি। বাংলাদেশ কোন খাতে কত দূরদর্শীভাবে বিনিয়োগ করতে পারে এবং এই অর্থ ব্যবস্থাপনায় কতটা পেশাদার থাকে, তার ওপরই এর সাফল্য ব্যর্থতা নির্ভর করছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ডে যারা বিনিয়োগ করবে, তাদের টাকা ছাপিয়ে হলেও ফেরত দিতে হবে। আর এটিই কিন্তু সার্বভৌম বন্ডের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা গ্যারান্টি, যা দিয়ে আনা অর্থ অনর্থ ঘটাতে পারে যেকোনো সময় পা হড়কালেই।