ads

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ কি আফ্রিকার ভূরাজনীতি বদলে দিচ্ছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ কি আফ্রিকার ভূরাজনীতি বদলে দিচ্ছে?
ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রথম অর্থনৈতিক ধাক্কা ইতোমধ্যেই তেলের বাজার, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ধরনও বদলে দিতে পারে।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে।

কারণ বৈশ্বিক জোট ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে আফ্রিকার ভূরাজনীতির এই পরিবর্তিত সমীকরণ তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যেসব দেশ আগে থেকেই সংঘাত, ঋণের চাপ ও দুর্বল অর্থনীতির সঙ্গে লড়ছে, তাদের জন্য এই সংকট নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

একই সঙ্গে এটি নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদেশি অংশীদার নির্বাচনে বৈচিত্র্য আনা এবং বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার বিদেশি অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো যখন ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা অগ্রাধিকার নিয়ে ব্যস্ত, তখন আফ্রিকার দেশগুলো তাদের বিনিয়োগ কৌশল, অর্থায়নের সুযোগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই অস্থিরতা একই সঙ্গে একটি সুযোগও তৈরি করছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লে আফ্রিকার দেশগুলো অর্থায়নের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে পারে।

পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং বাইরের শক্তিগুলোর সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে আফ্রিকায় ইরানের ভূমিকাও নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মহাদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে তেহরান।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

বিশেষ করে যেসব আফ্রিকান সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক খারাপ হয়েছে, সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ইরান।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশে ইরানের বিভিন্ন অংশীদারত্বে অর্থায়ন এবং সেগুলো ধরে রাখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আফ্রিকায় ইরানের ভূমিকা কমে গেলেও নিরাপত্তা খাতে বিদেশি শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা কমবে এমনটি নয়।

বরং রাশিয়া ও তুরস্কের মতো দেশ সেখানে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে পারে। ‘আফ্রিকা কর্পস’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে মস্কো সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ক জোরদার করেছে।

অন্যদিকে আঙ্কারা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি, ড্রোন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

ফলে আফ্রিকার নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাইরের শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুদান দেখাচ্ছে, কীভাবে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বাস্তবে প্রভাব ফেলছে। দেশটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন বাইরের দেশগুলোর জোট, সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং লোহিত সাগরকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর সক্রিয়তা বাড়লে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করবে এবং এর ফলে সুদানকে ঘিরে উত্তেজনাও কমবে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিষয়ক তাহরির ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক ফেলো এবং সুদানি গবেষক লিনা বাদরি আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও কাছাকাছি আসবে এবং সুদানের ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং সুদান ও বৃহত্তর লোহিত সাগর অঞ্চলকে ঘিরে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বেড়েছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো বাস্তব লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।’’

ইরান যুদ্ধ সমুদ্রপথে যাতায়াতের গুরুত্বও সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা এবং লোহিত সাগরের সরবরাহপথের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক নেটওয়ার্কও ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

সুদান ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এই সংকট আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, আফ্রিকার বাইরের অস্থিরতা এখন লোহিত সাগর অঞ্চলজুড়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ক্রমেই বেশি প্রভাব ফেলছে।

একই ধরনের উদ্বেগ আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটে আরও বেশি মনোযোগ ও সম্পদ ব্যয় করায় আফ্রিকার কিছু সরকার আশঙ্কা করছে, তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিশেষ করে সাহেল অঞ্চল ও হর্ন অব আফ্রিকার আগে থেকেই নিরাপত্তা সংকটে থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে গেলে বিদ্যমান সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

এই সংকট বড় সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর ওপর আফ্রিকার নির্ভরশীলতার দুর্বলতাও সামনে এনেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রপ্তানি হয়।

অন্যদিকে, ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে হামলার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিনির্ভর আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলিয়াহ ভায়েজ বলেন, ‘‘এই বাধাগুলোকে আফ্রিকার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলা বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। একই সঙ্গে এটি আরও শক্তিশালী ও সক্ষম অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।’’

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘হরমুজ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে আফ্রিকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত। এটি দেশগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো, অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানি, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কমানোর প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।’’

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতিটি আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের সংস্কার উদ্যোগ—তেল পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং বাইরের জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর দাবি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।

আফ্রিকা উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের বেশির ভাগই রপ্তানি করে। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানির বড় একটি অংশ আবার আমদানি করতে হয়।

ফলে বাইরের ধাক্কায় অনেক দেশের অর্থনীতি বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ কারণে নিজস্ব তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোকে এখন কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাইজেরিয়ার ড্যাঙ্গোটে রিফাইনারিকে এমন একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

প্রতিদিন ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই স্থাপনাটি ইতোমধ্যেই নাইজেরিয়ার আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করেছে। এর ফলে দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে আফ্রিকার অন্য অনেক অঞ্চল এখনো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

ফলে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে এসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে পূর্ব আফ্রিকায় তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয়েছে। আঞ্চলিক অংশীদারদের নিয়ে প্রস্তাবিত একটি রিফাইনারি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ভারত মহাসাগর উপকূলজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

হরমুজ প্রণালির সংকট আগে থেকেই শুরু হওয়া কিছু পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি আফ্রিকার জ্বালানি ব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং বাইরের নিরাপত্তা অংশীদারদের ওপর নির্ভরশীলতার দুর্বলতা সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে সরকারগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের চাপও বেড়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—বাজার স্বাভাবিক হওয়া এবং জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরে আসার পরও এই পরিবর্তনের গতি বজায় থাকবে কি না।

আফ্রিকার জন্য এই সংকট শুধু তেলের দাম নিয়ে নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

একই সঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এটি আফ্রিকার জন্য আরও স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান গড়ে তোলার একটি সুযোগও তৈরি করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব তেল পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং আফ্রিকান মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংযোগ আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লে বাইরের ধাক্কার প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের সম্পদ, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থান থেকেও আরও বেশি সুবিধা নিতে পারবে।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সরকারগুলো এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে কি না।

অতীতের বিভিন্ন সংকটও জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, দুর্বল পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং সীমিত শিল্প সক্ষমতার মতো সমস্যাগুলো সামনে এনেছিল।

এবার পার্থক্য গড়ে দেবে সরকারগুলো সেই অভিজ্ঞতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে, নাকি আবারও সাময়িক সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

আফ্রিকা সিইও ফোরামের সরকারি খাত বিভাগের প্রধান মারি কামারা বলেন, ‘‘এই সংকটকে শুধু একটি অস্থিরতা হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আফ্রিকার অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।’’

সম্পর্কিত